ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও কঠোর করার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের সঙ্গে আর্থিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখা দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ওয়াশিংটন ইরানকে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে একটি ‘অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রে’ পরিণত করতে চায়।
সোমবার নতুন করে প্রায় ৬০টি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও জাহাজের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ইরানের সঙ্গে পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি, সাইবার কার্যক্রম এবং তেল বাণিজ্যে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তালিকার এক-তৃতীয়াংশের বেশি, অর্থাৎ ২১টি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি চীনে অবস্থান করছে।
ডলারের ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার বন্ধের হুমকি
নতুন নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা অন্য দেশগুলোর ওপরও চাপ বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে ওয়াশিংটন। বেসেন্ট বলেছেন, যারা ইরানের হয়ে অর্থপাচার বা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তা করবে, তাদের মার্কিন ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হতে পারে।
তিনি এ উদ্যোগের নাম দিয়েছেন ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’। তাঁর দাবি, এর মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা ইরানের আর্থিক যোগাযোগের ওপর ব্যাপক আক্রমণ চালানো হবে।
বেসেন্ট আরও জানিয়েছেন, ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি, সোনা, বিমান চলাচল ও সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন—এসব খাতেও ভবিষ্যতে দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বিশ্বের অধিকাংশ দেশের ওপর চাপ দেওয়ার পরিকল্পনা
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ইরান ১৪৭টি দেশে পণ্য রপ্তানি করে এবং ১১৪টি দেশ থেকে আমদানি করে। ফলে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকা বিপুলসংখ্যক দেশের ওপর কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র চাপ সৃষ্টি করবে, সে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে বেসেন্ট বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সপ্তাহান্তে বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন এবং ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক কমানোর বিষয়ে নির্দিষ্ট অনুরোধ জানিয়েছেন। এসব দেশকে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তনের জন্য নির্ধারিত সময়সীমাও দেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
তবে কোন কোন দেশকে লক্ষ্য করা হচ্ছে বা কত দিনের মধ্যে তাদের পদক্ষেপ নিতে হবে, তা প্রকাশ করেননি বেসেন্ট। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিকভাবে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছে এবং কার কাছে কী প্রত্যাশা রয়েছে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলো তা জানে।
চীনকে নিয়েও সরাসরি কোনো অবস্থান জানাননি বেসেন্ট। অথচ চীন ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদারদের একটি।
তেহরানের পাল্টা জবাব
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হুমকিকে গুরুত্ব না দেওয়ার বার্তা দিয়েছে ইরান। দেশটির শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ মার্কিন ঘোষণাকে ফাঁকা হুমকি হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ইরানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও ব্যাপকভাবে সীমিত করা বাস্তবে সম্ভব নয়। ইরানের বাণিজ্যিক অংশীদাররাও এসব বক্তব্যকে গুরুত্ব দিচ্ছে না বলে তিনি দাবি করেন।

তবে একই সঙ্গে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোকে সতর্ক করেছে। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান মোহসেন রেজাই বলেছেন, উপসাগরীয় দেশগুলো যদি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কর্মসূচিতে যোগ দেয়, তাহলে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে এক ফোঁটা তেলও বের হতে দেওয়া হবে না।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো পদক্ষেপ নেয়, ইরান তার জবাব অত্যন্ত কঠোরভাবে দেবে।
নতুন করে আলোচনার উদ্যোগ
এর আগে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ কার্যকরের হুমকি দিয়েছিলেন। ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনার জন্য নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমা কোনো অগ্রগতি ছাড়াই শেষ হওয়ার পর ওয়াশিংটন আরও কঠোর অবস্থান নেয়।
ট্রাম্প আলোচনায় ফেরার সম্ভাবনাও নাকচ করে দিয়েছিলেন। তবে সোমবার পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান আসিম মুনির তেহরানে পৌঁছেছেন। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা হিসেবেই তাঁর এই সফরকে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা ও ইরানের পাল্টা হুমকির ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ইরানের হুঁশিয়ারি বাস্তবে রূপ নিলে বৈশ্বিক তেলবাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















