২০২৫ সালের অক্টোবরে গাজায় কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি যুদ্ধের তীব্রতা কমিয়েছিল, কিন্তু সংঘাতের অবসান ঘটাতে পারেনি। এর কয়েক মাস পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মনোযোগ দ্রুত গাজা থেকে সরে ইরানের দিকে চলে যায়। সেই সময় গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান চলতে থাকে এবং ভেতরের নিয়ন্ত্রণরেখাও ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে থাকে।
বিশ্বের দৃষ্টি যখন অন্যদিকে, তখন গাজার মাটিতে বদলে যেতে থাকে বাস্তবতা। এই পরিবর্তন সরাসরি ইরান যুদ্ধের কারণে হয়েছে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। তবে আন্তর্জাতিক নজরদারি ও চাপ কমে যাওয়ায় গাজায় ইসরায়েলের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য তুলনামূলকভাবে অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।
যুদ্ধবিরতি, কিন্তু যুদ্ধের পুরোপুরি অবসান নয়
২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতি ছিল পূর্ণাঙ্গ শান্তির চেয়ে বরং সংঘাতের একটি কম তীব্র পর্যায়ে প্রবেশ। যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ সময়ের তুলনায় হতাহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। কিন্তু ইসরায়েল পুরোপুরি গাজা থেকে সরে যায়নি এবং চুক্তির পরবর্তী রাজনৈতিক পর্যায়ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গাজার অবস্থান আরও জটিল হয়ে ওঠে। গাজায় হামলা বন্ধ হয়নি, কিন্তু আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্র বদলে যায়।
এপ্রিল মাসে আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান যুদ্ধকে ঘিরে বিশ্বব্যাপী আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাজা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদ কাভারেজ কমে যায়। অথচ ইসরায়েলি সামরিক অভিযান অব্যাহত ছিল। যুদ্ধ শুরুর পরবর্তী ৪০ দিনের মধ্যে ৩৬ দিনই গাজায় ইসরায়েল হামলা চালিয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অর্থাৎ সংবাদমাধ্যমের আলোচনার বিষয় বদলে গেলেও গাজার মাটিতে পরিস্থিতির বড় কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।
সংবাদচক্র নয়, বদলেছে মানচিত্র
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় নয়, বরং গাজার ভূখণ্ডে।
যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পরও ইসরায়েল গাজার ভেতরে সামরিক অবস্থান ধরে রেখেছে। একই সঙ্গে তথাকথিত ‘হলুদ রেখা’ ধীরে ধীরে স্থান পরিবর্তন করেছে।
জুন মাসে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি বিধিনিষেধের আওতায় থাকা এলাকার পরিমাণ গাজার প্রায় ৬৪ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছিল। একই সময়ে রেখাটি আরও সরিয়ে বিধিনিষেধের আওতাধীন এলাকা প্রায় ৭০ শতাংশে নেওয়ার ইসরায়েলি প্রচেষ্টারও ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
এই এলাকার মধ্যে কৃষিজমি, জনবসতিপূর্ণ এলাকা, পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং মানবিক সহায়তার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও রয়েছে।
৬৪ দশমিক ৯ শতাংশ এলাকার প্রতিটি বর্গমিটারে ইসরায়েলি সেনাদের স্থায়ী অবস্থান রয়েছে—এমন অর্থ অবশ্য এই পরিসংখ্যান বহন করে না। তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা স্পষ্ট করে। গাজায় ফিলিস্তিনিদের অবাধে ব্যবহারের জন্য থাকা জায়গা সংকুচিত হচ্ছে, অন্যদিকে ইসরায়েলি বিধিনিষেধ ও নিয়ন্ত্রণের পরিধি বাড়ছে।

সময়ের সঙ্গে অস্থায়ী বাস্তবতাই স্থায়ী হয়ে উঠতে পারে
যুদ্ধবিরতির মূল উদ্দেশ্য যদি হয়ে থাকে সংঘাত কমিয়ে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, রাজনৈতিক সমঝোতা ও পুনর্গঠনের পথ তৈরি করা, তাহলে যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ভূখণ্ডের ক্রমাগত পুনর্বিন্যাস সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতার জন্ম দিচ্ছে।
