বার্লিন প্রাচীর নির্মাণের ৬৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে জার্মানির রাজধানী বার্লিনে ১৩ থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত নানা স্মরণানুষ্ঠান, জাদুঘরভিত্তিক কর্মসূচি, প্রদর্শনী এবং শিল্পস্থাপনার আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে শহরের ঐতিহাসিক ব্রান্ডেনবুর্গ ফটকের সামনে স্থাপিত বিশাল শিল্পকর্মটি বিশেষভাবে নজর কাড়ছে।
প্রায় ৩০ মিটার দীর্ঘ এবং প্রায় ৩ মিটার উঁচু এই শিল্পস্থাপনাটি দেখতে অনেকটা বার্লিন প্রাচীরের মতো হলেও এটি প্রাচীরটির হুবহু প্রতিরূপ নয়। আয়োজকদের মতে, এর নকশার মাধ্যমে সাবেক সীমান্তপ্রাচীরের ভয়াবহতা তুলে ধরার পাশাপাশি স্মরণ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে—একসময় যে প্রাচীর বার্লিনকে বিভক্ত করেছিল, শেষ পর্যন্ত সেটি শহরটিকে চিরস্থায়ীভাবে আলাদা করে রাখতে পারেনি।
দৃষ্টিভঙ্গি বদলালেই বদলে যায় শিল্পকর্মের রূপ
বিশেষ ধরনের উপাদান ব্যবহার করে তৈরি শিল্পকর্মটি দর্শকের অবস্থান ও দেখার কোণের ওপর নির্ভর করে কখনো স্বচ্ছ, আবার কখনো সম্পূর্ণ অপ্রবেশ্য দেয়ালের মতো মনে হবে। এই বৈশিষ্ট্যের মধ্য দিয়ে দেয়াল, সীমান্ত এবং বিভাজনের ধারণাকে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
ব্রান্ডেনবুর্গ ফটকের কাছেই একই সময়ে উন্মুক্ত স্থানে ঐতিহাসিক আলোকচিত্রের একটি প্রদর্শনীও চলছে। ‘মাউয়ারব্লিকে—বার্লিন ১৯৬১–১৯৯০’ শীর্ষক এই প্রদর্শনীতে বিভক্ত বার্লিনের দৈনন্দিন জীবনের নানা ছবি তুলে ধরা হয়েছে।
আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব আয়োজন শুধু জার্মানির কয়েক দশকের বিভাজনকে স্মরণ করার জন্য নয়। বর্তমান বিশ্বের দেয়াল ও সীমান্ত নিয়েও মানুষের মধ্যে ভাবনা ও আলোচনার সুযোগ তৈরি করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
১৩ আগস্ট মূল স্মরণানুষ্ঠান
১৩ আগস্ট বার্লিন প্রাচীর স্মৃতিসৌধে অনুষ্ঠিত হয়েছে মূল স্মরণানুষ্ঠান। বার্নাউয়ার স্ট্রাসের এই আয়োজনে জার্মানির পার্লামেন্টের সভাপতি ইউলিয়া ক্ল্যোকনার, বার্লিনের মেয়র কাই ভেগনার এবং সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ভলফরাম ভাইমারসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিত থাকার কথা ছিল।
সমঝোতা প্রার্থনাগৃহে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রাচীরের কারণে প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের জীবনী থেকে বিভিন্ন অংশ পাঠ করা হয়।
একই দিনে ব্রান্ডেনবুর্গ রাজ্যেও প্রাচীর নির্মাণের ৬৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। শহরের দক্ষিণ প্রান্তের গ্রোসৎসিয়েটেন এলাকায় একটি উঁচু স্থানে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে রাজ্য সংসদের সভাপতি উলরিকে লিডটকে অংশ নেন। জায়গাটি একসময় বার্লিন প্রাচীরের একেবারে কাছে থাকা একটি আবর্জনা ফেলার স্থান ছিল। বর্তমানে সেখান থেকে বিস্তৃত এলাকার দৃশ্য দেখা যায়।
‘ভূতুড়ে’ রেলস্টেশনও উঠে আসছে স্মরণে
বার্লিনের বিভাজনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল তথাকথিত ‘ভূতুড়ে’ রেলস্টেশন। শহর বিভক্ত হওয়ার পর উত্তর-দক্ষিণ রেলপথের কয়েকটি স্টেশনের এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যেখানে পশ্চিম বার্লিনের এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাওয়া ট্রেনগুলো পূর্ব বার্লিনের ভূখণ্ডের নিচ দিয়ে চলাচল করত।
