০২:৫৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬
তিন মাসে আইপিএসের দাম বেড়েছে ৩২ শতাংশ, চার্জার ফ্যানেও ৫০ শতাংশ ঊর্ধ্বগতি এমপিওভুক্তির দাবিতে শহীদ মিনারে শিক্ষক-কর্মচারীদের অবস্থান পূর্ববর্তী রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য তানিম সুফিয়ানী অব্যাহতি ক্যামেরুনে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ৭ সুন্দরবনের জলবায়ু প্রকল্পে ব্রিটিশ সহায়তা কাটছাঁট, দুই বছর আগেই বন্ধ হচ্ছে কার্যক্রম শেরপুরে পুকুর থেকে দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার, নিখোঁজের সাড়ে ১৪ ঘণ্টা পর মিলল সন্ধান নুসরাত হত্যা মামলায় দুইজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল, চারজনের সাজা আমৃত্যু কারাদণ্ড দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি-ঝড়ের পূর্বাভাস, কমতে পারে তাপমাত্রা ইমরানকে হাসপাতালে নেওয়ার সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্যের অভিযোগ, সরকারের বিরুদ্ধে ৮ আইনজীবীর প্রতিবাদ তীব্র গরমে লাহোরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট, দুর্ভোগে নগরবাসী

এক ইয়াসমিনে যে দেশ জেগেছিল, শত ইয়াসমিনে আজ কেন নীরব?

১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট দিনাজপুরের একটি রাস্তার পাশে পড়ে থাকা ১৪ বছরের কিশোরী ইয়াসমিন আক্তারের মরদেহ শুধু একটি পরিবারের শোকের প্রতীক হয়ে থাকেনি; সেটি হয়ে উঠেছিল রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সমাজের কাছে একটি কঠিন প্রশ্ন। যে পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব ছিল একজন অসহায় কিশোরীকে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া, তাদের বিরুদ্ধেই উঠেছিল ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ। সেই ঘটনার প্রতিবাদে দিনাজপুরে মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। পুলিশের গুলিতে নিহত হন সাতজন, আহত হন তিন শতাধিক মানুষ। ইয়াসমিনের বিচার দাবির সেই আন্দোলন পরে দেশের নারী অধিকার আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে পরিণত হয়।

৩১ বছর পর ২৪ আগস্ট আবারও ইয়াসমিনকে স্মরণ করছে বাংলাদেশ। কিন্তু আজকের প্রশ্নটি শুধু ইয়াসমিনকে স্মরণ করার নয়—প্রশ্ন হলো, যে সমাজ এক কিশোরীর ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে হাজারো মানুষকে রাস্তায় নামিয়েছিল, সেই সমাজ আজ এত বেশি যৌন সহিংসতার মধ্যেও কেন ক্রমশ নীরব হয়ে যাচ্ছে?

কারণ সংখ্যাগুলো ভয়াবহ।

ইয়াসমিনের সময় ক্ষোভ ছিল, এখন যেন ক্লান্তি

চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেছে ৫৮টি। অথচ পুরো ২০২৫ সালে এমন ঘটনা ছিল ৫৫টি। অর্থাৎ গত বছরের পুরো বছরের সংখ্যাকে মাত্র সাত মাসেই ছাড়িয়ে গেছে এ বছরের ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা। মাসিক গড় হিসাব করলে ২০২৫ সালের প্রায় ৪ দশমিক ৬টির তুলনায় ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ দশমিক ৩টি—বৃদ্ধি প্রায় ৮১ শতাংশ।

এটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি মানুষ, একটি পরিবার এবং এমন একটি সামাজিক বাস্তবতা যেখানে ধর্ষণের পর হত্যাকে অপরাধী অনেক সময় অপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলা, ভুক্তভোগীকে চুপ করিয়ে দেওয়া কিংবা পরিচয় ফাঁসের ভয় থেকে নিরাপদ পথ হিসেবে বেছে নেয়।

ইয়াসমিন ধর্ষণ-হত্যা: যে ঘটনা কাঁপিয়ে দিয়েছিল সারা দেশ

আরও বড় চিত্রটি আরও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে নথিভুক্ত ধর্ষণের ঘটনা ছিল শত শত। একই বছরে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের হিসাবে নারী ও কন্যাশিশুর ওপর বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার ২ হাজার ৮০৮টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা ২০২৪ সালের ২ হাজার ৫২৫টির তুলনায় ১১ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। গবেষণাটিতে ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, যৌন হয়রানি, হত্যা, আত্মহত্যা, বাল্যবিবাহসহ বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা অন্তর্ভুক্ত ছিল।

ইয়াসমিন কেন এত বড় সামাজিক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল?

