০৩:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬
মোদি-ট্রাম্প বৈঠকে প্রশ্ন না করার অনুরোধ, ‘ভিভিআইপি সফরে এটাই স্বাভাবিক’ বলল ভারত পারান্দুরে দ্বিতীয় চেন্নাই বিমানবন্দর বাতিল, বিজয়ের সিদ্ধান্তে স্ট্যালিনের তীব্র ক্ষোভ দিল্লিতে ভারী বৃষ্টি-ঝড়, ১৫টি ফ্লাইট অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হলো ব্রাজিলে কংগ্রেসের ক্ষমতার দাপট: প্রেসিডেন্টের চেয়েও শক্তিশালী আইনসভা উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ, চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত বহাল যুক্তরাষ্ট্রের পানি অবকাঠামোই এখন সাইবার হামলার সহজ লক্ষ্য যত্রতত্র বালু তোলায় ভয়াবহ নদীভাঙন, বিলীন হচ্ছে বসতভিটা-ফসলি জমি ভালো ফলনেও আউশের দামে হতাশ হবিগঞ্জের কৃষক, মণ ৭০০–৮০০ টাকা সুন্দরবনে বনদস্যুদের হানা, ট্রলারসহ ৫ জেলে অপহরণ তিন মাসে আইপিএসের দাম বেড়েছে ৩২ শতাংশ, চার্জার ফ্যানেও ৫০ শতাংশ ঊর্ধ্বগতি

ইমরানকে হাসপাতালে নেওয়ার সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্যের অভিযোগ, সরকারের বিরুদ্ধে ৮ আইনজীবীর প্রতিবাদ

পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানকে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তরের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের ১৮ আগস্টের আদেশ সরকার ‘প্রকাশ্য, ইচ্ছাকৃত ও পরিকল্পিতভাবে লঙ্ঘন করেছে’ বলে অভিযোগ করেছেন পাকিস্তান বার কাউন্সিলের আট সদস্য।

শনিবার দেওয়া এক বিবৃতিতে তারা বলেন, সুপ্রিম কোর্টের আদেশ ছিল স্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন এবং বাধ্যতামূলক। কিন্তু নির্বাহী বিভাগ সেই আদেশ উপেক্ষা করে আদালতের নির্দেশনার সরাসরি অবমাননা করেছে।

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের মহাসচিব সালমান আকরাম রাজা, আবিদ শহীদ জুবেরি, মুহাম্মদ মাকসুদ বাট্টার, শফকত মাহমুদ চৌহান, মুনির আহমেদ কাকার, আবদুল সাত্তার খান, সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং কাজী মুহাম্মদ আরশাদ।

আদালতের আদেশ অমান্য গুরুতর আঘাত

আট সদস্য বলেন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য করার কোনো ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের নেই। তাদের মতে, এই ঘটনা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, কর্তৃত্ব ও মর্যাদার ওপর গুরুতর আঘাত এবং আইনের শাসন ও সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থার ভিত্তিকে দুর্বল করেছে।

তারা বলেন, নির্বাহী বিভাগ যদি ইচ্ছামতো সুপ্রিম কোর্টের আদেশ উপেক্ষা করতে পারে, তাহলে সংবিধানে নির্ধারিত ক্ষমতার বিভাজনের কোনো অর্থ থাকে না।

তাদের ভাষ্য, সরকারের এই পদক্ষেপ পাকিস্তানের জনগণের মৌলিক অধিকারের জন্যও সরাসরি হুমকি। বিচারিক আদেশ রাষ্ট্রের স্বেচ্ছাচারী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সংবিধানের অন্যতম প্রধান সুরক্ষা। এসব আদেশ উপেক্ষা করা হলে আদালতের কর্তৃত্ব, আইনের শাসন এবং সংবিধান—সবই দুর্বল হয়ে পড়ে।

পুনর্বিবেচনার আবেদন আদেশ স্থগিত করে না

বার কাউন্সিলের ওই সদস্যরা বলেন, ১৮ আগস্টের আদেশের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদেই তা বাস্তবায়ন না করার পরিণতি স্পষ্ট করা হয়েছে। সরকারও আদালতের নির্দেশের বাধ্যতামূলক চরিত্র এবং তা অমান্য করার পরিণতি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত ছিল।

