০২:৪৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬
পূর্ববর্তী রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য তানিম সুফিয়ানী অব্যাহতি ক্যামেরুনে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ৭ সুন্দরবনের জলবায়ু প্রকল্পে ব্রিটিশ সহায়তা কাটছাঁট, দুই বছর আগেই বন্ধ হচ্ছে কার্যক্রম শেরপুরে পুকুর থেকে দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার, নিখোঁজের সাড়ে ১৪ ঘণ্টা পর মিলল সন্ধান নুসরাত হত্যা মামলায় দুইজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল, চারজনের সাজা আমৃত্যু কারাদণ্ড দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি-ঝড়ের পূর্বাভাস, কমতে পারে তাপমাত্রা ইমরানকে হাসপাতালে নেওয়ার সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্যের অভিযোগ, সরকারের বিরুদ্ধে ৮ আইনজীবীর প্রতিবাদ তীব্র গরমে লাহোরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট, দুর্ভোগে নগরবাসী করাচির অমীমাংসিত আবাসন সংকট সংলাপের প্রস্তাব কি কেবলই লোকদেখানো?

অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করাতে গ্রামকেই করতে হবে প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র

শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি পুনর্গঠনের আলোচনা যতবার হয়েছে, ততবারই আমরা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার, আর্থিক শৃঙ্খলা, ঋণ ব্যবস্থাপনা কিংবা নগরকেন্দ্রিক বিনিয়োগকে সামনে এনেছি। এগুলো প্রয়োজনীয়—এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন আমাদের আরও গুরুত্ব দিয়ে করা উচিত: দেশের যে বিপুল জনগোষ্ঠী গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল, তাদের উৎপাদনশীলতা ও সম্পদ সৃষ্টির ক্ষমতা না বাড়িয়ে কি সত্যিই একটি শক্তিশালী জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব?

আমার দৃষ্টিতে, শ্রীলঙ্কার জন্য এর উত্তর হলো না।

দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে কেবল দারিদ্র্য বিমোচনের বিষয় হিসেবে দেখার সময় শেষ হয়েছে। এটিকে জাতীয় উৎপাদন, আয়, সম্পদ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে। এখানেই আমি একটি ‘তৃতীয় পথের’ প্রয়োজন দেখি—যেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের কাঠামোগত ও আর্থিক সংস্কারের পাশাপাশি গ্রামীণ জনগোষ্ঠী নিজেরাও উন্নয়নের পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত ও সম্পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়ার অংশীদার হবে।

কেন গ্রামীণ অর্থনীতিকে নতুনভাবে দেখতে হবে

শ্রীলঙ্কার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ গ্রামীণ এলাকায় বসবাস করে। অথচ আয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো এবং উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থানের সুযোগের বড় অংশ শহর ও নগরকেন্দ্রিক অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত।

এই বৈষম্যের সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু আয় কম হওয়া নয়। গ্রামীণ পরিবারের আর্থিক সুরক্ষাও অত্যন্ত দুর্বল। তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য এবং কৃষি উৎপাদনের মৌলিক উপকরণে ব্যয় হয়ে যায়। ফলে মূল্যস্ফীতি, ফসলহানি কিংবা জলবায়ুজনিত কোনো ধাক্কা তাদের জীবন ও জীবিকায় তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে।

আমরা বহু বছর ধরে ধরে নিয়েছি, কেন্দ্রীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সৃষ্টি হলে তার সুফল ধীরে ধীরে গ্রামাঞ্চলে পৌঁছে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়। কেন্দ্রের প্রবৃদ্ধি নিজে থেকে প্রান্তিক অঞ্চলের উৎপাদনশীলতা বাড়ায় না। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজন আলাদা অবকাঠামো, বাজারে প্রবেশাধিকার, দক্ষতা, প্রযুক্তি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ।

এ কারণে গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নকে জাতীয় অর্থনীতির মূল কৌশলের অংশ করা জরুরি।

Food insecurity in Sri Lanka likely to worsen amid poor agricultural  production, price spikes and ongoing economic crisis, FAO and WFP warn

কৃষি খাতের সম্ভাবনা এখনও অব্যবহৃত

শ্রীলঙ্কার খাদ্যনিরাপত্তা মূলত গ্রামীণ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। দেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্য চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ পূরণ করে গ্রামীণ কৃষি। ধান, সবজি, মসলা, ভুট্টা ও অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি ছোট কৃষকেরা চা ও রাবারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পণ্য উৎপাদনেও বড় ভূমিকা রাখেন।

