ইয়েনের দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা জাপানের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেক প্রতিষ্ঠান এখন পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, আগাম বিনিময় হার নির্ধারণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি কমানোর নতুন কৌশল গ্রহণ করছে।
দক্ষিণ টোকিওর ৪৩টি বিপণিবিতান পরিচালনা করেন তাকু উএনো। যুক্তরাষ্ট্র থেকে গরুর মাংস, স্পেন থেকে জলপাই তেল এবং ইতালি থেকে টমেটো আমদানি করেন তিনি। কিন্তু ইয়েনের ধারাবাহিক দরপতনে এসব পণ্য কেনার খরচ প্রায় প্রতিদিনই বাড়ছে।
উএনোর প্রতিষ্ঠান এখন বিদেশি সরবরাহকারীদের সঙ্গে সরাসরি ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির দিকে যাচ্ছে। এসব চুক্তিতে এক বছর পর্যন্ত পণ্যের দাম ও বিনিময় হার নির্দিষ্ট করে রাখা হচ্ছে। এতে হঠাৎ করে পণ্যের দাম বাড়াতে হচ্ছে না এবং ক্রেতা হারানোর ঝুঁকিও কিছুটা কমছে।
ইয়েনের পতনে বাড়ছে আমদানি ব্যয়
গত পাঁচ বছরে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইয়েনের দর ৩০ শতাংশের বেশি কমেছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রতি ডলারের বিপরীতে ইয়েনের দর প্রায় ১৬৪-তে নেমে যায়, যা প্রায় ৪০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি। পরে কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও ইয়েন এখনো দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
আগে ছোট ব্যবসাগুলো আমদানি ব্যয়ের সামান্য বৃদ্ধি নিজেরাই বহন করত। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে ইয়েন দুর্বল থাকায় সেই চাপ এখন আর সামলানো সহজ হচ্ছে না। ফলে তারা ভবিষ্যতে ইয়েনের আরও দরপতনের ঝুঁকি কমাতে বিভিন্ন আর্থিক কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে।
উএনো জানান, আগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গরুর মাংস কেনার দাম প্রতি মাসে আলোচনা করা হতো। কিন্তু বিনিময় হার দ্রুত পরিবর্তন হওয়ায় এখন তিন মাস পরপর দর নির্ধারণ করা হচ্ছে। এর ফলে অন্তত তিন মাস পণ্যের দাম না বাড়িয়েও ব্যবসা চালানো সম্ভব হচ্ছে।
বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে জাপান
ইয়েনের দুর্বলতার আরেকটি প্রভাব পড়ছে জাপানের আন্তর্জাতিক ক্রয়ক্ষমতার ওপর। উএনোর মতে, জাপান এখন বিদেশি পণ্য কেনার ক্ষেত্রে আগের তুলনায় অনেকটাই দুর্বল অবস্থানে রয়েছে।
গরুর মাংস কেনার সময় চীন ও থাইল্যান্ডের ক্রেতাদের কাছে নিয়মিতভাবে পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে বলেও তিনি জানান। এমনকি ভালো দামে পণ্য সংগ্রহ করতে সরবরাহকারীদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করে অনুরোধ করতে হচ্ছে।
জাপানের তুলনামূলক কম সুদের হার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধীরগতির সুদহার বৃদ্ধিকে ইয়েনের দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশটির বড় ঋণের বোঝা নিয়েও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ রয়েছে।
রপ্তানিকারকরাও চাইছেন স্থিতিশীলতা
ইয়েন দুর্বল হলে জাপানের রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত সুবিধা পায়। বিদেশ থেকে অর্জিত আয় ইয়েনে হিসাব করলে বেশি অর্থ পাওয়া যায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানও শক্তিশালী হয়।
তবে দীর্ঘস্থায়ী দুর্বল ইয়েন এখন তাদের কাছেও নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। কারণ উৎপাদনের জন্য বিদেশ থেকে কাঁচামাল ও অন্যান্য পণ্য আমদানি করতে হয়। ফলে ইয়েনের দরপতনে আমদানি ব্যয় বাড়তে থাকলে রপ্তানি থেকে পাওয়া অতিরিক্ত সুবিধার একটি অংশ হারিয়ে যায়।
জাপানের বৃহৎ আসবাবপত্র বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান নিতোরি হোল্ডিংস জানিয়েছে, ডলারের বিপরীতে ইয়েনের বিনিময় হার এক ইয়েন পরিবর্তিত হলে তাদের মুনাফায় প্রায় ২০০ কোটি ইয়েনের প্রভাব পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে ইয়েনের দুর্বলতা চরম পর্যায়ে গেলে ভবিষ্যতে তারা আগাম বৈদেশিক মুদ্রা চুক্তির কথাও বিবেচনা করতে পারে।
পাঁচ থেকে দশ বছর পর্যন্ত ঝুঁকি আটকে রাখার চেষ্টা
জাপানের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা নেওয়ার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। আগে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান কয়েক মাস থেকে সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য বিনিময় হার নির্দিষ্ট করে রাখত। এখন কিছু প্রতিষ্ঠান পাঁচ থেকে দশ বছর পর্যন্ত হার নির্দিষ্ট রাখতে আগ্রহ দেখাচ্ছে।
এর অর্থ হলো, জাপানের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ইয়েনের দর আগের অবস্থায় ফিরে আসবে—এমন প্রত্যাশার ওপর আর পুরোপুরি নির্ভর করছে না। বরং দীর্ঘ সময় ধরে দুর্বল ইয়েনের সম্ভাবনা মাথায় রেখে নিজেদের ব্যয় ও আয় পরিকল্পনা করছে।
ইয়েন ঘুরে দাঁড়ালেও প্রস্তুত থাকতে চায় প্রতিষ্ঠানগুলো
বৈদেশিক মুদ্রার বাজারেও ইয়েন নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আশাবাদ খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক সরকারি হস্তক্ষেপ ও জাপানের সুদহার বাড়ার সম্ভাবনা কিছুটা বাড়লেও এক বছরের মেয়াদের বাজারদরে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়নি।
বাজারসংশ্লিষ্টদের বড় একটি অংশ মনে করছে, ডলারের বিপরীতে ইয়েনের দর ১৫০-এর নিচে নামার সম্ভাবনা এখনো সীমিত। ফলে ১৫৫ থেকে ১৬৫-এর মধ্যে বিনিময় হার দীর্ঘ সময় থাকতে পারে—এমন ধারণা তৈরি হয়েছে।
তবে পরিস্থিতি উল্টে গিয়ে ইয়েন শক্তিশালী হলেও রপ্তানিকারকদের ক্ষতি হতে পারে। তাই তারাও এখন আগাম ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কথা ভাবছে। অর্থাৎ ইয়েন দুর্বল থাকুক কিংবা হঠাৎ শক্তিশালী হয়ে উঠুক—দুই পরিস্থিতির জন্যই জাপানের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের প্রস্তুত করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী ইয়েন দুর্বলতা এখন শুধু মুদ্রাবাজারের বিষয় নয়; এটি জাপানের পণ্য আমদানি, ভোক্তা মূল্য, ব্যবসায়িক মুনাফা এবং আন্তর্জাতিক ক্রয়ক্ষমতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ফলে দেশটির ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা আগামী দিনগুলোতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ইয়েনের দুর্বলতা, জাপানের ব্যবসা ও আমদানি ব্যয়—এই তিনটি বিষয়ই এখন দেশটির অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