ইয়াসমিনের ঘটনা ছিল ক্ষমতার অপব্যবহারের এক নগ্ন উদাহরণ। একজন দরিদ্র কিশোরী, একা পথ চলা, আর তার সামনে রাষ্ট্রের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ। নিরাপত্তার আশ্বাসই পরিণত হয়েছিল বিপদের ফাঁদে।

ঘটনার পর দিনাজপুরের মানুষ পুলিশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। হাজারো মানুষ থানার সামনে অবস্থান নেয় এবং অভিযুক্তদের বিচারের দাবি জানায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ গুলি চালালে সাতজন নিহত ও তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ায় তিন পুলিশ সদস্য মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং ২০০৪ সালে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।

এই জায়গাতেই ইয়াসমিনের ঘটনা বাংলাদেশের সামাজিক ইতিহাসে আলাদা হয়ে যায়। একটি ধর্ষণ শুধু সংবাদ হয়ে থাকেনি; সেটি মানুষকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রশ্ন করতে বাধ্য করেছিল। মানুষ বুঝেছিল, নীরবতা অপরাধীকে শক্তিশালী করে।

আজ সেই প্রশ্নই আবার ফিরে এসেছে—কিন্তু এবার সমাজের প্রতিক্রিয়া কোথায়?

ধর্ষণ বাড়ছে, কিন্তু প্রতিবাদ কেন কম দৃশ্যমান?

আজকের বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ তৈরি হয়, কিছুদিন আলোচনা হয়, প্রতিবাদ হয়, তারপর নতুন কোনো ঘটনা পুরোনো ঘটনাকে সরিয়ে দেয়। সংবাদচক্রের গতি বেড়েছে, কিন্তু সামাজিক স্মৃতির স্থায়িত্ব যেন কমেছে।

ইয়াসমিনের সময় একটি ঘটনা পুরো একটি শহরকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। এখন অসংখ্য ঘটনা একসঙ্গে ঘটতে থাকায় ভয়াবহতাই যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। একে বলা যায় সহিংসতার প্রতি সামাজিক অসাড়তা।

ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি: ৩০ বছর পর ফিরে দেখা এক নারকীয় রাত

এই অসাড়তার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া যায় জাতীয় পর্যায়ের জরিপে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের ২০২৪ সালের নারী নির্যাতন জরিপে দেখা গেছে, জীবনে কোনো না কোনো সময়ে ৭৬ শতাংশ নারী স্বামী বা ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর কাছ থেকে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। গত ১২ মাসেই এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ৪৯ শতাংশ নারী। একই জরিপে দেখা যায়, স্বামীর শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার নারীদের ৬৪ শতাংশ কাউকে বিষয়টি জানাননি। আর স্বামী ছাড়া অন্য ব্যক্তির সহিংসতার ক্ষেত্রে আইনি প্রতিকার চাওয়ার হারও অত্যন্ত কম।

অর্থাৎ নীরবতা কেবল বাইরে নয়, ঘরের ভেতরেও।

ইয়াসমিনের পর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন—আমরা খবর বেশি জানি, কিন্তু সবসময় প্রতিবাদ করি না

তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ফোরণে আজ একটি ঘটনার খবর কয়েক মিনিটে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। কিন্তু দ্রুত তথ্য পাওয়া আর দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এক জিনিস নয়।

১৯৯৫ সালে ইয়াসমিনের ঘটনার পর মানুষের ক্ষোভ প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছিল। আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ অনেক সময় কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যে অন্য আলোচনায় হারিয়ে যায়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি সমস্যা—ভুক্তভোগীকেই প্রশ্ন করার সংস্কৃতি।

কেন সেখানে গিয়েছিল? কার সঙ্গে ছিল? পোশাক কেমন ছিল? রাতে বাইরে কেন? আগে কারও সঙ্গে সম্পর্ক ছিল কি না? এমন প্রশ্নগুলো অপরাধীর দায়কে আড়াল করে ভুক্তভোগীর জীবনকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। ফলে ধর্ষণের বিরুদ্ধে যে সামাজিক অবস্থান তৈরি হওয়ার কথা, সেখানে অনেক সময় ভুক্তভোগীর চরিত্র নিয়েই আলোচনা শুরু হয়।