কিন্তু এখানে একটি বড় অসামঞ্জস্য রয়েছে। প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ গ্রামীণ এলাকায় বসবাস করলেও কৃষি জাতীয় মোট দেশজ উৎপাদনের মাত্র প্রায় ৮ দশমিক ৪ শতাংশে অবদান রাখে।

এই ব্যবধানকে আমি শ্রীলঙ্কার জন্য একটি বিশাল অর্থনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখি।

আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত, কীভাবে একই জমি, পানি ও শ্রম থেকে আরও বেশি অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করা যায়। এর জন্য আধুনিক সেচ, উন্নত কৃষি গবেষণা, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদ এবং বৈজ্ঞানিকভাবে কৃষি উপকরণ ব্যবহারের দিকে যেতে হবে।

কৃষকের উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়

কৃষকের উৎপাদন বাড়লেও যদি তিনি বাজারে ন্যায্য মূল্য না পান, তাহলে জাতীয় উৎপাদনশীলতার উন্নতি তার সম্পদে পরিণত হবে না।

এ কারণেই কৃষিপণ্যের বাজারব্যবস্থায় সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। উৎপাদককে সরাসরি বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। একই সঙ্গে সংরক্ষণ, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা আধুনিক করতে হবে।

গ্রামীণ এলাকায় জলবায়ু-নিয়ন্ত্রিত সংরক্ষণাগার, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ক্যানিংয়ের মতো শিল্প গড়ে তোলা গেলে কৃষিপণ্যের মূল্য অনেক বাড়ানো সম্ভব। কাঁচা কৃষিপণ্য বিক্রির বদলে মূল্য সংযোজন করে তা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে নেওয়া গেলে কৃষকের আয় যেমন বাড়বে, তেমনি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও নতুন সম্পদ তৈরি হবে।

জলবায়ু ঝুঁকিও এখন কৃষি পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় বিষয় হওয়া উচিত। অনিয়মিত বৃষ্টি, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, বন্যা কিংবা খরা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কৃষকের আর্থিক নিরাপত্তা রক্ষায় এসব ঝুঁকি মোকাবিলার প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা কৃষিনীতি থেকে আলাদা রাখা যাবে না।

গ্রামকে শুধু কৃষির ওপর নির্ভরশীল রাখা যাবে না

তবে আমি মনে করি, গ্রামীণ অর্থনীতির ভবিষ্যৎ শুধু কৃষির ওপর নির্ভর করতে পারে না। কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে, কিন্তু একই সঙ্গে গ্রামাঞ্চলে নতুন শিল্প ও সেবা খাতও তৈরি করতে হবে।

গ্রামীণ প্রদেশগুলোতে হালকা শিল্প, পোশাক, পরিবেশবান্ধব পর্যটন এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা যেতে পারে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও বিনিয়োগ-সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে বেসরকারি খাতও এসব অঞ্চলে যেতে আগ্রহী হবে।

সমৃদ্ধ সমাজ ও ডিজিটাল অর্থনীতি : প্রেক্ষিত বেসরকারি উদ্যোগ

ডিজিটাল অর্থনীতিও এখানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। দ্রুতগতির ইন্টারনেট এবং স্থানীয় ডিজিটাল প্রশিক্ষণকেন্দ্র থাকলে গ্রামীণ তরুণরা তথ্যপ্রযুক্তি, গ্রাফিক ডিজাইন, অনলাইন সেবা ও দূরবর্তী কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে। এর ফলে কর্মসংস্থানের জন্য শহরে বাধ্যতামূলক অভিবাসনের চাপ কমবে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে ব্যয় হিসেবে দেখলে চলবে না

গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে সামাজিক খাতের আলাদা বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না। এগুলো অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতার মৌলিক অবকাঠামো।

শ্রীলঙ্কার ১০ হাজারের বেশি সরকারি স্কুলের মধ্যে মাত্র এক হাজার স্কুল বিজ্ঞান শাখাসহ উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা দেয়। এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অংশ শহর ও বড় আঞ্চলিক কেন্দ্রে অবস্থিত। ফলে গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গণিতভিত্তিক শিক্ষার ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকে।