তারা আরও বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে পুনর্বিবেচনার আবেদন দাখিল করা আদালতের আদেশ স্থগিত করে না। একইভাবে, ওই আবেদন সরকারকে আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করার কোনো বৈধতা দেয় না।

Govt faces lawyers' ire over Imran hospital order

আট সদস্য দাবি করেন, যারা আদালতের নির্দেশ লঙ্ঘনের জন্য দায়ী, তাদের শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

সাংবিধানিক সংশোধনীর অজুহাতেও আদেশ অমান্য করা যাবে না

বিবৃতিতে বলা হয়, ২৬তম ও ২৭তম সাংবিধানিক সংশোধনী ইতোমধ্যে আইনের শাসন, বিচার বিভাগ ও সংবিধানের সর্বোচ্চ মর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবে এসব সংশোধনী চলমান কোনো সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অমান্য করার সাংবিধানিক সুরক্ষা দিতে পারে না।

তাদের মতে, কোনো সাংবিধানিক সংশোধনী, রাজনৈতিক বিবেচনা কিংবা নির্বাহী সিদ্ধান্ত সরকারকে বাধ্যতামূলক বিচারিক নির্দেশের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে পারে না। সংবিধান নির্বাহী বিভাগকে নিজের ইচ্ছামতো কোন আদালতের আদেশ মানবে আর কোনটি মানবে না—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেয় না।

ইমরানের চিকিৎসায় বৈষম্যের অভিযোগ

আট সদস্য ইমরান খানের চিকিৎসার বিষয়টি নিয়ে আরও প্রশ্ন তোলেন। তারা বলেন, দণ্ডিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের অতীতে যে ধরনের চিকিৎসা-সুবিধা দেওয়া হয়েছে, ইমরানের ক্ষেত্রে তার সঙ্গে বর্তমান আচরণের স্পষ্ট বৈপরীত্য রয়েছে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের প্রসঙ্গ তুলে তারা বলেন, একজন সাবেক রাজনৈতিক নেতা দণ্ডিত হওয়ার পরও আদালতের আদেশ এবং ৫০ রুপির স্ট্যাম্প পেপারে দেওয়া অঙ্গীকারের ভিত্তিতে চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার অনুমতি পেয়েছিলেন।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, জীবন, স্বাস্থ্য, মর্যাদা ও চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার কি ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় ও পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্নভাবে প্রয়োগ করা হবে?

আট সদস্যের বক্তব্য থেকে নিজেদের দূরে সরাল বার কাউন্সিল

এদিকে পাকিস্তান বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান পীর মুহাম্মদ মাসুদ চিস্তি জানিয়েছেন, কাউন্সিলের ২৩ সদস্যের মধ্যে আটজন যে বিবৃতি দিয়েছেন, সেটি কেবল ওই সদস্যদের ব্যক্তিগত অবস্থান। এটিকে পুরো বার কাউন্সিলের সম্মিলিত অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক নীতিতে পরিচালিত কোনো প্রতিষ্ঠানে সংখ্যালঘু সদস্যরা সংখ্যাগরিষ্ঠের অবস্থান নির্ধারণ করতে পারেন না।

বার কাউন্সিল একটি আইনজীবী সংগঠন এবং এটিকে রাজনৈতিক স্বার্থ ও ব্যক্তিগত এজেন্ডার ঊর্ধ্বে থাকতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, বার কাউন্সিল কিংবা উচ্চতর বিচার বিভাগ—কোনোটিকেই রাজনৈতিকীকরণ করা বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা উচিত নয়।

বার কাউন্সিল আট সদস্যের পাশাপাশি লাহোর হাইকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের দেওয়া বিবৃতিরও নিন্দা জানিয়েছে এবং স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এসব বক্তব্যের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কোনো সম্পর্ক নেই।

কাউন্সিল বলেছে, এসব বিবৃতি আইনজীবী সমাজ বা প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত মতামত, অবস্থান কিংবা নীতির প্রতিফলন নয়। পাকিস্তানের আইনজীবীদের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বার প্রতিনিধিদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আইনজীবী সংগঠনের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা উচিত নয়।