যুদ্ধের তীব্রতা কমতে পারে, কিন্তু যুদ্ধের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক পরিণতি একই সঙ্গে আরও গভীরভাবে স্থায়ী হয়ে যেতে পারে।
নতুন সীমান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা কিংবা কোনো ভূখণ্ডকে সরাসরি সংযুক্ত করাই একমাত্র উপায় নয়, যার মাধ্যমে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। সেনাদের অবস্থান ধরে রাখা, নিয়ন্ত্রিত এলাকার বিস্তার, মানুষের বাস্তুচ্যুতি ও স্থাপনা ধ্বংস অব্যাহত রাখা এবং যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় পর্যায়কে অনিশ্চিত অবস্থায় রেখে দেওয়াও সময়ের সঙ্গে একটি অস্থায়ী ব্যবস্থাকে স্থায়ী রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত করতে পারে।
যুদ্ধবিরতির পরও প্রাণহানি
যুদ্ধবিরতির পর গাজায় সহিংসতা কমেছে—এ কথা সত্য। কিন্তু সহিংসতা শেষ হয়নি।
জাতিসংঘের কাছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে ১ হাজার ২০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৪ হাজার ১০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
এই সংখ্যা যুদ্ধবিরতির আগের ভয়াবহ যুদ্ধের মাত্রা ফিরে এসেছে—এমনটা প্রমাণ করে না। বরং এটি দেখায়, যুদ্ধবিরতি সহিংসতার মাত্রা কমালেও তা পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি।
এদিকে চুক্তির দ্বিতীয় পর্যায়ও স্থবির হয়ে আছে। এই পর্যায়ে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, বেসামরিক প্রশাসন এবং গাজার পুনর্গঠনের পথ তৈরি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হামাসের অস্ত্র সমর্পণ এবং ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের শর্ত নিয়ে মতবিরোধের কারণে সেই প্রক্রিয়া এগোয়নি।

গাজা আটকে আছে দুই বাস্তবতার মাঝখানে
গাজার বর্তমান পরিস্থিতি তাই এক ধরনের মধ্যবর্তী অবস্থার প্রতিচ্ছবি। এটি আর আগের বছরগুলোর মতো পূর্ণমাত্রার যুদ্ধক্ষেত্র নয়, কিন্তু যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুত শান্তিতেও পৌঁছাতে পারেনি।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত শুধু প্রতিদিন কতটি হামলা হচ্ছে, তা নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—গাজার মানচিত্রে কী পরিবর্তন ঘটছে?
ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ কি কমছে, নাকি বাড়ছে? ফিলিস্তিনিরা কি নিজেদের ঘরে ফিরতে পারছেন, নাকি তাদের চলাচলের স্বাধীনতা আরও সংকুচিত হচ্ছে? যুদ্ধবিরতি কি সত্যিই রাজনৈতিক সমাধানের দিকে এগোচ্ছে, নাকি সামরিক বাস্তবতাকে এতটা সময় দেওয়া হচ্ছে যে সেটিই শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হয়ে উঠবে?
বিশ্বের দৃষ্টি যখন ইরানে
ইরানের দিকে যখন বিশ্বের সংবাদমাধ্যমের প্রধান শিরোনামগুলো কেন্দ্রীভূত ছিল, তখন গাজায় সামরিক গতিবিধি তুলনামূলকভাবে নীরবে নতুন বাস্তবতা তৈরি করছিল। এই বাস্তবতার প্রভাব হয়তো সংবাদ শিরোনামের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
বিশ্বের মনোযোগ ইরানের দিকে সরে যাওয়া গাজার পরিবর্তনের সরাসরি কারণ নয়। তবে এর ফলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও চাপ কমে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, যেখানে গাজার পরিস্থিতির পরিবর্তন অব্যাহত রাখা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়েছে।
এটাই গাজার সংবাদচক্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দিক।
যুদ্ধ একদিন হয়তো শেষ হবে। কিন্তু বিশ্বের চোখ অন্যদিকে থাকার সময়ে গাজার মানচিত্রে যে পরিবর্তনগুলো ঘটে গেছে, সেগুলো হয়তো বহু বছর ধরে থেকে যাবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















