যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পানি অবকাঠামো ক্রমেই সাইবার হামলার ঝুঁকিতে পড়ছে। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশগুলোর একটি হলেও পানি সরবরাহ ও বর্জ্যপানি ব্যবস্থার সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশটির সক্ষমতা এখনো দুর্বল। চলতি গ্রীষ্মে অন্তত সাতটি অঙ্গরাজ্যের পানি ও বর্জ্যপানি স্থাপনায় হ্যাকারদের অনুপ্রবেশের ঘটনা সেই দুর্বলতাকেই সামনে এনেছে।
২৭ জুলাই মিনেসোটার মিনিয়াপোলিসের কাছে ম্যাপল প্লেইন জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। একই দিনে আটলান্টার দক্ষিণে প্রায় তিন লাখ মানুষকে পানি সরবরাহকারী ক্লেটন কাউন্টি ওয়াটার অথরিটি পানির চাপ কমে যাওয়ার পর গ্রাহকদের পানি ফুটিয়ে পান করার পরামর্শ দেয়। মোট ৩০টি কমিউনিটি পানি ব্যবস্থা আক্রান্ত হওয়ায় মিনেসোটা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের প্রাথমিক মূল্যায়নে এসব হামলার সঙ্গে ইরান-সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর যোগসূত্রের কথা উঠে এসেছে।
পানি অবকাঠামোর দুর্বলতা
সাইবার হামলায় পানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পানির নিরাপত্তাও হুমকিতে পড়তে পারে। সাম্প্রতিক হামলাগুলোতে এখন পর্যন্ত এমন ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে পানি ব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করা নতুন নয়। ২০১৩ সালে ইরানি হ্যাকাররা নিউইয়র্কের একটি ছোট বাঁধের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় ঢুকে পড়েছিল। ২০২৩ সালে পেনসিলভানিয়ার একটি পানি স্থাপনার পাম্পও হ্যাকারদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
পানি ব্যবস্থা বিদ্যুৎ অবকাঠামোর তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার অন্যতম কারণ এর বিচ্ছিন্ন কাঠামো। প্রায় ৯০ শতাংশ পানি সরবরাহকারী সংস্থা স্থানীয় সরকারের মালিকানাধীন এবং অধিকাংশই ১০ হাজারের কম মানুষকে সেবা দেয়। ফলে পুরোনো কম্পিউটার ব্যবস্থা আধুনিকায়ন ও সাইবার নিরাপত্তায় বিনিয়োগের সক্ষমতা অনেকেরই সীমিত।
সহজেই প্রবেশ করছে হ্যাকাররা
সাম্প্রতিক হামলায় ব্যবহৃত পদ্ধতিও খুব জটিল ছিল না। হ্যাকাররা এমন অপারেশনাল প্রযুক্তি ব্যবস্থায় ঢুকেছে, যা কম্পিউটার নেটওয়ার্ককে বাস্তব অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ব্যবস্থা ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে এবং দুর্বল পাসওয়ার্ড কিংবা কোনো ধরনের শক্তিশালী পরিচয় যাচাই ছাড়াই পরিচালিত হয়।
২০১৯ সালে কানসাসে একটি পানি জেলার সাবেক কর্মী পুরোনো পরিচয়পত্র ব্যবহার করে একটি ব্যবস্থায় ঢুকে পরিষ্কার করার কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ২০২১ সালে ফ্লোরিডার ওল্ডসমারে হ্যাকাররা একটি পানি স্থাপনায় ঢুকে সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইডের মাত্রা বাড়িয়ে মানুষের ক্ষতি করার চেষ্টা করেছিল। সেই চেষ্টা ব্যর্থ হলেও ব্যবস্থায় প্রবেশ করা তুলনামূলক সহজ ছিল।
নিরাপত্তা জোরদারে নতুন উদ্যোগ
১৩ আগস্ট ডেমোক্র্যাট সিনেটর অ্যামি ক্লোবুচার ও অ্যাডাম শিফ পানি অবকাঠামোর সাইবার নিরাপত্তা বাড়াতে ওয়াটার সাইবার শিল্ড অ্যাক্ট উত্থাপন করেন। এতে পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। ৫ আগস্ট আমেরিকান ওয়াটার ওয়ার্কস অ্যাসোসিয়েশন পানি নিরাপত্তা ও স্থিতিস্থাপকতা সংক্রান্ত আরেকটি আইনকে সমর্থন করে। প্রস্তাবটি পাস হলে পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার তত্ত্বাবধানে একটি স্বাধীন সংস্থা পানি ব্যবস্থার জন্য ন্যূনতম সাইবার নিরাপত্তা মান নির্ধারণ করতে পারবে।
এদিকে ১৩ ও ১৯ আগস্ট মার্কিন কর্মকর্তারা সতর্ক করে জানান, পানি স্থাপনাসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় ব্যবহৃত সিমেন্সের যন্ত্রে হ্যাকাররা প্রবেশের চেষ্টা করছে। ৩০ জুলাই এবং ১৯ আগস্টও পানি ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন করার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
রাজনৈতিক অনীহায় বাড়ছে ঝুঁকি
তবে নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগের সঙ্গে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাধাও রয়েছে। বাইডেন প্রশাসনের সময়ে পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা পানি ব্যবস্থার সাইবার ঝুঁকি পর্যালোচনা ও প্রতিবেদন দেওয়ার উদ্যোগ নিলেও কয়েকটি অঙ্গরাজ্য এবং পানি খাতের সংগঠনের মামলার পর তা স্থগিত হয়ে যায়।
২০২২ সালে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় বড় ধরনের সাইবার হামলা ৭২ ঘণ্টার মধ্যে জানানোর আইন পাস হলেও এর বিধিমালা চূড়ান্ত হতে এখনো সময় লাগছে। এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত বাজেটে পানি সাইবার নিরাপত্তার জন্য পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার প্রধান অর্থায়ন প্রায় ৯০ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। একই সময়ে সাইবার নিরাপত্তা ও অবকাঠামো নিরাপত্তা সংস্থায় নেতৃত্ব সংকট, কর্মীদের মনোবল কমে যাওয়া এবং প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনবল কমে যাওয়ার কথাও উঠে এসেছে।
হ্যাকাররা অবশ্য অপেক্ষা করছে না। পানি সরবরাহের মতো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অবকাঠামোকে নিরাপদ রাখতে যুক্তরাষ্ট্র কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।
যুক্তরাষ্ট্রের পানি অবকাঠামো সাইবার হামলার সহজ লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। অন্তত সাত অঙ্গরাজ্যের পানি ব্যবস্থায় হ্যাকারদের অনুপ্রবেশের পর নিরাপত্তা জোরদারে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হলেও ঝুঁকি রয়ে গেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