কাউন্সিল আরও জানিয়েছে, তারা আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংবিধানের সর্বোচ্চ মর্যাদা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদায় বিশ্বাসী। সব সদস্যের কাছ থেকেই এসব মৌলিক নীতি মেনে চলা এবং পাকিস্তান বার কাউন্সিলের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষার প্রত্যাশা করা হয়।

8 Pakistan Bar Council members condemn govt's 'wilful disregard' of SC order  on Imran's hospital transfer - Pakistan - DAWN.COM

ইমরানকে হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট

১৮ আগস্ট সুপ্রিম কোর্ট সরকারকে ইমরান খানকে পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য দুই দিনের মধ্যে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছিল।

বিচারপতি শহীদ ওয়াহিদের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি নাঈম আখতার আফগান ও বিচারপতি ইশতিয়াক ইব্রাহিম। ইমরানকে হাসপাতালে ভর্তি, ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ এবং তাঁর চিকিৎসার নথি পরিবারের কাছে দেওয়ার দাবিতে করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত অন্তর্বর্তী নির্দেশনা দেন।

আদালত আরও নির্দেশ দিয়েছিল, চিকিৎসা বোর্ডের পরীক্ষার সময় ইমরানের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. উজমা খান এবং ডা. ফয়সাল সুলতানকে উপস্থিত থাকতে হবে।

একই সঙ্গে পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত ইমরানের পরিবারের সদস্য, পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের নেতাকর্মী এবং তাঁর আইনজীবীদের তাঁর শারীরিক অবস্থা বা চিকিৎসা প্রতিবেদন সংবাদমাধ্যম কিংবা জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করতে নিষেধ করা হয়।

হাসপাতালে নেওয়ার বদলে কারাগারে ফেরত

পরদিন সরকার ইমরানকে বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের আদেশের বিরুদ্ধে পুনর্বিবেচনার আবেদন করে। সরকারের দাবি ছিল, আদালতের নির্দেশটি বৈষম্যমূলক এবং কারাগারের বিধি ও স্বাভাবিক বিচারনীতির পরিপন্থী।

তবে বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট আবেদনটি ফেরত দেয়। আদালত জানায়, হলফনামা ও তথ্যের বিবরণ এবং সংবিধানের ১৮৮ অনুচ্ছেদের অধীনে করা পুনর্বিবেচনার আবেদন যথাযথভাবে প্রস্তুত করা হয়নি। এ ছাড়া নথির একটি সংকলনও সঠিক অবস্থায় ছিল না।

এরপর বৃহস্পতিবার রাতে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। সবকিছু দেখে ধারণা করা হচ্ছিল, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে ইমরানকে সেখানে নেওয়া হবে।

কিন্তু শুক্রবার সকালে জানা যায়, ইমরানকে প্রথমে পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসে নিয়ে পরীক্ষা করা হয় এবং পরে আবার কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার এ জন্য শিফা হাসপাতালের পথে ও হাসপাতালের বাইরে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের কর্মীদের তৈরি করা ‘নিরাপত্তা পরিস্থিতি’কে দায়ী করেন।

তিনি জানান, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের আলোকে ২০ ও ২১ আগস্টের মধ্যবর্তী রাতে যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে ইমরানকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে চক্ষু বিশেষজ্ঞ, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকসহ একটি যোগ্য চিকিৎসক দল তাঁর বিস্তারিত পরীক্ষা করে তাঁকে চিকিৎসাগতভাবে সুস্থ ঘোষণা করে।

পরে পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস কর্তৃপক্ষ জানায়, শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালের দুই বিশেষজ্ঞ ইমরানের চোখের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। অন্যান্য পরীক্ষা ওই হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা সম্পন্ন করেন।

ইমরানের ডান চোখে কেন্দ্রীয় রেটিনার শিরা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সমস্যা ধরা পড়ার পর থেকে তাঁকে একাধিকবার পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসে নেওয়া হয়েছে।

কর্তৃপক্ষ জানায়, চোখের চিকিৎসা-সংক্রান্ত পরীক্ষার ফলাফল এবং সেখানে পরিচালিত অন্যান্য পরীক্ষার ফল একত্রে বিবেচনা করা হয়েছে।

