বিমানে আরামদায়ক ও বিলাসবহুল ভ্রমণের চাহিদা যত বাড়ছে, ততই জটিল হয়ে উঠছে উচ্চমূল্যের ব্যবসায়িক শ্রেণির আসন তৈরি ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া। যাত্রী টানতে বিমান সংস্থাগুলো এখন দরজা, ব্যক্তিগত কক্ষ, বড় বিছানা ও নানা আধুনিক সুবিধাসহ আসন তৈরি করছে। কিন্তু এসব নতুন নকশার অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় লাগায় বিপাকে পড়ছে বিমান সংস্থা ও উড়োজাহাজ নির্মাতারা।
করোনাভাইরাস মহামারির পর থেকেই বিলাসবহুল ভ্রমণের বাজারে নতুন গতি এসেছে। ধনী ও উচ্চ ব্যয়ক্ষমতার যাত্রীদের আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন বিমান সংস্থা নিজেদের উড়োজাহাজে ব্যবসায়িক শ্রেণির আসন আরও আকর্ষণীয় করে তুলছে। কিন্তু যত বেশি সুবিধা যোগ হচ্ছে, ততই বাড়ছে নিরাপত্তা যাচাই ও অনুমোদনের জটিলতা।
বিলাসী আসন, কিন্তু অনুমোদনে দীর্ঘ অপেক্ষা
নতুন ধরনের ব্যবসায়িক শ্রেণির আসন উড়োজাহাজে বসানোর আগে বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বিশেষ করে যেসব আসনে সরানোর মতো দরজা থাকে, সেগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তি পরীক্ষা করা হয়।
কারণ জরুরি পরিস্থিতিতে যাত্রীদের দ্রুত উড়োজাহাজ থেকে বের হওয়ার পথে কোনো আসনের দরজা বা কাঠামো বাধা সৃষ্টি করছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
এই কারণে কিছু উড়োজাহাজ প্রস্তুত হয়ে যাওয়ার পরও যাত্রী পরিবহনে পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কোথাও আবার ব্যবসায়িক শ্রেণির আসনের দরজা বন্ধ করে রাখা হয়েছে, আবার কোনো কোনো আসন একেবারেই যাত্রীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়নি।
দরজা খুলতে না পারায় যাত্রীদেরও অপেক্ষা
সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বিমান সংস্থা ২০০৩ সালে প্রথম ব্যবসায়িক শ্রেণির পাশাপাশি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্য দরজাযুক্ত আসন জনপ্রিয় করে তোলে। এরপর ধীরে ধীরে এ ধরনের আসন বিলাসবহুল ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
কিন্তু ব্যক্তিগত দরজা যত জনপ্রিয় হয়েছে, অনুমোদনের ঝামেলাও তত বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় বিমান সংস্থা গত বছরের ডিসেম্বর থেকে নতুন ধরনের উড়োজাহাজে যাত্রী পরিবহন শুরু করলেও ব্যবসায়িক শ্রেণির আসনের সরানোর দরজাগুলো সাত মাস পর্যন্ত খোলা অবস্থায় রাখতে হয়েছিল। পরে নিরাপত্তা অনুমোদন পাওয়ার পর সেগুলো ব্যবহার করা সম্ভব হয়।
আরেকটি মার্কিন বিমান সংস্থা চলতি বছরের এপ্রিল মাসে নতুন ব্যক্তিগত কক্ষসমৃদ্ধ ব্যবসায়িক শ্রেণি চালু করে। সেখানেও দরজার অনুমোদন পেতে সময় লেগেছে। শেষ পর্যন্ত আগস্টের শুরুতে সেই দরজাগুলো যাত্রীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
ভারতের একটি বিমান সংস্থার নতুন উড়োজাহাজেও ব্যবসায়িক শ্রেণির দরজা এখনো খোলা অবস্থায় রাখতে হচ্ছে, কারণ প্রয়োজনীয় অনুমোদনের প্রক্রিয়া শেষ হয়নি।
কিছু উড়োজাহাজে ব্যবসায়িক শ্রেণির আসন খালিই থাকছে
সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি দেখা যাচ্ছে ইউরোপের বিমান সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রে।
জার্মানির একটি বিমান সংস্থার নতুন ব্যবসায়িক শ্রেণিতে পাঁচ ধরনের আলাদা আসন রাখা হয়েছে। কোনো আসনে বেশি পায়ের জায়গা, কোনো আসনে বড় বিছানা—যাত্রীদের পছন্দ অনুযায়ী নানা সুবিধা রয়েছে।
কিন্তু অনুমোদন জটিলতার কারণে ওই উড়োজাহাজে প্রথম দিকে ২৮টি ব্যবসায়িক শ্রেণির আসনের মধ্যে মাত্র চারটি যাত্রীদের জন্য ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছিল। কয়েক মাস পর আরও কিছু আসন ব্যবহারের অনুমতি মিললেও তিনটি আসন এখনো বন্ধ রয়েছে।
অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসের জাতীয় বিমান সংস্থা আগামী অক্টোবর থেকে নতুন উড়োজাহাজ পরিচালনার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু সেখানে থাকা ৩৪টি ব্যবসায়িক শ্রেণির আসনই শুরুতে খালি রাখতে হতে পারে। এর ফলে বিমান সংস্থাটির সম্ভাব্য আয়ও বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে।
নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের মতে, একই ধরনের আসন অন্য বিমান সংস্থায় ব্যবহার করা হলেও আসনের সংখ্যা, সারির বিন্যাস ও আসনের কোণ বদলে গেলে নতুন করে নিরাপত্তা পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
উড়োজাহাজ তৈরি হয়, কিন্তু হস্তান্তর করা যায় না
এই জটিলতার প্রভাব শুধু বিমান সংস্থার ওপরই পড়ছে না। উড়োজাহাজ নির্মাতারাও সমস্যায় পড়ছে।
একটি বড় মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী জানিয়েছেন, আসন অনুমোদনের জটিলতা উৎপাদনের চেয়ে উড়োজাহাজ সরবরাহের ওপর বেশি প্রভাব ফেলছে। অনেক উড়োজাহাজ তৈরি হয়ে কারখানায় পড়ে থাকছে, কারণ নির্দিষ্ট আসনের প্রয়োজনীয় অনুমোদন এখনো পাওয়া যায়নি।
সৌদি আরবের নতুন একটি বিমান সংস্থার জন্য তৈরি বেশ কয়েকটি উড়োজাহাজও একই কারণে নির্ধারিত সময়ে হস্তান্তর করা যায়নি। পরে সেগুলোর কয়েকটি সরবরাহ করা সম্ভব হলেও আসন অনুমোদনের সমস্যা পুরোপুরি শেষ হয়নি।
বিমান সংস্থাগুলো কেন আলাদা আসন চাইছে
উড়োজাহাজ নির্মাতারা এই সমস্যা কমাতে আগে থেকেই অনুমোদিত কিছু আসনের নকশা ব্যবহারের সুযোগ দিতে চাইছে। কিন্তু বিমান সংস্থাগুলোর আগ্রহ নিজেদের আলাদা পরিচয় তৈরি করার দিকে।
একই ধরনের ব্যবসায়িক শ্রেণির আসন সব বিমান সংস্থায় থাকলে যাত্রীদের কাছে বিশেষত্ব কমে যায়। তাই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে অনেক সংস্থাই নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী আসনের নকশা, ব্যক্তিগত দরজা, বিছানা ও অন্যান্য সুবিধা যোগ করছে।
ফলে একটি আসনের সামান্য পরিবর্তনও নতুন করে নিরাপত্তা পরীক্ষার প্রয়োজন তৈরি করতে পারে।
নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ছাড় নয়
যদিও অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা বিমান সংস্থাগুলোর জন্য আর্থিক ক্ষতির কারণ হচ্ছে, তারপরও যাত্রী নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।
জরুরি অবস্থায় আগুন, ধোঁয়া বা অন্য কোনো বিপদের সময় যাত্রীদের দ্রুত বের হতে হয়। সেই মুহূর্তে বিলাসবহুল আসনের দরজা, দেয়াল বা অন্য কোনো কাঠামো যেন বের হওয়ার পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়, সেটিই নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর প্রধান বিবেচনা।
এ কারণেই নতুন নকশার প্রতিটি অংশকে পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।
দ্রুত অনুমোদনের দাবি বাড়ছে
বিমান চলাচল খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন আসনের নকশা ও প্রযুক্তি এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। ফলে পুরোনো নিয়মে একই গতিতে অনুমোদন দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে অনুমোদনের প্রক্রিয়া আরও কার্যকর ও দ্রুত করতে হবে। ইতোমধ্যে কিছু অগ্রগতি দেখা গেলেও অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা আসনের সংখ্যা এখনো অনেক বেশি।
বিমান ভ্রমণে বিলাসিতা যত বাড়ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নিরাপত্তা যাচাইয়ের প্রয়োজনও। ফলে ভবিষ্যতের আকাশযাত্রায় যাত্রীদের জন্য আরও ব্যক্তিগত ও আরামদায়ক কক্ষ তৈরি হলেও, সেগুলো আকাশে উড়তে দেওয়ার আগে নিরাপত্তার কঠিন পরীক্ষাই পেরোতে হবে।
বিলাসী আসন যত আকর্ষণীয়ই হোক, আকাশপথে শেষ কথা নিরাপত্তারই।
দামি ও আধুনিক আসন দিয়ে যাত্রী আকর্ষণের প্রতিযোগিতা তাই এখন বিমান সংস্থাগুলোর জন্য একই সঙ্গে সুযোগ এবং নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