এমন পরিবেশে অপরাধীর জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—ভুক্তভোগী ও তার পরিবার ভয় পায়, সাক্ষী পিছিয়ে যায় এবং সমাজ ধীরে ধীরে ঘটনাটিকে ভুলে যায়।

আইন আছে, কিন্তু বিচার পাওয়ার পথই বড় পরীক্ষা

ধর্ষণবিরোধী আইন শক্তিশালী হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কাগজে কঠোর আইন থাকলেই অপরাধ কমে না। প্রয়োজন দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, যথাযথ চিকিৎসা পরীক্ষা, ফরেনসিক আলামত সংরক্ষণ, সাক্ষীর নিরাপত্তা এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগীর মর্যাদা রক্ষা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অপরাধীর রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক ক্ষমতা যেন বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে না পারে।

ইয়াসমিনের ঘটনা আমাদের এই শিক্ষা দিয়েছিল যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও বিচার সম্ভব—যদি জনমত, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও বিচারব্যবস্থা একসঙ্গে দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু তিন দশক পরও যদি ধর্ষণের পর হত্যার সংখ্যা বাড়তে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—সেই শিক্ষা আমরা কতটা ধরে রাখতে পেরেছি?

নীরবতারও একটি মূল্য আছে

ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যা: ১৯৯৫ সালে যে ঘটনার প্রতিবাদ কাঁপিয়ে দিয়েছিল  বাংলাদেশকে - BBC News বাংলা

ধর্ষণ শুধু একজন নারীর বা শিশুর বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ নয়। এটি একটি সমাজের ক্ষমতার কাঠামোকে প্রকাশ করে। যেখানে অপরাধী মনে করে সে পার পেয়ে যাবে, সেখানে অপরাধের ঝুঁকি কমে যায়। আর যেখানে ভুক্তভোগী মনে করে কথা বললে তাকে আরও অপমানিত হতে হবে, সেখানে অপরাধের রিপোর্ট কমে যায়—কিন্তু অপরাধ কমে না।

জাতীয় জরিপের তথ্য তাই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের জরিপে দেখা গেছে, সহিংসতার শিকার বিপুলসংখ্যক নারী তাদের অভিজ্ঞতার কথা কাউকে জানান না। এই নীরবতা শুধু ব্যক্তিগত ভয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত সামাজিক কলঙ্ক, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, বিচার পাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং পরিবার ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা।

ফলে সংবাদে যে সংখ্যাগুলো দেখা যায়, সেগুলো বাস্তব সহিংসতার পূর্ণ চিত্র নয়। বরং সেগুলো এমন এক সমস্যার দৃশ্যমান অংশ, যার অনেকটাই অদৃশ্য থেকে যায়।

ইয়াসমিনকে স্মরণ মানে শুধু শোক নয়

২৪ আগস্ট তাই কেবল একটি স্মরণ দিবস হতে পারে না। ইয়াসমিনকে স্মরণ করার অর্থ হলো সেই সময়ের জনতার প্রশ্নটিকে আবার সামনে আনা—রাষ্ট্র কি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে? আইন কি ক্ষমতাবান ও দুর্বল মানুষের জন্য সমান? পরিবার কি ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়াচ্ছে? সমাজ কি অপরাধীর বদলে ভুক্তভোগীকেই প্রশ্ন করা বন্ধ করেছে?

৩১ বছর আগে ইয়াসমিনের জন্য মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিয়েছিল মানুষ। সেই রক্তের মধ্য দিয়ে একটি সামাজিক বার্তা তৈরি হয়েছিল—নারীর ওপর সহিংসতা ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি জনজীবনের প্রশ্ন।

আজ যখন মাত্র সাত মাসে ধর্ষণের পর হত্যার সংখ্যা আগের পুরো বছরের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে, তখন ইয়াসমিনের স্মৃতি আমাদের সামনে আরেকটি কঠিন আয়না ধরে।

সেই আয়নায় দেখা যাচ্ছে—আমরা হয়তো আগের চেয়ে বেশি জানি, দ্রুত খবর পাই, বেশি আলোচনা করি; কিন্তু সবসময় আগের মতো একসঙ্গে দাঁড়াই না।

ইয়াসমিনের ৩১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হতে পারে—ইয়াসমিনের মৃত্যুর পর যে সমাজ জেগে উঠেছিল, সেই সমাজ কি আবার জাগবে?

