শেরপুরের নকলা উপজেলার চরাঞ্চলের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত মৃগী ও পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে বছরের পর বছর ধরে চলছে ভাঙন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নদীর বিভিন্ন স্থানে যত্রতত্র বালু উত্তোলন। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ড্রেজার দিয়ে নদীর তলদেশে গভীর গর্ত করে বালু তোলায় নদীর গতিপথ বদলে গেছে। ফলে বর্ষাকালের ভাঙন এখন অনেকটা বছরজুড়েই স্থায়ী রূপ নিয়েছে।
নদীভাঙনে বিলীন বসতভিটা-ফসলি জমি
চন্দ্রকোনা ও চরঅষ্টধার ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা বাড়ছে। ভারতের মেঘালয় ও গারো পাহাড়ের পাদদেশ থেকে উৎপত্তি হওয়া মৃগী নদী শেরপুর হয়ে নকলা উপজেলার চন্দ্রকোনা ও চরঅষ্টধার দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। কয়েক বছর ধরে নদীটি পূর্ব দিক থেকে গতিপথ পরিবর্তন করে উত্তর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
চন্দ্রকোনা বাজারের কাছাকাছি চকবরইগাজী ঈদগা মাঠ, চিকারবাড়ি ঘাট ও দক্ষিণপাড়া এলাকায় নদীর ভাঙনে বসতভিটা, কৃষিজমি, রাস্তা ও বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চিকারবাড়ি ঘাটের অস্তিত্বও এখন নেই। স্থানীয়দের হিসাবে, শুধু ওই এলাকায় ১০ একরের বেশি কৃষিজমি নদীতে বিলীন হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মাহবুবুর রহমান জানান, চলতি বছর প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। অনেক পরিবার তাদের বাড়িঘর ও জমি হারিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নদীতে দীর্ঘদিন পলি জমলেও খননের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে ড্রেজার বসিয়ে বালু তোলার কারণে নদীর তলদেশে গভীর খাদ তৈরি হয়েছে। এতে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে ভাঙন আরও ভয়াবহ হয়েছে বলে তাদের দাবি।
ঘরবাড়ির পর হুমকিতে জনপদ
চরমধুয়া গ্রামেও নদীভাঙন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। ধান, পাট, ভুট্টা ও সরিষা চাষের ওপর নির্ভরশীল বহু পরিবার ইতোমধ্যে বসতভিটা ও কৃষিজমি হারিয়েছে। কেউ দূরে গিয়ে ঘর তুলে দিনমজুরের কাজ করছেন, আবার কেউ জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় চলে গেছেন।
ভাঙনে চরমধুয়া গ্রামের প্রায় তিন কিলোমিটার সড়কের বড় অংশ বিলীন হয়েছে। ফলে কৃষিপণ্য পরিবহনেও তৈরি হয়েছে দুর্ভোগ। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে চরমধুয়া নামাপাড়া এলাকা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিন হাজারের বেশি মানুষের বসবাস করা এ গ্রামে কবরস্থান, কমিউনিটি ক্লিনিক, গুচ্ছগ্রাম, মসজিদ ও বিদ্যালয়ও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
পুরাতন ব্রহ্মপুত্রেও ভাঙন
চরঅষ্টধার ইউনিয়নের নারায়ণখোলা, রেহাই অষ্টধার ও দক্ষিণ নারায়ণখোলা এলাকাতেও পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদীভাঙনে বহু বসতঘর ও কৃষিজমি বিলীন হয়েছে। দক্ষিণ নারায়ণখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও নদীগর্ভে চলে গেছে।
প্রশাসনের উদ্যোগ ও প্রকল্প
নকলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছেন, মৃগী নদীর ভাঙনকবলিত এলাকা জরুরি ভিত্তিতে মেরামত প্রয়োজন। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। পানি উন্নয়ন বোর্ড এ বিষয়ে একটি প্রস্তাবও তৈরি করেছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শতাধিক ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
শেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী আব্দুর রহিম জানান, নারায়ণখোলা রেহাই অষ্টধার এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ৫০০ মিটার অংশে অস্থায়ীভাবে ভাঙন ঠেকাতে ১ কোটি ৯০ লাখ টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। চরমধুয়া এলাকায় ৮৫০ মিটার ভাঙন প্রতিরোধে ২ কোটি ৮০ লাখ টাকার প্রাক্কলন তৈরি করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ও বরাদ্দ পাওয়া গেলে কাজ শুরু হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুদীপ্ত চৌধুরীও জানিয়েছেন, চরমধুয়া নামাপাড়া এলাকায় প্রায় সাড়ে ৮০০ মিটার অংশ অস্থায়ীভাবে মেরামতের জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার মতে, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে ভাঙন ঠেকানো কঠিন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