গ্রামীণ এলাকায় আধুনিক ‘স্মার্ট স্কুল হাব’ তৈরি করে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতের সমান সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। শহরে না গিয়েও যদি একজন গ্রামীণ শিক্ষার্থী একই মানের শিক্ষা পায়, তাহলে সেটি শুধু শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি হবে না—ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের কাঠামোও বদলে দেবে।

স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা। বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য গ্রামীণ রোগীদের অনেক সময় বড় শহরে যেতে হয়। এতে চিকিৎসা ব্যয়ের পাশাপাশি যাতায়াত ও থাকার অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হয়।

সরকারের ‘অ্যারোগ্যা’ স্বাস্থ্য ও সুস্থতা কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা তাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনো পরিকল্পনার মূল্য তার ঘোষণায় নয়, বাস্তব ফলাফলে। গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ওষুধ, পরীক্ষার সরঞ্জাম, বিদ্যুৎ, পানি এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসক নিশ্চিত করা না গেলে অবকাঠামো তৈরি করলেই বৈষম্য দূর হবে না।

উন্নয়নের সিদ্ধান্তে গ্রামীণ মানুষকে মালিক করতে হবে

গ্রামীণ উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি সম্ভবত অর্থের চেয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে।

দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে গ্রামীণ উন্নয়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু যাদের জীবনকে সেই পরিকল্পনা বদলানোর কথা, তাদের কতটা সেই পরিকল্পনার মালিকানা দেওয়া হয়েছে?

গ্রামের সমস্যা সর্বত্র এক নয়। কোথাও কৃষি ও পানি প্রধান সমস্যা, কোথাও শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, আবার কোথাও বাজার ও কর্মসংস্থান। তাই স্থানীয় কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, পেশাজীবী, প্রশাসন এবং জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা প্রয়োজন।

এটি শুধু প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের প্রশ্ন নয়। এটি অর্থনৈতিক মালিকানার প্রশ্ন।

মানুষ যদি উন্নয়ন কর্মসূচিকে নিজেদের কর্মসূচি মনে করে, তাহলে তারা শুধু সুবিধা গ্রহণ করবে না; এর সাফল্যের জন্যও দায়িত্ব নেবে। এই জায়গাতেই আমি ‘তৃতীয় পথের’ ধারণাটি দেখি—রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্ষমতাকে মুখোমুখি না দাঁড় করিয়ে একই কাঠামোয় নিয়ে আসা।

প্রজা শক্তির লক্ষ্য আরও বড় হওয়া উচিত

শ্রীলঙ্কা সরকারের ‘প্রজা শক্তি’ কর্মসূচি গ্রামীণ ক্ষমতায়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এর মূল ধারণাকে আমি সমর্থন করি। তবে এর লক্ষ্য আরও বিস্তৃত করা যেতে পারে।

দারিদ্র্য বিমোচন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে কেবল দরিদ্র হিসেবে চিহ্নিত করে কোনো কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না। তাদের উৎপাদক, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং অর্থনৈতিক সম্পদ সৃষ্টির অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে।

প্রজা শক্তির আওতায় ১৪ হাজারের বেশি গ্রাম প্রশাসনিক বিভাগকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ এবং ১৩ হাজার ৯৭৭টি কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল গঠনের তথ্য রয়েছে। ২০২৬ সালের দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ ২৫ হাজার মিলিয়ন রুপির মধ্যে ২৩ হাজার মিলিয়ন রুপি অনুমোদন ও ছাড় করা হয়েছে বলেও তথ্য রয়েছে।

এই কাঠামোকে যদি গ্রামীণ উৎপাদন, বাজার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় বিনিয়োগের সঙ্গে আরও শক্তভাবে যুক্ত করা যায়, তাহলে এটি শুধু দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি থাকবে না; জাতীয় অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে।

Rural livelihood zones of Sri Lanka based on diversity of livelihood... |  Download Scientific Diagram

গ্রামীণ উন্নয়নই হতে পারে জাতীয় প্রবৃদ্ধির নতুন ইঞ্জিন

শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সংস্কার, লোকসান কমানো এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা প্রয়োজন। কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের বোঝা এমনভাবে বণ্টন করা উচিত নয় যাতে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, যারা এসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রায় কোনো ভূমিকা রাখেনি, তারাও পরোক্ষভাবে সেই ব্যয়ের ভার বহন করে।