নাকি ধর্ষণ, হত্যা, প্রতিবাদ, কয়েক দিনের ক্ষোভ এবং তারপর নীরবতা—এই চক্রই আমাদের নতুন স্বাভাবিকতা হয়ে থাকবে?

জনপ্রিয় সংবাদ

তিন মাসে আইপিএসের দাম বেড়েছে ৩২ শতাংশ, চার্জার ফ্যানেও ৫০ শতাংশ ঊর্ধ্বগতি

এক ইয়াসমিনে যে দেশ জেগেছিল, শত ইয়াসমিনে আজ কেন নীরব?

০১:২৯:৫৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬

১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট দিনাজপুরের একটি রাস্তার পাশে পড়ে থাকা ১৪ বছরের কিশোরী ইয়াসমিন আক্তারের মরদেহ শুধু একটি পরিবারের শোকের প্রতীক হয়ে থাকেনি; সেটি হয়ে উঠেছিল রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সমাজের কাছে একটি কঠিন প্রশ্ন। যে পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব ছিল একজন অসহায় কিশোরীকে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া, তাদের বিরুদ্ধেই উঠেছিল ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ। সেই ঘটনার প্রতিবাদে দিনাজপুরে মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। পুলিশের গুলিতে নিহত হন সাতজন, আহত হন তিন শতাধিক মানুষ। ইয়াসমিনের বিচার দাবির সেই আন্দোলন পরে দেশের নারী অধিকার আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে পরিণত হয়।

৩১ বছর পর ২৪ আগস্ট আবারও ইয়াসমিনকে স্মরণ করছে বাংলাদেশ। কিন্তু আজকের প্রশ্নটি শুধু ইয়াসমিনকে স্মরণ করার নয়—প্রশ্ন হলো, যে সমাজ এক কিশোরীর ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে হাজারো মানুষকে রাস্তায় নামিয়েছিল, সেই সমাজ আজ এত বেশি যৌন সহিংসতার মধ্যেও কেন ক্রমশ নীরব হয়ে যাচ্ছে?

কারণ সংখ্যাগুলো ভয়াবহ।

ইয়াসমিনের সময় ক্ষোভ ছিল, এখন যেন ক্লান্তি

চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেছে ৫৮টি। অথচ পুরো ২০২৫ সালে এমন ঘটনা ছিল ৫৫টি। অর্থাৎ গত বছরের পুরো বছরের সংখ্যাকে মাত্র সাত মাসেই ছাড়িয়ে গেছে এ বছরের ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা। মাসিক গড় হিসাব করলে ২০২৫ সালের প্রায় ৪ দশমিক ৬টির তুলনায় ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ দশমিক ৩টি—বৃদ্ধি প্রায় ৮১ শতাংশ।

এটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি মানুষ, একটি পরিবার এবং এমন একটি সামাজিক বাস্তবতা যেখানে ধর্ষণের পর হত্যাকে অপরাধী অনেক সময় অপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলা, ভুক্তভোগীকে চুপ করিয়ে দেওয়া কিংবা পরিচয় ফাঁসের ভয় থেকে নিরাপদ পথ হিসেবে বেছে নেয়।

ইয়াসমিন ধর্ষণ-হত্যা: যে ঘটনা কাঁপিয়ে দিয়েছিল সারা দেশ

আরও বড় চিত্রটি আরও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে নথিভুক্ত ধর্ষণের ঘটনা ছিল শত শত। একই বছরে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের হিসাবে নারী ও কন্যাশিশুর ওপর বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার ২ হাজার ৮০৮টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা ২০২৪ সালের ২ হাজার ৫২৫টির তুলনায় ১১ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। গবেষণাটিতে ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, যৌন হয়রানি, হত্যা, আত্মহত্যা, বাল্যবিবাহসহ বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা অন্তর্ভুক্ত ছিল।

ইয়াসমিন কেন এত বড় সামাজিক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল?

