আফগানিস্তানে দীর্ঘদিনের খাদ্যসংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাস্তুচ্যুতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ক্রমবর্ধমান অপুষ্টি। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা এই বহুমাত্রিক সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের বিশ্ব খাদ্য দিবসকে সামনে রেখে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেশটির খাদ্যসংকট, স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবনতি এবং অপুষ্টির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, নারীদের অধিকার ও স্বাধীনতার ওপর ক্রমবর্ধমান বিধিনিষেধ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। খাদ্যের অভাবের পাশাপাশি চিকিৎসা ও পুষ্টিসেবায় প্রবেশাধিকারও অনেক পরিবারের জন্য অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
ভয়াবহ বন্যায় ধ্বংস উত্তর-পূর্ব আফগানিস্তান
২০২৪ সালের ১০ ও ১১ মে উত্তর-পূর্ব আফগানিস্তানে প্রবল বৃষ্টিপাতের পর আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। বাগলান, বাদাখশান ও তাখার প্রদেশের ২১টি জেলা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বন্যায় অন্তত ১৮০ জন প্রাণ হারান এবং আহত হন ২৪০ জনের বেশি। নিহতদের মধ্যে ৫১ শিশু ও ৫০ নারী ছিলেন। ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, বিদ্যালয় এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্র ধ্বংস হওয়ায় বিপর্যয় আরও গভীর হয়ে ওঠে।

বাগলান প্রদেশে ক্ষয়ক্ষতি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। বাগলানি জাদিদ, বুরকা, দাহনাই ঘোরি, দোশি, গুজারগাহ নূর, জেলগা, খোস্ত, নাহরিন, পুলি খুমরি ও তালা ও বারফাকসহ বিভিন্ন এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাগলানি জাদিদে ৭৩ জন নিহত ও ৭৬ জন আহত হন। ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয় প্রায় দেড় হাজার ঘরবাড়ি। বুরকা জেলায় প্রাণ হারান ৭০ জন এবং আহত হন ১৫০ জন। সেখানে প্রায় পাঁচ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দাহনাই ঘোরি, গুজারগাহ নূর, জেলগা, নাহরিন ও পুলি খুমরি মিলিয়ে আরও ১৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১ হাজার ৬১২টি ঘরবাড়ি। খোস্ত ও তালা ও বারফাকেও ৬০৩টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা ও জীবিকার ওপর বড় আঘাত
বন্যার ক্ষতি শুধু বসতবাড়িতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বাগলান ও তাখার প্রদেশের ১১টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। ফলে সংকটের মধ্যেই স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
সড়ক, সেতু ও সরকারি বিদ্যালয়ও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে ৪ হাজার ২৬০টি গবাদিপশু মারা যাওয়ায় বহু পরিবারের জীবিকা ও খাদ্যের উৎস নষ্ট হয়েছে।
তাখার প্রদেশের চাল, ইশকামিশ, ফারখার ও নামক আব জেলায় ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং শতাধিক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাদাখশানের তেশকান জেলায় প্রায় ২০০টি ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে। সেখানে ৫০টি সেতু ও ৩০টি বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রায় ২ হাজার প্রাণী মারা গেছে।
ঘরহারা শিশুদের চোখে বেঁচে থাকার লড়াই
বন্যার পর হাজার হাজার মানুষ ঘরছাড়া হয়ে পড়েছেন। খাদ্যসংকটের সঙ্গে বাস্তুচ্যুতি যুক্ত হওয়ায় তাদের জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
বারো বছর বয়সী সাঈদুল্লাহ বন্যায় হারিয়েছে তার মা, বাড়ি, চাচা ও বন্ধুদের। তার বিদ্যালয়ও ধ্বংস হয়ে গেছে। যে অবকাঠামো একসময় তার সম্প্রদায়ের জীবনকে সচল রাখত, বন্যার পানিতে তার বড় অংশই নিশ্চিহ্ন হয়েছে।
আট বছর বয়সী ফাতিমার জীবনও এখন একটি অস্থায়ী তাঁবুর মধ্যে সীমাবদ্ধ। মাটিতে বিছানা ও কম্বল ছাড়াই ঘুমাতে হচ্ছে তাদের। খাবার রান্না করার মতো প্রয়োজনীয় উপকরণও পরিবারের হাতে নেই।
ফাতিমার পরিবারের প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের অনেকে বন্যায় মারা গেছেন। ফলে প্রিয়জন হারানোর শোকের পাশাপাশি তাদের সামনে এখন টিকে থাকার কঠিন প্রশ্ন।
রাতের খাবারও অনিশ্চিত
নরগিস ও তার পরিবারও একই দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। রোদ থেকে বাঁচার জন্য পাওয়া একটি তাঁবু তাদের মাথার ওপর সামান্য আশ্রয় দিয়েছে, কিন্তু খাবারের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি।

তাঁবুর নিচে আশ্রয় মিললেও রাতের খাবার জোগাড় করা যাচ্ছে না—এমন বাস্তবতা আফগানিস্তানের বিস্তৃত খাদ্যসংকটের নির্মম চিত্র তুলে ধরে।
একদিকে বাস্তুচ্যুতি, অন্যদিকে ক্ষুধা
বন্যার আগে থেকেই আফগানিস্তানের খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। দুর্যোগের পর সেই সংকট আরও তীব্র হয়েছে। দেশের প্রতি তিনজন মানুষের একজন পরবর্তী খাবার কোথা থেকে আসবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছে।
ফলে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সংকট শুধু ঘর হারানোর নয়। তারা একই সঙ্গে হারিয়েছে খাদ্যের উৎস, জীবিকা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং নিরাপদ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা।
নারী ও শিশুদের ওপর এই পরিস্থিতির প্রভাব সবচেয়ে গভীর। ঘরবাড়ি হারিয়ে অস্থায়ী আশ্রয়ে থাকা পরিবারগুলো যখন খাদ্য ও চিকিৎসার অভাবে দিন কাটাচ্ছে, তখন আফগানিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট আরও জটিল রূপ নিচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