এদিকে বৃহস্পতিবার সরকার ১৮ আগস্টের সুপ্রিম কোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে নতুন করে পুনর্বিবেচনার আবেদন করে। ইসলামাবাদের প্রধান কমিশনারও ওই আবেদন করেন। তাঁর দাবি, বিষয়টির সঙ্গে তাঁর দপ্তরের সরাসরি, গুরুত্বপূর্ণ ও আইনগতভাবে সুরক্ষিত স্বার্থ জড়িত এবং ১৮ আগস্টের আদেশ তাঁর সাংবিধানিক কর্তৃত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

মোদি-ট্রাম্প বৈঠকে প্রশ্ন না করার অনুরোধ, ‘ভিভিআইপি সফরে এটাই স্বাভাবিক’ বলল ভারত

ইমরানকে হাসপাতালে নেওয়ার সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্যের অভিযোগ, সরকারের বিরুদ্ধে ৮ আইনজীবীর প্রতিবাদ

০২:২৪:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬

পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানকে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তরের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের ১৮ আগস্টের আদেশ সরকার ‘প্রকাশ্য, ইচ্ছাকৃত ও পরিকল্পিতভাবে লঙ্ঘন করেছে’ বলে অভিযোগ করেছেন পাকিস্তান বার কাউন্সিলের আট সদস্য।

শনিবার দেওয়া এক বিবৃতিতে তারা বলেন, সুপ্রিম কোর্টের আদেশ ছিল স্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন এবং বাধ্যতামূলক। কিন্তু নির্বাহী বিভাগ সেই আদেশ উপেক্ষা করে আদালতের নির্দেশনার সরাসরি অবমাননা করেছে।

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের মহাসচিব সালমান আকরাম রাজা, আবিদ শহীদ জুবেরি, মুহাম্মদ মাকসুদ বাট্টার, শফকত মাহমুদ চৌহান, মুনির আহমেদ কাকার, আবদুল সাত্তার খান, সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং কাজী মুহাম্মদ আরশাদ।

আদালতের আদেশ অমান্য গুরুতর আঘাত

আট সদস্য বলেন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য করার কোনো ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের নেই। তাদের মতে, এই ঘটনা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, কর্তৃত্ব ও মর্যাদার ওপর গুরুতর আঘাত এবং আইনের শাসন ও সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থার ভিত্তিকে দুর্বল করেছে।

তারা বলেন, নির্বাহী বিভাগ যদি ইচ্ছামতো সুপ্রিম কোর্টের আদেশ উপেক্ষা করতে পারে, তাহলে সংবিধানে নির্ধারিত ক্ষমতার বিভাজনের কোনো অর্থ থাকে না।

তাদের ভাষ্য, সরকারের এই পদক্ষেপ পাকিস্তানের জনগণের মৌলিক অধিকারের জন্যও সরাসরি হুমকি। বিচারিক আদেশ রাষ্ট্রের স্বেচ্ছাচারী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সংবিধানের অন্যতম প্রধান সুরক্ষা। এসব আদেশ উপেক্ষা করা হলে আদালতের কর্তৃত্ব, আইনের শাসন এবং সংবিধান—সবই দুর্বল হয়ে পড়ে।

পুনর্বিবেচনার আবেদন আদেশ স্থগিত করে না

বার কাউন্সিলের ওই সদস্যরা বলেন, ১৮ আগস্টের আদেশের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদেই তা বাস্তবায়ন না করার পরিণতি স্পষ্ট করা হয়েছে। সরকারও আদালতের নির্দেশের বাধ্যতামূলক চরিত্র এবং তা অমান্য করার পরিণতি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত ছিল।

তারা আরও বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে পুনর্বিবেচনার আবেদন দাখিল করা আদালতের আদেশ স্থগিত করে না। একইভাবে, ওই আবেদন সরকারকে আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করার কোনো বৈধতা দেয় না।

Govt faces lawyers' ire over Imran hospital order

আট সদস্য দাবি করেন, যারা আদালতের নির্দেশ লঙ্ঘনের জন্য দায়ী, তাদের শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