ইয়াসমিনের ঘটনা ছিল ক্ষমতার অপব্যবহারের এক নগ্ন উদাহরণ। একজন দরিদ্র কিশোরী, একা পথ চলা, আর তার সামনে রাষ্ট্রের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ। নিরাপত্তার আশ্বাসই পরিণত হয়েছিল বিপদের ফাঁদে।

ঘটনার পর দিনাজপুরের মানুষ পুলিশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। হাজারো মানুষ থানার সামনে অবস্থান নেয় এবং অভিযুক্তদের বিচারের দাবি জানায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ গুলি চালালে সাতজন নিহত ও তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ায় তিন পুলিশ সদস্য মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং ২০০৪ সালে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।

এই জায়গাতেই ইয়াসমিনের ঘটনা বাংলাদেশের সামাজিক ইতিহাসে আলাদা হয়ে যায়। একটি ধর্ষণ শুধু সংবাদ হয়ে থাকেনি; সেটি মানুষকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রশ্ন করতে বাধ্য করেছিল। মানুষ বুঝেছিল, নীরবতা অপরাধীকে শক্তিশালী করে।

আজ সেই প্রশ্নই আবার ফিরে এসেছে—কিন্তু এবার সমাজের প্রতিক্রিয়া কোথায়?

ধর্ষণ বাড়ছে, কিন্তু প্রতিবাদ কেন কম দৃশ্যমান?

আজকের বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ তৈরি হয়, কিছুদিন আলোচনা হয়, প্রতিবাদ হয়, তারপর নতুন কোনো ঘটনা পুরোনো ঘটনাকে সরিয়ে দেয়। সংবাদচক্রের গতি বেড়েছে, কিন্তু সামাজিক স্মৃতির স্থায়িত্ব যেন কমেছে।

ইয়াসমিনের সময় একটি ঘটনা পুরো একটি শহরকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। এখন অসংখ্য ঘটনা একসঙ্গে ঘটতে থাকায় ভয়াবহতাই যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। একে বলা যায় সহিংসতার প্রতি সামাজিক অসাড়তা।

ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি: ৩০ বছর পর ফিরে দেখা এক নারকীয় রাত

এই অসাড়তার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া যায় জাতীয় পর্যায়ের জরিপে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের ২০২৪ সালের নারী নির্যাতন জরিপে দেখা গেছে, জীবনে কোনো না কোনো সময়ে ৭৬ শতাংশ নারী স্বামী বা ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর কাছ থেকে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। গত ১২ মাসেই এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ৪৯ শতাংশ নারী। একই জরিপে দেখা যায়, স্বামীর শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার নারীদের ৬৪ শতাংশ কাউকে বিষয়টি জানাননি। আর স্বামী ছাড়া অন্য ব্যক্তির সহিংসতার ক্ষেত্রে আইনি প্রতিকার চাওয়ার হারও অত্যন্ত কম।

অর্থাৎ নীরবতা কেবল বাইরে নয়, ঘরের ভেতরেও।

ইয়াসমিনের পর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন—আমরা খবর বেশি জানি, কিন্তু সবসময় প্রতিবাদ করি না

তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ফোরণে আজ একটি ঘটনার খবর কয়েক মিনিটে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। কিন্তু দ্রুত তথ্য পাওয়া আর দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এক জিনিস নয়।

১৯৯৫ সালে ইয়াসমিনের ঘটনার পর মানুষের ক্ষোভ প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছিল। আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ অনেক সময় কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যে অন্য আলোচনায় হারিয়ে যায়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি সমস্যা—ভুক্তভোগীকেই প্রশ্ন করার সংস্কৃতি।

কেন সেখানে গিয়েছিল? কার সঙ্গে ছিল? পোশাক কেমন ছিল? রাতে বাইরে কেন? আগে কারও সঙ্গে সম্পর্ক ছিল কি না? এমন প্রশ্নগুলো অপরাধীর দায়কে আড়াল করে ভুক্তভোগীর জীবনকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। ফলে ধর্ষণের বিরুদ্ধে যে সামাজিক অবস্থান তৈরি হওয়ার কথা, সেখানে অনেক সময় ভুক্তভোগীর চরিত্র নিয়েই আলোচনা শুরু হয়।

এমন পরিবেশে অপরাধীর জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—ভুক্তভোগী ও তার পরিবার ভয় পায়, সাক্ষী পিছিয়ে যায় এবং সমাজ ধীরে ধীরে ঘটনাটিকে ভুলে যায়।