আমাদের অর্থনৈতিক কৌশলে একটি মৌলিক পরিবর্তন দরকার। গ্রামীণ উন্নয়নকে কেন্দ্রের অর্থনৈতিক সাফল্যের অপেক্ষায় থাকা কোনো প্রান্তিক কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং জাতীয় প্রবৃদ্ধির একটি স্বতন্ত্র চালিকাশক্তি হিসেবে দেখতে হবে।

প্রায় চার-পঞ্চমাংশ মানুষ যদি গ্রামে বসবাস করে, দেশের খাদ্যনিরাপত্তা যদি মূলত গ্রামীণ উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল হয় এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বড় অংশ যদি গ্রামীণ অঞ্চলে থাকে, তাহলে গ্রামীণ অর্থনীতির দুর্বলতা আসলে পুরো দেশের অর্থনীতির দুর্বলতা।

শ্রীলঙ্কার সামনে তাই একটি সুযোগ রয়েছে। আমরা চাইলে গ্রামীণ উন্নয়নকে কেবল দারিদ্র্য বিমোচন থেকে উৎপাদনশীলতা, সম্পদ সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের নীতিতে রূপান্তর করতে পারি।

আধুনিক কৃষি, উন্নত বাজারব্যবস্থা, মূল্য সংযোজন, গ্রামীণ শিল্প, ডিজিটাল কর্মসংস্থান, মানসম্মত শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবাকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে নয়, একই অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

শেষ পর্যন্ত একটি দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের মূল্যায়ন শুধু তার রাজধানীর আর্থিক সূচক দিয়ে করা যায় না। প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষক বেশি আয় করবেন, তরুণরা নিজ এলাকায় দক্ষ কর্মসংস্থান পাবেন, শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা পাবে এবং পরিবারগুলো স্বাস্থ্যসেবার জন্য শহরে ছুটতে বাধ্য হবে না।

শ্রীলঙ্কার গ্রামীণ মানুষকে যদি উন্নয়নের সুবিধাভোগী থেকে উন্নয়নের মালিক বানানো যায়, তাহলে গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্জাগরণ শুধু গ্রামের চেহারা বদলাবে না। এটি পুরো দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎও বদলে দিতে পারে।

এটাই হতে পারে শ্রীলঙ্কার জন্য সেই তৃতীয় পথ—কেন্দ্রের সংস্কারের সঙ্গে প্রান্তের ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য বিমোচনের সঙ্গে সম্পদ সৃষ্টি এবং উন্নয়নের সঙ্গে স্থানীয় মালিকানার সমন্বয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

পূর্ববর্তী রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য তানিম সুফিয়ানী অব্যাহতি

অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করাতে গ্রামকেই করতে হবে প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র

০১:২৭:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬

শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি পুনর্গঠনের আলোচনা যতবার হয়েছে, ততবারই আমরা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার, আর্থিক শৃঙ্খলা, ঋণ ব্যবস্থাপনা কিংবা নগরকেন্দ্রিক বিনিয়োগকে সামনে এনেছি। এগুলো প্রয়োজনীয়—এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন আমাদের আরও গুরুত্ব দিয়ে করা উচিত: দেশের যে বিপুল জনগোষ্ঠী গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল, তাদের উৎপাদনশীলতা ও সম্পদ সৃষ্টির ক্ষমতা না বাড়িয়ে কি সত্যিই একটি শক্তিশালী জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব?

আমার দৃষ্টিতে, শ্রীলঙ্কার জন্য এর উত্তর হলো না।

দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে কেবল দারিদ্র্য বিমোচনের বিষয় হিসেবে দেখার সময় শেষ হয়েছে। এটিকে জাতীয় উৎপাদন, আয়, সম্পদ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে। এখানেই আমি একটি ‘তৃতীয় পথের’ প্রয়োজন দেখি—যেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের কাঠামোগত ও আর্থিক সংস্কারের পাশাপাশি গ্রামীণ জনগোষ্ঠী নিজেরাও উন্নয়নের পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত ও সম্পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়ার অংশীদার হবে।

