ইরানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বজায় রাখা দেশগুলোকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক অব্যাহত রাখলে সংশ্লিষ্ট দেশ ও প্রতিষ্ঠানের ওপরও পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে। তবে আপাতত নতুন করে ওই ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কার্যকর না করে দেশগুলোকে প্রস্তুতির জন্য কিছুটা সময় দেওয়া হচ্ছে।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ছয় মাসের কাছাকাছি পৌঁছানোর প্রেক্ষাপটে সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় এই হুঁশিয়ারি দেয়। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের বৈশ্বিক আর্থিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ তৈরির ঘোষণা দেন। তিনি একে ইরানের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক আক্রমণ’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
৬০ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় একই দিনে ৬০ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। তবে ইরানের তেল বাণিজ্যে সহায়তার অভিযোগ থাকা চীনের কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে এই তালিকায় রাখা হয়নি।
বেসেন্ট বলেন, বিশ্ব অর্থব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তোলার মতো পদক্ষেপ নিতে চায় না যুক্তরাষ্ট্র। তাই সংশ্লিষ্ট দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তনের জন্য সময় দেওয়া হচ্ছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই সময় খুব বেশি দীর্ঘ হবে না এবং যুক্তরাষ্ট্র তার অবস্থান নিয়ে অত্যন্ত কঠোর।
ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হিসেবে কয়েক বছর ধরে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর ইরানি তেল কেনার ওপর ওয়াশিংটন ইতোমধ্যে চাপ বাড়িয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত চীনা ব্যাংকগুলোকে সরাসরি লক্ষ্য করে বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ থেকে বিরত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
চীনা ব্যাংক নিয়েও বাড়ছে চাপ
ইরানের তেল বিক্রির অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় কোনো দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান সহায়তা করলে তারা নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বেসেন্ট।
তিনি বলেন, ইরানি তেলকে অর্থে রূপান্তরের যে আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে কোনো প্রতিষ্ঠান যুক্ত থাকবে, সেটি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে চীনের কোনো বড় ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে। আগামী সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ওয়াশিংটনে বৈঠকের কথা রয়েছে। এর আগে চীনা ব্যাংককে লক্ষ্য করে কঠোর পদক্ষেপ নিলে দুই দেশের মধ্যে গত নভেম্বরে হওয়া বাণিজ্যিক সমঝোতার ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
পাঁচ খাতে বাড়ছে নিষেধাজ্ঞার পরিধি
ইরানের অর্থনীতির পাঁচটি খাতে পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞার আওতা বাড়ানোর কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এগুলো হলো ডিজিটাল সম্পদ, স্বর্ণ, প্রযুক্তি, বিমান চলাচল এবং নৌপরিবহন।
এ ছাড়া চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুরসহ কয়েকটি দেশের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সোমবারের নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে। ফ্রান্সের একটি ভোজ্যতেল শোধনাগারও রয়েছে ওই তালিকায়।
বেসেন্ট আরও জানান, চলতি সপ্তাহের শেষ নাগাদ একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কোন প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞায়ও টিকে আছে ইরান
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নতুন নয়। কয়েক দশক ধরে দেশটির তেল আয় কমানো, অস্ত্রের যন্ত্রাংশ সংগ্রহে বাধা দেওয়া এবং ইরানের অর্থনীতিতে প্রভাবশালী ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত ব্যবসায় অর্থপ্রবাহ বন্ধ করার চেষ্টা করে আসছে ওয়াশিংটন।
নিষেধাজ্ঞার কারণে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন ডলারভিত্তিক আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তবে ইরান বিভিন্ন সময় নতুন কোম্পানি, জাহাজের নিবন্ধন ও ব্যবসায়িক কাঠামো ব্যবহার করে এসব নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করেছে।
সম্প্রতি ইরানের তেল পরিবহনে ব্যবহৃত ছায়া নৌবহর এবং তেলবাহী জাহাজের বীমা ব্যবস্থার ওপরও নিষেধাজ্ঞা বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানি তেল কেনা চীনের ছোট স্বাধীন শোধনাগারগুলোকেও লক্ষ্য করা হয়েছে।
নৌ অবরোধে ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা
দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরান অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হলেও যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ দেশটির ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।
এর প্রভাব ইরানি অপরিশোধিত তেলের ওপর চীনা ক্রেতাদের আগ্রহেও দেখা যাচ্ছে। ফলে চীনের ওপর ভবিষ্যতে পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে তার প্রভাব কিছুটা কম হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ চলতি মাসের শুরুতে বলেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে যেতে পারে ওয়াশিংটন। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার চাপ আরও বাড়ানোর ইঙ্গিত
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ইরান-সম্পর্কিত এক হাজারের বেশি ব্যক্তি, জাহাজ ও উড়োজাহাজের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোর মধ্যে ইরানের ছায়া তেলবাহী নৌবহর, জাহাজের বীমা, অস্ত্র সংগ্রহের নেটওয়ার্ক এবং ডিজিটাল মুদ্রা বিনিময়ব্যবস্থা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল সম্পদও জব্দ বা স্থগিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বেসেন্ট বিশেষভাবে ইরানের ব্যাংক মেল্লির কার্যক্রম বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ায় ব্যাংকটির শাখাগুলোকে কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক সংঘাত যখন ছয় মাসের দিকে এগোচ্ছে, তখন নতুন করে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর এই কৌশল ওয়াশিংটনের জন্য সামরিক পদক্ষেপের বিকল্প হিসেবেও দেখা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞায় অভ্যস্ত ইরানের ওপর নতুন অর্থনৈতিক চাপ কার্যকর করতে হলে শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, উপসাগরীয় দেশগুলোর সহযোগিতাও প্রয়োজন হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