এসব ট্রেন ব্রান্ডেনবুর্গার টোর কিংবা নর্ডবানহফের মতো স্টেশনে থামত না। কারণ সেখানে পূর্ব জার্মানির সীমান্তরক্ষীরা প্ল্যাটফর্মে পাহারা দিতেন। তবে ফ্রিডরিশস্ট্রাসে স্টেশনে ট্রেন থামত। সেখানে তৎকালীন পূর্ব জার্মান কর্তৃপক্ষ একটি সীমান্ত পারাপার কেন্দ্র স্থাপন করেছিল।
বিভাজনের এই ইতিহাস মানুষের সামনে তুলে ধরতে বার্লিনের বিভিন্ন রেলস্টেশনে বড় আকারের প্রদর্শনী ও ছোট ছোট আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে।
শহরজুড়ে নানা কর্মসূচি
বার্লিনের বিভিন্ন স্থানে প্রাচীর নির্মাণের ৬৫ বছর উপলক্ষে ভ্রমণ, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, পাঠ অনুষ্ঠান, আলোচনা ও কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে।
১৩ আগস্ট জার্মান ঐতিহাসিক জাদুঘরের পাশের পেই ভবনে দর্শনার্থীদের জন্য বিনা মূল্যে প্রবেশের ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে বিনা মূল্যে পরিচালিত বিভিন্ন নির্দেশিত পরিদর্শনেরও আয়োজন ছিল।
সন্ধ্যা ৬টায় মিট্টে এলাকার সেন্ট হেডভিগ ক্যাথেড্রালে বিভাজনের শিকার এবং পালানোর চেষ্টা করতে গিয়ে প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের স্মরণে ক্যাথলিক গির্জার পক্ষ থেকে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়।
বার্লিন প্রাচীর নির্মাণের ফলে তৎকালীন বার্লিনের ধর্মীয় প্রশাসনও বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। পূর্ব ও পশ্চিম অংশে কাঠামোগত পার্থক্য এবং নানা বাধা তৈরি হলেও গির্জাটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থায় থাকার চেষ্টা চালিয়ে যায়।

১৯৬১ সালের আগস্টে শুরু হয়েছিল প্রাচীর নির্মাণ
১৯৬১ সালের ১৫ জুন তৎকালীন পূর্ব জার্মানির ক্ষমতাসীন সমাজতান্ত্রিক ঐক্য পার্টির প্রধান ও রাষ্ট্র পরিষদের চেয়ারম্যান ভাল্টার উলব্রিশ্ট বলেছিলেন, বার্লিনে দেয়াল নির্মাণের কোনো পরিকল্পনা নেই। কিন্তু তার মাত্র দুই মাসের মধ্যেই শুরু হয় বার্লিন প্রাচীর নির্মাণ।
পূর্ব জার্মান নেতৃত্বের প্রধান লক্ষ্য ছিল পূর্ব থেকে পশ্চিমে মানুষের ব্যাপক চলে যাওয়া ঠেকানো। বিপুলসংখ্যক মানুষের পশ্চিম বার্লিন ও পশ্চিম জার্মানিতে চলে যাওয়া দেশটির অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছিল এবং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতাকেও দুর্বল করে দিচ্ছিল।
প্রায় ১৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্তপ্রাচীর ২৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে বার্লিনকে দুই ভাগে বিভক্ত করে রাখে। অসংখ্য পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পশ্চিম বার্লিনও তার চারপাশের এলাকা থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
বার্লিন প্রাচীর স্মৃতি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে অন্তত ১৪০ জন মানুষ প্রাচীরের কাছে নিহত হন অথবা পূর্ব জার্মানির সীমান্তব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনায় প্রাণ হারান। এ ছাড়া বার্লিনের সীমান্ত পারাপার কেন্দ্রগুলোতে তল্লাশির সময় বা তল্লাশির পর অন্তত ২৫১ জন যাত্রীর মৃত্যু হয়।
বার্লিন প্রাচীর শেষ পর্যন্ত ১৯৮৯ সালে পতনের মধ্য দিয়ে বিভাজনের অবসানের পথ খুলে দেয়। কিন্তু প্রাচীরটির স্মৃতি আজও জার্মানির ইতিহাসে স্বাধীনতা, বিভাজন, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের চলাচলের অধিকারের এক শক্তিশালী প্রতীক হয়ে আছে।
বার্লিনে এবারের ৬৫তম বার্ষিকীর আয়োজন সেই ইতিহাসকে শুধু স্মরণ করছে না, বরং বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন দেয়াল ও সীমান্ত নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