কেন গ্রামীণ অর্থনীতিকে নতুনভাবে দেখতে হবে

শ্রীলঙ্কার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ গ্রামীণ এলাকায় বসবাস করে। অথচ আয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো এবং উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থানের সুযোগের বড় অংশ শহর ও নগরকেন্দ্রিক অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত।

এই বৈষম্যের সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু আয় কম হওয়া নয়। গ্রামীণ পরিবারের আর্থিক সুরক্ষাও অত্যন্ত দুর্বল। তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য এবং কৃষি উৎপাদনের মৌলিক উপকরণে ব্যয় হয়ে যায়। ফলে মূল্যস্ফীতি, ফসলহানি কিংবা জলবায়ুজনিত কোনো ধাক্কা তাদের জীবন ও জীবিকায় তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে।

আমরা বহু বছর ধরে ধরে নিয়েছি, কেন্দ্রীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সৃষ্টি হলে তার সুফল ধীরে ধীরে গ্রামাঞ্চলে পৌঁছে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়। কেন্দ্রের প্রবৃদ্ধি নিজে থেকে প্রান্তিক অঞ্চলের উৎপাদনশীলতা বাড়ায় না। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজন আলাদা অবকাঠামো, বাজারে প্রবেশাধিকার, দক্ষতা, প্রযুক্তি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ।

এ কারণে গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নকে জাতীয় অর্থনীতির মূল কৌশলের অংশ করা জরুরি।

Food insecurity in Sri Lanka likely to worsen amid poor agricultural  production, price spikes and ongoing economic crisis, FAO and WFP warn

কৃষি খাতের সম্ভাবনা এখনও অব্যবহৃত

শ্রীলঙ্কার খাদ্যনিরাপত্তা মূলত গ্রামীণ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। দেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্য চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ পূরণ করে গ্রামীণ কৃষি। ধান, সবজি, মসলা, ভুট্টা ও অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি ছোট কৃষকেরা চা ও রাবারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পণ্য উৎপাদনেও বড় ভূমিকা রাখেন।

কিন্তু এখানে একটি বড় অসামঞ্জস্য রয়েছে। প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ গ্রামীণ এলাকায় বসবাস করলেও কৃষি জাতীয় মোট দেশজ উৎপাদনের মাত্র প্রায় ৮ দশমিক ৪ শতাংশে অবদান রাখে।

এই ব্যবধানকে আমি শ্রীলঙ্কার জন্য একটি বিশাল অর্থনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখি।

আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত, কীভাবে একই জমি, পানি ও শ্রম থেকে আরও বেশি অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করা যায়। এর জন্য আধুনিক সেচ, উন্নত কৃষি গবেষণা, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদ এবং বৈজ্ঞানিকভাবে কৃষি উপকরণ ব্যবহারের দিকে যেতে হবে।

কৃষকের উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়

কৃষকের উৎপাদন বাড়লেও যদি তিনি বাজারে ন্যায্য মূল্য না পান, তাহলে জাতীয় উৎপাদনশীলতার উন্নতি তার সম্পদে পরিণত হবে না।

এ কারণেই কৃষিপণ্যের বাজারব্যবস্থায় সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। উৎপাদককে সরাসরি বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। একই সঙ্গে সংরক্ষণ, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা আধুনিক করতে হবে।

গ্রামীণ এলাকায় জলবায়ু-নিয়ন্ত্রিত সংরক্ষণাগার, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ক্যানিংয়ের মতো শিল্প গড়ে তোলা গেলে কৃষিপণ্যের মূল্য অনেক বাড়ানো সম্ভব। কাঁচা কৃষিপণ্য বিক্রির বদলে মূল্য সংযোজন করে তা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে নেওয়া গেলে কৃষকের আয় যেমন বাড়বে, তেমনি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও নতুন সম্পদ তৈরি হবে।

জলবায়ু ঝুঁকিও এখন কৃষি পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় বিষয় হওয়া উচিত। অনিয়মিত বৃষ্টি, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, বন্যা কিংবা খরা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কৃষকের আর্থিক নিরাপত্তা রক্ষায় এসব ঝুঁকি মোকাবিলার প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা কৃষিনীতি থেকে আলাদা রাখা যাবে না।

গ্রামকে শুধু কৃষির ওপর নির্ভরশীল রাখা যাবে না

তবে আমি মনে করি, গ্রামীণ অর্থনীতির ভবিষ্যৎ শুধু কৃষির ওপর নির্ভর করতে পারে না। কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে, কিন্তু একই সঙ্গে গ্রামাঞ্চলে নতুন শিল্প ও সেবা খাতও তৈরি করতে হবে।