সাংবিধানিক সংশোধনীর অজুহাতেও আদেশ অমান্য করা যাবে না

বিবৃতিতে বলা হয়, ২৬তম ও ২৭তম সাংবিধানিক সংশোধনী ইতোমধ্যে আইনের শাসন, বিচার বিভাগ ও সংবিধানের সর্বোচ্চ মর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবে এসব সংশোধনী চলমান কোনো সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অমান্য করার সাংবিধানিক সুরক্ষা দিতে পারে না।

তাদের মতে, কোনো সাংবিধানিক সংশোধনী, রাজনৈতিক বিবেচনা কিংবা নির্বাহী সিদ্ধান্ত সরকারকে বাধ্যতামূলক বিচারিক নির্দেশের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে পারে না। সংবিধান নির্বাহী বিভাগকে নিজের ইচ্ছামতো কোন আদালতের আদেশ মানবে আর কোনটি মানবে না—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেয় না।

ইমরানের চিকিৎসায় বৈষম্যের অভিযোগ

আট সদস্য ইমরান খানের চিকিৎসার বিষয়টি নিয়ে আরও প্রশ্ন তোলেন। তারা বলেন, দণ্ডিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের অতীতে যে ধরনের চিকিৎসা-সুবিধা দেওয়া হয়েছে, ইমরানের ক্ষেত্রে তার সঙ্গে বর্তমান আচরণের স্পষ্ট বৈপরীত্য রয়েছে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের প্রসঙ্গ তুলে তারা বলেন, একজন সাবেক রাজনৈতিক নেতা দণ্ডিত হওয়ার পরও আদালতের আদেশ এবং ৫০ রুপির স্ট্যাম্প পেপারে দেওয়া অঙ্গীকারের ভিত্তিতে চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার অনুমতি পেয়েছিলেন।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, জীবন, স্বাস্থ্য, মর্যাদা ও চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার কি ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় ও পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্নভাবে প্রয়োগ করা হবে?

আট সদস্যের বক্তব্য থেকে নিজেদের দূরে সরাল বার কাউন্সিল

এদিকে পাকিস্তান বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান পীর মুহাম্মদ মাসুদ চিস্তি জানিয়েছেন, কাউন্সিলের ২৩ সদস্যের মধ্যে আটজন যে বিবৃতি দিয়েছেন, সেটি কেবল ওই সদস্যদের ব্যক্তিগত অবস্থান। এটিকে পুরো বার কাউন্সিলের সম্মিলিত অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক নীতিতে পরিচালিত কোনো প্রতিষ্ঠানে সংখ্যালঘু সদস্যরা সংখ্যাগরিষ্ঠের অবস্থান নির্ধারণ করতে পারেন না।

বার কাউন্সিল একটি আইনজীবী সংগঠন এবং এটিকে রাজনৈতিক স্বার্থ ও ব্যক্তিগত এজেন্ডার ঊর্ধ্বে থাকতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, বার কাউন্সিল কিংবা উচ্চতর বিচার বিভাগ—কোনোটিকেই রাজনৈতিকীকরণ করা বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা উচিত নয়।

বার কাউন্সিল আট সদস্যের পাশাপাশি লাহোর হাইকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের দেওয়া বিবৃতিরও নিন্দা জানিয়েছে এবং স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এসব বক্তব্যের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কোনো সম্পর্ক নেই।

কাউন্সিল বলেছে, এসব বিবৃতি আইনজীবী সমাজ বা প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত মতামত, অবস্থান কিংবা নীতির প্রতিফলন নয়। পাকিস্তানের আইনজীবীদের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বার প্রতিনিধিদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আইনজীবী সংগঠনের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা উচিত নয়।

কাউন্সিল আরও জানিয়েছে, তারা আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংবিধানের সর্বোচ্চ মর্যাদা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদায় বিশ্বাসী। সব সদস্যের কাছ থেকেই এসব মৌলিক নীতি মেনে চলা এবং পাকিস্তান বার কাউন্সিলের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষার প্রত্যাশা করা হয়।

8 Pakistan Bar Council members condemn govt's 'wilful disregard' of SC order  on Imran's hospital transfer - Pakistan - DAWN.COM

ইমরানকে হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট

১৮ আগস্ট সুপ্রিম কোর্ট সরকারকে ইমরান খানকে পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য দুই দিনের মধ্যে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছিল।