আইন আছে, কিন্তু বিচার পাওয়ার পথই বড় পরীক্ষা

ধর্ষণবিরোধী আইন শক্তিশালী হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কাগজে কঠোর আইন থাকলেই অপরাধ কমে না। প্রয়োজন দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, যথাযথ চিকিৎসা পরীক্ষা, ফরেনসিক আলামত সংরক্ষণ, সাক্ষীর নিরাপত্তা এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগীর মর্যাদা রক্ষা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অপরাধীর রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক ক্ষমতা যেন বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে না পারে।

ইয়াসমিনের ঘটনা আমাদের এই শিক্ষা দিয়েছিল যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও বিচার সম্ভব—যদি জনমত, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও বিচারব্যবস্থা একসঙ্গে দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু তিন দশক পরও যদি ধর্ষণের পর হত্যার সংখ্যা বাড়তে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—সেই শিক্ষা আমরা কতটা ধরে রাখতে পেরেছি?

নীরবতারও একটি মূল্য আছে

ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যা: ১৯৯৫ সালে যে ঘটনার প্রতিবাদ কাঁপিয়ে দিয়েছিল  বাংলাদেশকে - BBC News বাংলা

ধর্ষণ শুধু একজন নারীর বা শিশুর বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ নয়। এটি একটি সমাজের ক্ষমতার কাঠামোকে প্রকাশ করে। যেখানে অপরাধী মনে করে সে পার পেয়ে যাবে, সেখানে অপরাধের ঝুঁকি কমে যায়। আর যেখানে ভুক্তভোগী মনে করে কথা বললে তাকে আরও অপমানিত হতে হবে, সেখানে অপরাধের রিপোর্ট কমে যায়—কিন্তু অপরাধ কমে না।

জাতীয় জরিপের তথ্য তাই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের জরিপে দেখা গেছে, সহিংসতার শিকার বিপুলসংখ্যক নারী তাদের অভিজ্ঞতার কথা কাউকে জানান না। এই নীরবতা শুধু ব্যক্তিগত ভয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত সামাজিক কলঙ্ক, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, বিচার পাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং পরিবার ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা।

ফলে সংবাদে যে সংখ্যাগুলো দেখা যায়, সেগুলো বাস্তব সহিংসতার পূর্ণ চিত্র নয়। বরং সেগুলো এমন এক সমস্যার দৃশ্যমান অংশ, যার অনেকটাই অদৃশ্য থেকে যায়।

ইয়াসমিনকে স্মরণ মানে শুধু শোক নয়

২৪ আগস্ট তাই কেবল একটি স্মরণ দিবস হতে পারে না। ইয়াসমিনকে স্মরণ করার অর্থ হলো সেই সময়ের জনতার প্রশ্নটিকে আবার সামনে আনা—রাষ্ট্র কি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে? আইন কি ক্ষমতাবান ও দুর্বল মানুষের জন্য সমান? পরিবার কি ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়াচ্ছে? সমাজ কি অপরাধীর বদলে ভুক্তভোগীকেই প্রশ্ন করা বন্ধ করেছে?

৩১ বছর আগে ইয়াসমিনের জন্য মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিয়েছিল মানুষ। সেই রক্তের মধ্য দিয়ে একটি সামাজিক বার্তা তৈরি হয়েছিল—নারীর ওপর সহিংসতা ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি জনজীবনের প্রশ্ন।

আজ যখন মাত্র সাত মাসে ধর্ষণের পর হত্যার সংখ্যা আগের পুরো বছরের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে, তখন ইয়াসমিনের স্মৃতি আমাদের সামনে আরেকটি কঠিন আয়না ধরে।

সেই আয়নায় দেখা যাচ্ছে—আমরা হয়তো আগের চেয়ে বেশি জানি, দ্রুত খবর পাই, বেশি আলোচনা করি; কিন্তু সবসময় আগের মতো একসঙ্গে দাঁড়াই না।

ইয়াসমিনের ৩১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হতে পারে—ইয়াসমিনের মৃত্যুর পর যে সমাজ জেগে উঠেছিল, সেই সমাজ কি আবার জাগবে?

নাকি ধর্ষণ, হত্যা, প্রতিবাদ, কয়েক দিনের ক্ষোভ এবং তারপর নীরবতা—এই চক্রই আমাদের নতুন স্বাভাবিকতা হয়ে থাকবে?