একসময় যাঁরা যাত্রী নিয়ে শহরের রাস্তায় গাড়ি চালাতেন, এখন তাঁদেরই কেউ কেউ কাজ করছেন চালকবিহীন গাড়ির পরিচর্যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি কর্মসংস্থানের ধরন বদলে দিচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশভিলে সাবেক যাত্রীবাহী গাড়িচালকদের অভিজ্ঞতা তারই একটি বাস্তব উদাহরণ।
চালকের আসন ছেড়ে রোবোট্যাক্সির আঙিনায়
ন্যাশভিলে চালকবিহীন গাড়ির বহর পরিচালনার জন্য একটি বড় পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র চালু করার পরিকল্পনা করেছে লিফটের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ফ্লেক্সড্রাইভ। আগামী অক্টোবরে চালু হতে যাওয়া প্রায় ৮০ হাজার বর্গফুটের এই কেন্দ্রে প্রায় ৭০ জন পূর্ণকালীন কর্মী কাজ করবেন। তাঁদের প্রায় অর্ধেকই আগে লিফটের গাড়িচালক ছিলেন।
এখানে তাঁদের দায়িত্ব হবে চালকবিহীন গাড়িগুলো পরিষ্কার করা, চার্জ দেওয়া, গাড়ির অবস্থা পরীক্ষা করা এবং যাত্রী পরিবহনের জন্য গাড়ি প্রস্তুত আছে কি না তা নিশ্চিত করা। অর্থাৎ গাড়ি চালানোর কাজটি যন্ত্রের হাতে গেলেও গাড়িকে সচল রাখার জন্য মানুষের প্রয়োজন এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।
এক দশক গাড়ি চালানোর পর নতুন দায়িত্ব
জোনাথন বেইনস প্রায় এক দশক লিফটে গাড়ি চালিয়েছেন। গান গাওয়ার পেশায় এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নিজের জীবিকা চালাতে তিনি এই কাজ করতেন। এখন তিনি ন্যাশভিলের একটি চালকবিহীন গাড়ি পরিচালনা কেন্দ্রে বহর পরিচালনার দায়িত্বে আছেন।
তাঁর কাজের মধ্যে রয়েছে কেন্দ্রের ভেতরে গাড়ির চলাচল সমন্বয় করা এবং গাড়িগুলো যাত্রী পরিবহনের জন্য প্রস্তুত কি না তা যাচাই করা। বেইনসের কাছে নতুন কাজটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো ভবিষ্যতের একটি প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ।
তিনি মনে করেন, চালকবিহীন পরিবহনব্যবস্থা আরও বিস্তৃত হলে এই অভিজ্ঞতা তাঁকে ভবিষ্যতে আরও বড় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে।
গাড়ি পরিষ্কারে মানুষের চোখ এখনো জরুরি
চালকবিহীন গাড়িগুলো নিজেদের অনেক কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে করতে পারলেও পরিচ্ছন্নতা, চার্জ দেওয়া ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এখনো মানুষের ওপর নির্ভর করতে হয়।
চনসি থম্পসন আগে গাড়ি ভাড়া দেওয়ার ব্যবসায় প্রায় এক দশক কাজ করার পর লিফটে গাড়ি চালিয়েছেন। এখন তিনি গাড়ির বহর পরিচালনার সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে প্রতিটি গাড়ি পরীক্ষা করা, চার্জ দেওয়া, গাড়ির ভেতর-বাইর পরিষ্কার করা, ধুলা পরিষ্কার করা এবং চাকার বাতাসের চাপ পরীক্ষা করা।
কোনো গাড়ি যাত্রী পরিবহনের জন্য যথেষ্ট পরিষ্কার কি না, সেটিও অনেক ক্ষেত্রে মানুষের বিচারবুদ্ধির ওপর নির্ভর করছে।
বৃষ্টির পর গাড়ির নিচের অংশে কাদা জমেছে কি না, জানালার কোনো ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করছে কি না কিংবা গাড়িতে এমন কোনো সমস্যা আছে কি না যা আরও পরীক্ষা করা প্রয়োজন—এসব বিষয় কর্মীদের নজরে আনতে হয়।
চালকবিহীন গাড়ির কাজেও শ্রমের চাহিদা বাড়ছে
স্বয়ংক্রিয় গাড়ির একটি বড় সুবিধা হলো এগুলো মানুষের ঘুম, বিশ্রাম কিংবা ছুটির প্রয়োজনের কারণে থেমে থাকে না। ফলে একটি রোবোট্যাক্সি বছরে প্রায় এক লাখ মাইল পর্যন্ত চলতে পারে। অন্যদিকে সাধারণ ভাড়ার গাড়ি বছরে প্রায় ৪০ হাজার মাইল চলতে পারে।
