পাকিস্তানে খাদ্যপণ্যের দাম আগামী মাসগুলোতে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি বাড়তে পারে—কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন সতর্কবার্তা দেশটির অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতির পেছনে এখন শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ কারণ নয়, বরং আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও পণ্যবাজারের অস্থিরতাও বড় ভূমিকা রাখছে।
আন্তর্জাতিক সংকটের চাপ এসে পড়ছে খাদ্যবাজারে
আঞ্চলিক সংঘাত এবং উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্নের কারণে জ্বালানি ও সার উৎপাদনের ব্যয় বেড়েছে। একই সঙ্গে পরিবহন ও পণ্যবাহী জাহাজের ভাড়াও বাড়ছে। এসব অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত কৃষি উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ হয়ে সাধারণ ভোক্তার খাদ্যপণ্যের দামে গিয়ে যুক্ত হচ্ছে।
জ্বালানির দাম বাড়লে সার উৎপাদন ও কৃষিপণ্য পরিবহনের ব্যয় বেড়ে যায়। সারের দাম বাড়ায় কৃষকের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায়। আবার জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে খামার থেকে বাজারে পণ্য পৌঁছাতেও বেশি অর্থ লাগে। সব মিলিয়ে এর প্রভাব খুচরা খাদ্যপণ্যের দামে পড়তে বাধ্য।
সীমিত আয়ের মানুষের জন্য বড় চাপ
পাকিস্তানের বহু পরিবার এমনিতেই সীমিত ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে জীবনযাপন করছে। ফলে খাদ্যের দাম সামান্য বাড়লেও তাদের দৈনন্দিন ব্যয়ে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে কারণ দেশটি একই সময়ে দুই ধরনের আঘাত মোকাবিলা করছে। একদিকে জ্বালানি ও সারের দাম বাড়ায় কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে কৃষিপণ্যের রপ্তানি দুর্বল হওয়ায় খাদ্যবাণিজ্যের ভারসাম্যও খারাপ হচ্ছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়লে আমদানি ব্যয় মেটাতে দেশটির আরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন হতে পারে।
কৃষিতে পুরোনো দুর্বলতাই বড় ঝুঁকি
বর্তমান সংকট পাকিস্তানের কৃষি খাতের বহুদিনের কাঠামোগত দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। দেশটির সেচব্যবস্থা এখনও যথেষ্ট আধুনিক ও দক্ষ নয়। বিপুল পরিমাণ পানি অপচয় হয়, পানি সংরক্ষণের সক্ষমতাও প্রয়োজনের তুলনায় কম। এর পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনের বড় অংশ এখনও পানিনির্ভর ফসলের ওপর কেন্দ্রীভূত।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাত ও পানির প্রাপ্যতা যখন ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে, তখন এই দুর্বলতাগুলোর অর্থনৈতিক মূল্যও বাড়ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কৃষি উৎপাদনশীলতাও যথেষ্ট বাড়েনি। অথচ কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত—দুই ক্ষেত্রেই উৎপাদনশীলতা বাড়ানো জরুরি।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ক্ষুদ্র কৃষক
বড় কৃষি উদ্যোগের তুলনায় ক্ষুদ্র কৃষকদের আর্থিক সক্ষমতা অনেক কম। সার, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় হঠাৎ বেড়ে গেলে তাদের পক্ষে সেই অতিরিক্ত খরচ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এর সঙ্গে যদি খারাপ ফলন যোগ হয়, তাহলে একটি কৃষক পরিবার খুব দ্রুত ঋণের সংকটে পড়ে যেতে পারে। বাড়তি খরচ সামলাতে না পেরে কৃষক প্রয়োজনীয় উপকরণের ব্যবহার কমাতে পারেন, উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারেন কিংবা বাড়তি খরচের বোঝা খাদ্যপণ্যের দামের মাধ্যমে ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দিতে পারেন। খাদ্যনিরাপত্তার সংকটে থাকা একটি দেশের জন্য—তিনটিই উদ্বেগজনক ফলাফল।
জলবায়ু পরিবর্তন বাড়াচ্ছে অনিশ্চয়তা
আগামী বছর এল নিনোর সম্ভাবনা থাকলে খাদ্য মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। আবহাওয়ার পরিবর্তন ফসলের ফলন, পানির প্রাপ্যতা এবং কৃষিপণ্যের বাজারদরে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমান জ্বালানি সংকটের প্রভাব পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন আবহাওয়াজনিত ধাক্কা দেখা দিলে সরবরাহব্যবস্থায় আরও চাপ তৈরি হতে পারে। তাই খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধিকে কেবল সাময়িক মূল্যস্ফীতির একটি অংশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
খাদ্যের দাম বাড়লে সামাজিক ক্ষতিও বাড়ে
খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে নিম্নআয়ের পরিবারগুলো আয়ের বড় অংশ খাবার কিনতেই ব্যয় করতে বাধ্য হয়। ফলে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমে যেতে পারে।
অপর্যাপ্ত পুষ্টির সবচেয়ে বড় শিকার হতে পারে শিশুরা। দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেলে তাদের শারীরিক ও মেধাগত বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এর প্রভাব ভবিষ্যতে দেশের মানবসম্পদের মানের ওপরও পড়বে।
দেশটির প্রায় ৪৬ শতাংশ মানুষ ক্ষুধাসদৃশ পরিস্থিতির মুখোমুখি—এমন তথ্যের প্রেক্ষাপটে দীর্ঘস্থায়ী খাদ্য মূল্যস্ফীতি তাই শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি বড় ধরনের সামাজিক ও উন্নয়নগত সংকটেও রূপ নিতে পারে।
কাঠামোগত সংস্কারই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান
পাকিস্তান প্রতিবেশী অঞ্চলের যুদ্ধ থামাতে পারে না, আন্তর্জাতিক জ্বালানির দামও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। সার কিংবা আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয়ের ওপরও দেশটির সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেই। তবে এসব বৈশ্বিক ধাক্কা দেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্যদামে কতটা দ্রুত ও কতটা বড় প্রভাব ফেলবে, তা অনেকাংশেই নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে কমানো সম্ভব।
এ জন্য প্রথমেই কৃষির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে হবে। সেচব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো, পানির অপচয় কমানো, সংরক্ষণক্ষমতা বাড়ানো এবং আধুনিক সেচপ্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে পানির প্রাপ্যতা ও পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফসল উৎপাদনের ধরনও নতুন করে বিবেচনা করতে হবে।
কৃষকদের উন্নতমানের বীজ, আধুনিক প্রযুক্তি, কৃষি সম্প্রসারণসেবা, অর্থায়ন এবং নির্ভরযোগ্য বাজারতথ্যের সুযোগ বাড়াতে হবে। গবেষণায় এমন ফসল ও কৃষিপদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন, যেগুলো অনিয়মিত আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত সহ্য করতে পারে।

সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করার বিকল্প নেই
কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজার অবকাঠামো উন্নত করা হলে ফসল কাটার পর ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির পুরো চাপ ভোক্তার ওপর স্থানান্তরের প্রবণতাও কিছুটা কমানো যাবে।
দেশীয় খাদ্য উৎপাদন শক্তিশালী করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার সময় ব্যয়বহুল খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরতাও কমানো সম্ভব হবে।
এসব পদক্ষেপ খাদ্য মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি বন্ধ করতে পারবে না। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াবে। বর্তমান পরিস্থিতিকে তাই আরেকটি সাময়িক মূল্যস্ফীতির ঘটনা হিসেবে না দেখে ভবিষ্যতের জন্য সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম হয়তো একসময় স্থিতিশীল হবে, আঞ্চলিক সংঘাতও কমে আসতে পারে এবং সারের দামও নেমে যেতে পারে। কিন্তু কৃষির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না করলে পরবর্তী আন্তর্জাতিক সংকট আবারও একই সমস্যাগুলো সামনে নিয়ে আসবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঝুঁকির কথা জানিয়েছে। এখন প্রয়োজন সময় থাকতে নীতিনির্ধারকদের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। জ্বালানি ও সারের বাড়তি ব্যয়, জলবায়ু অনিশ্চয়তা এবং কম কৃষি উৎপাদনশীলতা একসঙ্গে মিলে যেন বড় খাদ্যসংকটে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
খাদ্যনিরাপত্তা শুধু স্বল্পমেয়াদি মূল্যনিয়ন্ত্রণ কিংবা জরুরি আমদানির মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন উৎপাদনশীল, পানিসাশ্রয়ী এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা—যা একই সঙ্গে কৃষক ও ভোক্তা উভয়কেই সুরক্ষা দিতে পারে।
পাকিস্তান বিদেশ থেকে আসা বৈশ্বিক ধাক্কা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলেও সেই ধাক্কায় তার জনগণ কতটা অসহায় হয়ে পড়বে, তা অনেকটাই নির্ধারণ করতে পারে দেশের নীতি ও প্রস্তুতি। এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ সেখানেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















