মিসর ও জর্ডান পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব খাতে সহযোগিতা আরও জোরদার করতে নতুন উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেছে। দুই দেশের মধ্যে যৌথ পর্যটন কর্মসূচি চালু, প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় জ্ঞান ও দক্ষতা বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যৌথভাবে পর্যটন প্রচারের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
সম্প্রতি মিসরের গ্র্যান্ড ইজিপশিয়ান মিউজিয়ামে দেশটির পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্বমন্ত্রী শরিফ ফাতহি জর্ডানের পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্বমন্ত্রী ইমাদ আল-হাজাজিন এবং তাঁর সফরসঙ্গীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। জর্ডানের মন্ত্রী বর্তমানে মিসর সফরে রয়েছেন।
এক সফরেই মিসর ও জর্ডান
বৈঠকে মিসর ও জর্ডানের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ও অভিজ্ঞতাকে একত্র করে একটি যৌথ পর্যটন প্যাকেজ তৈরির প্রস্তাব গুরুত্ব পায়। এর লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে দুই দেশকে একই সফরের অংশ হিসেবে তুলে ধরা এবং বিশেষ করে দূরবর্তী পর্যটন বাজার থেকে আরও বেশি দর্শনার্থী আকৃষ্ট করা।
লাতিন আমেরিকার মতো দূরবর্তী অঞ্চল থেকে পর্যটক আনার ক্ষেত্রে দুই দেশের বিমান যোগাযোগকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। মিসরের জাতীয় বিমান সংস্থা ও জর্ডানের জাতীয় বিমান সংস্থার বিদ্যমান যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করে পর্যটকদের চলাচল সহজ করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে যৌথ প্রচারণা চালানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

এ ছাড়া দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোর মধ্যে সংযোগ তৈরি করে নতুন পর্যটনপথ গড়ে তোলার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হয়েছে। এতে একই সফরে পর্যটকেরা দুই দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রত্নসম্পদের বৈচিত্র্য উপভোগের সুযোগ পাবেন।
ধর্মীয় পর্যটনেও যৌথ উদ্যোগ
বৈঠকে মিসর ও জর্ডানের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে একটি যৌথ পর্যটন কর্মসূচি চালুর প্রস্তাবও উঠে আসে। যিশু খ্রিষ্টের ব্যাপটিজমের ২০৩০ সালের স্মরণ আয়োজনকে সামনে রেখে এই উদ্যোগকে আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
তবে মিসরের মন্ত্রী শরিফ ফাতহি বলেন, এই কর্মসূচি যেন কোনো নির্দিষ্ট উপলক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং দুই দেশের ধর্মীয় ও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যকে ভিত্তি করে সারা বছর পরিচালনাযোগ্য একটি সমন্বিত ও টেকসই পর্যটন অভিজ্ঞতা তৈরি করা প্রয়োজন।
এ লক্ষ্যে একটি যৌথ কর্মদল গঠনের বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হয়েছে। এই কর্মদল যৌথ পর্যটন কর্মসূচির বাস্তবায়ন পদ্ধতি নির্ধারণ, সমন্বিত পর্যটন প্যাকেজ তৈরি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সেগুলোর প্রচারের কাজ করবে। পাশাপাশি দুই দেশের বেসরকারি পর্যটন খাতকে এসব কর্মসূচির পরিকল্পনা, পরিচালনা ও বিপণনে যুক্ত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রত্নতত্ত্বে দক্ষতা বিনিময়
পর্যটনের পাশাপাশি প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা, খনন, সংরক্ষণ, পুনরুদ্ধার, জাদুঘরে প্রদর্শন এবং প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন নিয়েও দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর আলোচনা হয়েছে।
শরিফ ফাতহি জানান, মিসর প্রত্নতত্ত্বের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনে অর্জিত অভিজ্ঞতা জর্ডানের সঙ্গে ভাগ করে নিতে প্রস্তুত। জর্ডানের পক্ষ থেকে যেসব ক্ষেত্রে সহযোগিতার প্রয়োজন চিহ্নিত করা হবে, সেসব ক্ষেত্রে মিসর সহায়তা দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
জর্ডানের মন্ত্রী ইমাদ আল-হাজাজিন প্রত্নতত্ত্ব ও মিসরবিদ্যায় মিসরের অর্জনের প্রশংসা করেন। তিনি প্রত্নতাত্ত্বিক ব্যবস্থাপনা, খনন ও সংরক্ষণে মিসরীয় বিশেষজ্ঞদের দক্ষতার কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে বিদেশি প্রত্নতাত্ত্বিক দল, বিশ্ববিদ্যালয় ও বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিসরের দীর্ঘদিনের সহযোগিতারও প্রশংসা করেন।

ঐতিহ্য সংরক্ষণে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ
প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ও জাদুঘরে দর্শনার্থীদের বিভিন্ন সেবা দেওয়া ও পরিচালনার ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার মিসরীয় অভিজ্ঞতাও বৈঠকে আলোচনায় আসে।
জর্ডানের মন্ত্রী গিজার পিরামিড এলাকা ও গ্র্যান্ড ইজিপশিয়ান মিউজিয়াম পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বিশেষভাবে প্রশংসা করেন। প্রত্নতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক মূল্য অক্ষুণ্ন রাখার পাশাপাশি দর্শনার্থীদের জন্য আধুনিক ও উন্নত পর্যটনসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মিসরের উদ্যোগকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখেন।
শরিফ ফাতহি বলেন, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোর সংরক্ষণ ও সুরক্ষা মিসরের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে। একই সঙ্গে দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতা উন্নত করা এবং এসব ঐতিহাসিক স্থানের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোর ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো সরকার নির্ধারণ করে। এরপর নির্দিষ্ট কিছু সেবা বাস্তবায়ন ও পরিচালনায় বেসরকারি খাতের দক্ষতা কাজে লাগানো হয়।
প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান থেকে অর্জিত আয় প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ ও উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি দেশের অন্যান্য প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে রক্ষণাবেক্ষণ, পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ কার্যক্রমেও এই অর্থ সহায়তা করে। এর মাধ্যমে মিসরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসইভাবে সংরক্ষণের পথ আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
বৈঠক শেষে জর্ডানের মন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীরা মিসরের পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্বমন্ত্রী শরিফ ফাতহির সঙ্গে গ্র্যান্ড ইজিপশিয়ান মিউজিয়াম ঘুরে দেখেন। পরে তাঁরা গিজার পিরামিড এলাকা পরিদর্শন করেন।
মিসর ও জর্ডানের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে একত্র করে আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে নতুন ধরনের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে প্রত্নতাত্ত্বিক জ্ঞান বিনিময় ও ঐতিহ্য সংরক্ষণেও দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