গ্রামীণ প্রদেশগুলোতে হালকা শিল্প, পোশাক, পরিবেশবান্ধব পর্যটন এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা যেতে পারে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও বিনিয়োগ-সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে বেসরকারি খাতও এসব অঞ্চলে যেতে আগ্রহী হবে।

সমৃদ্ধ সমাজ ও ডিজিটাল অর্থনীতি : প্রেক্ষিত বেসরকারি উদ্যোগ

ডিজিটাল অর্থনীতিও এখানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। দ্রুতগতির ইন্টারনেট এবং স্থানীয় ডিজিটাল প্রশিক্ষণকেন্দ্র থাকলে গ্রামীণ তরুণরা তথ্যপ্রযুক্তি, গ্রাফিক ডিজাইন, অনলাইন সেবা ও দূরবর্তী কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে। এর ফলে কর্মসংস্থানের জন্য শহরে বাধ্যতামূলক অভিবাসনের চাপ কমবে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে ব্যয় হিসেবে দেখলে চলবে না

গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে সামাজিক খাতের আলাদা বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না। এগুলো অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতার মৌলিক অবকাঠামো।

শ্রীলঙ্কার ১০ হাজারের বেশি সরকারি স্কুলের মধ্যে মাত্র এক হাজার স্কুল বিজ্ঞান শাখাসহ উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা দেয়। এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অংশ শহর ও বড় আঞ্চলিক কেন্দ্রে অবস্থিত। ফলে গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গণিতভিত্তিক শিক্ষার ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকে।

গ্রামীণ এলাকায় আধুনিক ‘স্মার্ট স্কুল হাব’ তৈরি করে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতের সমান সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। শহরে না গিয়েও যদি একজন গ্রামীণ শিক্ষার্থী একই মানের শিক্ষা পায়, তাহলে সেটি শুধু শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি হবে না—ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের কাঠামোও বদলে দেবে।

স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা। বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য গ্রামীণ রোগীদের অনেক সময় বড় শহরে যেতে হয়। এতে চিকিৎসা ব্যয়ের পাশাপাশি যাতায়াত ও থাকার অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হয়।

সরকারের ‘অ্যারোগ্যা’ স্বাস্থ্য ও সুস্থতা কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা তাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনো পরিকল্পনার মূল্য তার ঘোষণায় নয়, বাস্তব ফলাফলে। গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ওষুধ, পরীক্ষার সরঞ্জাম, বিদ্যুৎ, পানি এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসক নিশ্চিত করা না গেলে অবকাঠামো তৈরি করলেই বৈষম্য দূর হবে না।

উন্নয়নের সিদ্ধান্তে গ্রামীণ মানুষকে মালিক করতে হবে

গ্রামীণ উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি সম্ভবত অর্থের চেয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে।

দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে গ্রামীণ উন্নয়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু যাদের জীবনকে সেই পরিকল্পনা বদলানোর কথা, তাদের কতটা সেই পরিকল্পনার মালিকানা দেওয়া হয়েছে?

গ্রামের সমস্যা সর্বত্র এক নয়। কোথাও কৃষি ও পানি প্রধান সমস্যা, কোথাও শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, আবার কোথাও বাজার ও কর্মসংস্থান। তাই স্থানীয় কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, পেশাজীবী, প্রশাসন এবং জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা প্রয়োজন।

এটি শুধু প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের প্রশ্ন নয়। এটি অর্থনৈতিক মালিকানার প্রশ্ন।

মানুষ যদি উন্নয়ন কর্মসূচিকে নিজেদের কর্মসূচি মনে করে, তাহলে তারা শুধু সুবিধা গ্রহণ করবে না; এর সাফল্যের জন্যও দায়িত্ব নেবে। এই জায়গাতেই আমি ‘তৃতীয় পথের’ ধারণাটি দেখি—রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্ষমতাকে মুখোমুখি না দাঁড় করিয়ে একই কাঠামোয় নিয়ে আসা।

প্রজা শক্তির লক্ষ্য আরও বড় হওয়া উচিত

শ্রীলঙ্কা সরকারের ‘প্রজা শক্তি’ কর্মসূচি গ্রামীণ ক্ষমতায়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এর মূল ধারণাকে আমি সমর্থন করি। তবে এর লক্ষ্য আরও বিস্তৃত করা যেতে পারে।

