ভূমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ থেকে ভয়াবহ সহিংসতার পর গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র থেকে পালিয়ে কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় ১৭ হাজার ৫০০ মানুষ। ঘরবাড়ি হারিয়ে নদী পেরিয়ে আসা এসব মানুষের বড় অংশ নারী, শিশু ও বয়স্ক। খাবার, আশ্রয়, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার তীব্র সংকটে পড়েছেন তারা।
শিক্ষক হত্যার পর ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা
২০২৫ সালের ৩ নভেম্বর গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের দক্ষিণ উবাঙ্গি অঞ্চলের ডঙ্গো এলাকায় লোবালাতান্ডা ও এনগালাঙ্গো দক্ষিণ সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের জমি বিরোধ নতুন করে ভয়াবহ রূপ নেয়। এক শিক্ষক হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
এরপর দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত পাঁচজন নিহত ও ১৩ জন আহত হন। আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয় প্রায় ৫০টি বাড়ি। আতঙ্কে এলাকার মানুষজন নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে পালাতে শুরু করেন।
কয়েক দিনের মধ্যেই প্রায় ৩ হাজার ৫০০ পরিবার কঙ্গো নদী পেরিয়ে কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে আশ্রয় নেয়। তাদের প্রধান গন্তব্য হয়ে ওঠে বেতু, এনিয়েলে এবং নদীতীরবর্তী গোমা, ইলোকো, বেঙ্গা ও মোনা বোলির মতো এলাকা।

নারী ও শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে
নতুন করে আশ্রয় নেওয়া মানুষের বড় অংশই নারী, শিশু ও বয়স্ক। অনেকেই প্রায় কোনো সম্পদ ছাড়াই সীমান্ত পেরিয়ে এসেছেন। ফলে তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা ও সুরক্ষার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় পর্যায়ে আগে থেকেই সীমিত সম্পদ ও অবকাঠামোর ওপর চাপ ছিল। নতুন এই বিশাল জনগোষ্ঠীর আগমনে সেই চাপ আরও বেড়েছে।
মানবিক সহায়তার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংঘর্ষ, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া এবং হঠাৎ করে বাস্তুচ্যুত হওয়ার অভিজ্ঞতা শিশু ও নারীদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী আতঙ্ক ও মানসিক বিপর্যয় তৈরি করতে পারে।
জমি নিয়ে পুরোনো বিরোধই বড় কারণ
দক্ষিণ উবাঙ্গি অঞ্চলে জমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার নিয়ে বিরোধ নতুন নয়। ২০০৯ সালের ডঙ্গো সংকটও দেখিয়েছিল, স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর মধ্যস্থতার ব্যবস্থা না থাকলে জমি নিয়ে বিরোধ কত দ্রুত প্রাণঘাতী সংঘাতে পরিণত হতে পারে।
গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের অন্য এলাকাতেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। মাই-নদোম্বে অঞ্চলে ২০২২ সাল থেকে কুয়ামুথ এলাকায় মোবন্ডো সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বোলোবো এলাকায় তেকে ও বানুনু সম্প্রদায়ের সংঘর্ষের কারণে বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।
ওই সংঘাতের পরও প্রায় ৮ হাজার ৯৫৭ জন মানুষ কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ফলে নতুন করে মানুষের আগমন দেশটির ওপর তৈরি হওয়া মানবিক চাপকে আরও গভীর করেছে।

আগে থেকেই ছিল প্রায় ৭০ হাজার শরণার্থী
নতুন এই জনগোষ্ঠী কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে পৌঁছানোর সময় দেশটিতে আগে থেকেই প্রায় ৭০ হাজার শরণার্থী অবস্থান করছিলেন। গত বছরের নভেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, তাদের বড় অংশ ছিল লিকুয়ালা, প্লাতো, এনকেনি-আলিমা ও জুয়ে-লেফিনি অঞ্চলে।
এর মধ্যে হঠাৎ করে আরও ১৫ হাজারের বেশি মানুষের আগমন স্থানীয় খাদ্য, পানি, আশ্রয় ও স্বাস্থ্যসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে। সীমিত অবকাঠামোর কারণে আশ্রয় নেওয়া মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
স্থানীয়ভাবে শুরু হয়েছে সীমিত সহায়তা
জাতীয় মানবিক সহায়তা সংস্থা স্থানীয় অংশীদারদের সঙ্গে মিলে লিকুয়ালা অঞ্চলে কিছু সহায়তা কার্যক্রম চালাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে নারীদের জন্য স্বাস্থ্যবিধি সামগ্রী এবং গর্ভবতী ও শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো নারীদের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ।
শূন্য থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্যও প্রয়োজনীয় সামগ্রী দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে মানুষের সংখ্যা ও প্রয়োজনের তুলনায় এসব সহায়তা এখনো সীমিত।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার গামবোমা কার্যালয়ও গর্ভবতী নারী, বুকের দুধ খাওয়ানো মা এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের সহায়তার পরিকল্পনা করছে।
আন্তর্জাতিক সহায়তার আবেদন
বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রয়োজন মেটাতে আন্তর্জাতিক সহায়তার আবেদন জানানো হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতারও প্রয়োজন রয়েছে।
আন্তর্জাতিক রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট ফেডারেশনের পক্ষ থেকে এখনো সরাসরি সহায়তা শুরু না হলেও সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা চলছে। জরুরি তহবিল চাওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ, স্থানীয় সংঘাত এবং সীমান্ত পেরিয়ে মানুষের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিচ্ছে—সময়মতো মধ্যস্থতা ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের ব্যবস্থা না থাকলে একটি স্থানীয় বিরোধও বড় মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে। কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে নতুন করে আশ্রয় নেওয়া হাজারো মানুষের ভবিষ্যৎ এখন দ্রুত ও পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভর করছে।
গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র থেকে কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে মানুষের এই নতুন ঢল শুধু একটি সীমান্ত সংকট নয়; এটি দীর্ঘস্থায়ী ভূমি বিরোধ, নিরাপত্তাহীনতা এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের ক্রমবর্ধমান মানবিক দুর্দশারও প্রতিচ্ছবি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