এর ফলে চালকবিহীন গাড়ির পরিচর্যার প্রয়োজনও অনেক বেশি। বেশি চলাচল মানে ঘন ঘন চার্জ দেওয়া, পরিষ্কার করা, চাকার যন্ত্রাংশ বদলানো এবং মেরামত করা।
প্রচলিত ব্যবস্থায় লিফটের ভাড়ার গাড়ি চালকেরা কয়েক মাস পরপর গাড়ি ফেরত দিতেন। কিন্তু রোবোট্যাক্সির ক্ষেত্রে দিনে প্রায় দুই থেকে তিনবার গাড়িতে হাত দিতে হচ্ছে কর্মীদের।
ফলে চালকের প্রয়োজন কমলেও গাড়িকে ঘিরে নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের প্রয়োজন তৈরি হচ্ছে।
যাত্রী হারালেও সহকর্মী পেলেন সাবেক চালকেরা
গাড়ি চালানোর সময় বেইনস ও থম্পসনের প্রতিদিনই নতুন নতুন যাত্রীর সঙ্গে দেখা হতো। মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ছিল তাঁদের কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নতুন কর্মস্থলে সেই অভিজ্ঞতা অনেকটাই কমেছে।
তবে এর বদলে তাঁরা পেয়েছেন সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা এবং দলগতভাবে কাজ করার সুযোগ।
বেইনসের কাছে গাড়ি চালানোর সামাজিক যোগাযোগের বিষয়টি এখনো আকর্ষণীয়। কিন্তু কাজের ধরন বিবেচনায় তিনি নতুন দায়িত্বকেই বেশি পছন্দ করছেন।
থম্পসনের কাছেও এই কাজ তুলনামূলকভাবে ভবিষ্যৎনির্ভর বলে মনে হচ্ছে। প্রযুক্তির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকা তাঁকে কর্মজীবনের নিরাপত্তা সম্পর্কে বেশি আশাবাদী করছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি চাকরি কমাবে, নাকি কাজের ধরন বদলাবে?
ন্যাশভিলের এই ঘটনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে শ্রমবাজারে যে পরিবর্তন আসছে, তার একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
অর্থনীতিবিদ ও শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সব ক্ষেত্রে সরাসরি চাকরি কেড়ে নেবে—বিষয়টি এত সরল নয়। বরং একটি চাকরির কিছু দায়িত্ব যন্ত্রের হাতে চলে যেতে পারে, আর অন্য দায়িত্ব মানুষের হাতে থেকে যেতে পারে। একই সঙ্গে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের কাজও তৈরি হতে পারে।
মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, কর্মীদের একটি বড় অংশ মনে করছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তাঁদের বর্তমান দায়িত্বের ধরন উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে দেবে। একই সময়ে নতুন চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে এমন অনেক দক্ষতার চাহিদা দেখা যাচ্ছে, যা দেড় বছর আগের একই ধরনের চাকরিতে ছিল না।
তবে হারিয়ে যাওয়া চাকরির সংখ্যা অনুযায়ী নতুন প্রযুক্তিনির্ভর চাকরি তৈরি হচ্ছে—এমন সমতা এখনো দেখা যাচ্ছে না।
ভবিষ্যতের কর্মজীবনের নতুন বাস্তবতা
চালকবিহীন গাড়ি হয়তো ধীরে ধীরে গাড়ির স্টিয়ারিংয়ের পেছন থেকে মানুষকে সরিয়ে দেবে। কিন্তু সেই গাড়িকে পরিষ্কার রাখা, চার্জ দেওয়া, পরীক্ষা করা, মেরামত করা এবং সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য মানুষের প্রয়োজন থেকেই যাচ্ছে।
অর্থাৎ প্রযুক্তি মানুষের কাজ পুরোপুরি বিলীন করার বদলে অনেক ক্ষেত্রে কাজের ভেতরের দায়িত্বগুলোকে নতুনভাবে ভাগ করে দিচ্ছে। আজকের সাবেক গাড়িচালক আগামী দিনের স্বয়ংক্রিয় পরিবহনব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণকর্মী কিংবা পরিচালনাকর্মী হয়ে উঠতে পারেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু কত চাকরি হারাবে তা নয়; বরং কাজের ধরন কীভাবে বদলে যাবে এবং সেই পরিবর্তনের সঙ্গে কর্মীরা কত দ্রুত মানিয়ে নিতে পারবেন—সেটিই হয়ে উঠছে গুরুত্বপূর্ণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















