আউশ মৌসুমে হবিগঞ্জের মাধবপুরে ধানের ফলন ভালো হলেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। তাদের অভিযোগ, আউশ মৌসুমে সরকারি ধান সংগ্রহ না হওয়া এবং বাজারে ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের কারণে উৎপাদিত ধানের দাম কমে গেছে। বর্তমানে প্রতি মণ আউশ ধান ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকরা।
উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাড়েনি ধানের দাম
কৃষকদের ভাষ্য, সার, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি, জমি প্রস্তুত, সেচ, ধান কাটা, মাড়াই ও পরিবহন—প্রায় প্রতিটি পর্যায়েই খরচ বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় ধানের দাম বাড়েনি। ফলে ভালো ফলন পেয়েও অনেক কৃষক লাভের মুখ দেখছেন না।
তেলিয়াপাড়ার কৃষক মো. আমজাদ বলেন, ফলন ভালো হলেও উৎপাদনে যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, ধান বিক্রি করে তা তোলা যাচ্ছে না। সার-কীটনাশক ও কৃষি শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির পাশাপাশি ধান কাটা ও মাড়াইয়ের খরচও বেড়েছে।
মাধবপুরে ৬ হাজার ৮১২ হেক্টর জমিতে আউশ আবাদ
মাধবপুর উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর উপজেলায় ৬ হাজার ৮১২ হেক্টর জমিতে আউশ আবাদ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে মাঠজুড়ে ভালো ফলন দেখা যাচ্ছে। কৃষি কর্মকর্তাদের আশা, এ মৌসুমে হেক্টরপ্রতি প্রায় ৪ দশমিক ৭ টন ফলন হতে পারে।
ধর্মঘর এলাকার কৃষক আমির আলী জানান, জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি—সব মিলিয়ে ধান আবাদে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে হয়। এক বিঘা জমির ধান হারভেস্টারে কাটতেই প্রায় ২ হাজার ৮০০ টাকা খরচ হচ্ছে। এর সঙ্গে মাড়াই, পরিবহন ও বাজারজাতের ব্যয়ও যোগ হচ্ছে।
ফড়িয়াদের কাছে কম দামে ধান বিক্রির অভিযোগ
কৃষকদের অভিযোগ, ধান ঘরে ওঠার পরই মৌসুমি ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীরা সক্রিয় হয়ে ওঠেন। উৎপাদন খরচ মেটানো এবং শ্রমিকসহ বিভিন্ন পাওনা পরিশোধের জন্য অনেক কৃষকের হাতে নগদ অর্থের প্রয়োজন হয়। ফলে ধান মজুত করে ভালো দামের অপেক্ষা করার সুযোগ না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করেন।
কৃষক শহীদ মিয়ার প্রশ্ন, কৃষককে উৎপাদনে উৎসাহিত করতে শুধু প্রণোদনা ও কৃষি পরামর্শ যথেষ্ট নয়। আউশ মৌসুমে সরকারি ধান কেনা না হলে বাজারে দাম কমে যায়। তাই উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যায্যমূল্য নির্ধারণের দাবি জানান তিনি।
কৃষক কায়সার বলেন, কয়েক বছর আগে ধানের দাম কমে যাওয়ায় অনেক কৃষক ধান চাষ ছেড়ে দিয়েছিলেন। আবারও একই পরিস্থিতি তৈরি হলে কৃষকের মধ্যে চাষাবাদে অনাগ্রহ তৈরি হতে পারে। উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকের হাতে উৎপাদিত ধান বিক্রি করে কত অর্থ থাকে, সেই বিষয়টিও বিবেচনায় নিয়ে দাম নির্ধারণের দাবি জানান তিনি।
কৃষি কর্মকর্তা: ফলন ভালো, দাম নিয়ে হতাশা আছে
মাধবপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সজীব সরকার বলেন, কৃষকদের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করার পাশাপাশি বিনামূল্যে সার ও বীজ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে এ বছর আউশের ফলন ভালো হয়েছে। তবে ধানের দাম নিয়ে কৃষকদের মধ্যে কিছুটা হতাশা রয়েছে। কৃষক যাতে ন্যায্যমূল্য পান, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া প্রয়োজন।
উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা রেজাউর ইসলাম জানান, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ধান সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তবে আউশ মৌসুমে সরকারিভাবে ধান কেনা হয় না। বাজারে ধানের দাম নির্ধারণে খাদ্য বিভাগের সরাসরি তেমন কোনো ভূমিকা নেই।
মাধবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, এ বছর আউশ মৌসুমে সরকারি উদ্যোগে বড় আকারে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে এবং সরকারি ভর্তুকিতে হারভেস্টার মেশিনও দেওয়া হয়েছে। কৃষক যাতে উৎপাদিত ধানের ভালো দাম পান, সে বিষয়েও মাঠপর্যায়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