বিচারপতি শহীদ ওয়াহিদের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি নাঈম আখতার আফগান ও বিচারপতি ইশতিয়াক ইব্রাহিম। ইমরানকে হাসপাতালে ভর্তি, ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ এবং তাঁর চিকিৎসার নথি পরিবারের কাছে দেওয়ার দাবিতে করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত অন্তর্বর্তী নির্দেশনা দেন।

আদালত আরও নির্দেশ দিয়েছিল, চিকিৎসা বোর্ডের পরীক্ষার সময় ইমরানের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. উজমা খান এবং ডা. ফয়সাল সুলতানকে উপস্থিত থাকতে হবে।

একই সঙ্গে পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত ইমরানের পরিবারের সদস্য, পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের নেতাকর্মী এবং তাঁর আইনজীবীদের তাঁর শারীরিক অবস্থা বা চিকিৎসা প্রতিবেদন সংবাদমাধ্যম কিংবা জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করতে নিষেধ করা হয়।

হাসপাতালে নেওয়ার বদলে কারাগারে ফেরত

পরদিন সরকার ইমরানকে বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের আদেশের বিরুদ্ধে পুনর্বিবেচনার আবেদন করে। সরকারের দাবি ছিল, আদালতের নির্দেশটি বৈষম্যমূলক এবং কারাগারের বিধি ও স্বাভাবিক বিচারনীতির পরিপন্থী।

তবে বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট আবেদনটি ফেরত দেয়। আদালত জানায়, হলফনামা ও তথ্যের বিবরণ এবং সংবিধানের ১৮৮ অনুচ্ছেদের অধীনে করা পুনর্বিবেচনার আবেদন যথাযথভাবে প্রস্তুত করা হয়নি। এ ছাড়া নথির একটি সংকলনও সঠিক অবস্থায় ছিল না।

এরপর বৃহস্পতিবার রাতে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। সবকিছু দেখে ধারণা করা হচ্ছিল, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে ইমরানকে সেখানে নেওয়া হবে।

কিন্তু শুক্রবার সকালে জানা যায়, ইমরানকে প্রথমে পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসে নিয়ে পরীক্ষা করা হয় এবং পরে আবার কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার এ জন্য শিফা হাসপাতালের পথে ও হাসপাতালের বাইরে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের কর্মীদের তৈরি করা ‘নিরাপত্তা পরিস্থিতি’কে দায়ী করেন।

তিনি জানান, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের আলোকে ২০ ও ২১ আগস্টের মধ্যবর্তী রাতে যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে ইমরানকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে চক্ষু বিশেষজ্ঞ, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকসহ একটি যোগ্য চিকিৎসক দল তাঁর বিস্তারিত পরীক্ষা করে তাঁকে চিকিৎসাগতভাবে সুস্থ ঘোষণা করে।

পরে পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস কর্তৃপক্ষ জানায়, শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালের দুই বিশেষজ্ঞ ইমরানের চোখের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। অন্যান্য পরীক্ষা ওই হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা সম্পন্ন করেন।

ইমরানের ডান চোখে কেন্দ্রীয় রেটিনার শিরা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সমস্যা ধরা পড়ার পর থেকে তাঁকে একাধিকবার পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসে নেওয়া হয়েছে।

কর্তৃপক্ষ জানায়, চোখের চিকিৎসা-সংক্রান্ত পরীক্ষার ফলাফল এবং সেখানে পরিচালিত অন্যান্য পরীক্ষার ফল একত্রে বিবেচনা করা হয়েছে।

এদিকে বৃহস্পতিবার সরকার ১৮ আগস্টের সুপ্রিম কোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে নতুন করে পুনর্বিবেচনার আবেদন করে। ইসলামাবাদের প্রধান কমিশনারও ওই আবেদন করেন। তাঁর দাবি, বিষয়টির সঙ্গে তাঁর দপ্তরের সরাসরি, গুরুত্বপূর্ণ ও আইনগতভাবে সুরক্ষিত স্বার্থ জড়িত এবং ১৮ আগস্টের আদেশ তাঁর সাংবিধানিক কর্তৃত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।