দারিদ্র্য বিমোচন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে কেবল দরিদ্র হিসেবে চিহ্নিত করে কোনো কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না। তাদের উৎপাদক, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং অর্থনৈতিক সম্পদ সৃষ্টির অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে।

প্রজা শক্তির আওতায় ১৪ হাজারের বেশি গ্রাম প্রশাসনিক বিভাগকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ এবং ১৩ হাজার ৯৭৭টি কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল গঠনের তথ্য রয়েছে। ২০২৬ সালের দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ ২৫ হাজার মিলিয়ন রুপির মধ্যে ২৩ হাজার মিলিয়ন রুপি অনুমোদন ও ছাড় করা হয়েছে বলেও তথ্য রয়েছে।

এই কাঠামোকে যদি গ্রামীণ উৎপাদন, বাজার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় বিনিয়োগের সঙ্গে আরও শক্তভাবে যুক্ত করা যায়, তাহলে এটি শুধু দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি থাকবে না; জাতীয় অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে।

Rural livelihood zones of Sri Lanka based on diversity of livelihood... |  Download Scientific Diagram

গ্রামীণ উন্নয়নই হতে পারে জাতীয় প্রবৃদ্ধির নতুন ইঞ্জিন

শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সংস্কার, লোকসান কমানো এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা প্রয়োজন। কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের বোঝা এমনভাবে বণ্টন করা উচিত নয় যাতে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, যারা এসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রায় কোনো ভূমিকা রাখেনি, তারাও পরোক্ষভাবে সেই ব্যয়ের ভার বহন করে।

আমাদের অর্থনৈতিক কৌশলে একটি মৌলিক পরিবর্তন দরকার। গ্রামীণ উন্নয়নকে কেন্দ্রের অর্থনৈতিক সাফল্যের অপেক্ষায় থাকা কোনো প্রান্তিক কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং জাতীয় প্রবৃদ্ধির একটি স্বতন্ত্র চালিকাশক্তি হিসেবে দেখতে হবে।

প্রায় চার-পঞ্চমাংশ মানুষ যদি গ্রামে বসবাস করে, দেশের খাদ্যনিরাপত্তা যদি মূলত গ্রামীণ উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল হয় এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বড় অংশ যদি গ্রামীণ অঞ্চলে থাকে, তাহলে গ্রামীণ অর্থনীতির দুর্বলতা আসলে পুরো দেশের অর্থনীতির দুর্বলতা।

শ্রীলঙ্কার সামনে তাই একটি সুযোগ রয়েছে। আমরা চাইলে গ্রামীণ উন্নয়নকে কেবল দারিদ্র্য বিমোচন থেকে উৎপাদনশীলতা, সম্পদ সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের নীতিতে রূপান্তর করতে পারি।

আধুনিক কৃষি, উন্নত বাজারব্যবস্থা, মূল্য সংযোজন, গ্রামীণ শিল্প, ডিজিটাল কর্মসংস্থান, মানসম্মত শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবাকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে নয়, একই অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

শেষ পর্যন্ত একটি দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের মূল্যায়ন শুধু তার রাজধানীর আর্থিক সূচক দিয়ে করা যায় না। প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষক বেশি আয় করবেন, তরুণরা নিজ এলাকায় দক্ষ কর্মসংস্থান পাবেন, শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা পাবে এবং পরিবারগুলো স্বাস্থ্যসেবার জন্য শহরে ছুটতে বাধ্য হবে না।

শ্রীলঙ্কার গ্রামীণ মানুষকে যদি উন্নয়নের সুবিধাভোগী থেকে উন্নয়নের মালিক বানানো যায়, তাহলে গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্জাগরণ শুধু গ্রামের চেহারা বদলাবে না। এটি পুরো দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎও বদলে দিতে পারে।

এটাই হতে পারে শ্রীলঙ্কার জন্য সেই তৃতীয় পথ—কেন্দ্রের সংস্কারের সঙ্গে প্রান্তের ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য বিমোচনের সঙ্গে সম্পদ সৃষ্টি এবং উন্নয়নের সঙ্গে স্থানীয় মালিকানার সমন্বয়।