যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির সামনে বহুমাত্রিক আর্থিক সংকট ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। বিপুল সরকারি ঋণ, বাড়তে থাকা সুদ পরিশোধের ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য খাতে বাধ্যতামূলক ব্যয় এবং প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন করে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের বিপুল বিনিয়োগ। অদ্ভুতভাবে, যে প্রযুক্তি ভবিষ্যতে উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর বড় চালিকাশক্তি হতে পারে, স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে সেটিই যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি রাজস্বের ওপর চাপ তৈরি করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ ইতোমধ্যে ৪০ লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদ কমানোর চেষ্টা করলেও বাজারের উদ্বেগ কাটছে না। কারণ, সরকারের বাজেট ঘাটতির মূল কাঠামোগত কারণগুলো এখনো বহাল রয়েছে।
বাজেট ঘাটতির গভীরে বড় সংকট
যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক বাজেট ঘাটতি বর্তমানে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৬ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থ মন্ত্রণালয় অপচয়, দুর্নীতি ও সরকারি ব্যয়ের অদক্ষতা কমিয়ে সাশ্রয়ের কথা বললেও অর্থনীতিবিদদের বড় অংশ মনে করছেন, এসব পদক্ষেপ দিয়ে বিশাল ঘাটতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনা কঠিন।
কারণ, সরকারের মোট বার্ষিক ব্যয়ের প্রায় ৬০ শতাংশই বাধ্যতামূলক ব্যয়। এর বড় অংশ যায় সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচিতে। জনসংখ্যার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব খাতে ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে।

অন্যদিকে প্রায় ২ লাখ কোটি ডলারের মতো বিবেচনাধীন ব্যয়ের মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতও বড় অংশ দখল করে আছে। আগামী কয়েক বছরে প্রতিরক্ষা ব্যয় আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ৪০ লাখ কোটি ডলারের সরকারি ঋণের ওপর বছরে ১ লাখ কোটি ডলারের বেশি সুদ পরিশোধের চাপ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেন রাজস্ব কমাচ্ছে
এখানেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট সমস্যার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো তৈরিতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। বিশাল তথ্যকেন্দ্র, কম্পিউটিং অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট কারখানা নির্মাণে বিপুল মূলধন ব্যয় হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক করনীতিতে এসব বিনিয়োগের একটি বড় অংশ তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবসায়িক ব্যয় হিসেবে দেখিয়ে করযোগ্য মুনাফা কমানোর সুযোগ রয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ যত বাড়ছে, স্বল্পমেয়াদে তাদের করযোগ্য আয় তত কমছে।
এর প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সামগ্রিক কর রাজস্ব কিছুটা বাড়লেও করপোরেট কর থেকে আয় প্রায় ২৩ শতাংশ কমেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামো নির্মাণ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ফলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো আগামী কয়েক বছরও বিপুল মূলধনী বিনিয়োগ চালিয়ে গেলে করপোরেট কর রাজস্ব তুলনামূলকভাবে দুর্বল থাকতে পারে।
একদিকে কর কমছে, অন্যদিকে ঋণের প্রতিযোগিতা বাড়ছে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব শুধু সরকারি রাজস্ব কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এই খাতে বিপুল অর্থ সংগ্রহের জন্য বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘমেয়াদি ঋণও নিচ্ছে।
একটি বড় বিনিয়োগ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামোর জন্য প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের উচ্চমানের করপোরেট ঋণ বাজারে আসতে পারে। ২০২৭ সালে নতুন মূলধনী ব্যয়ের পরিকল্পনা প্রায় ১ দশমিক ৪ লাখ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।
অর্থাৎ, একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিতে হচ্ছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোও বাজার থেকে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করছে। এতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের বাজারে অর্থের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়ছে এবং সুদের হার ওপরের দিকে থাকার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ে নতুন চাপ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগ অর্থনীতিতে চাহিদা বাড়াচ্ছে। যদি এই বিনিয়োগ মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়িয়ে দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য সুদের হার কমানো আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত টানাপোড়েনও বাড়তে পারে। কারণ, সরকার চাইছে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের সুদ কমাতে, আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সুদের হার তুলনামূলকভাবে বেশি রাখতে বাধ্য হতে পারে।
উচ্চ সুদের হার অব্যাহত থাকলে সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় আরও বাড়বে। ফলে বাজেট ঘাটতি কমানোর পরিবর্তে তা আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
২০৩৬ সালে ঋণ ৫৬ লাখ কোটি ডলারে?
যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়। সরকারি পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী এক দশকে জনগণের কাছে থাকা সরকারি ঋণের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ২০৩৬ সালের মধ্যে প্রায় ৫৬ লাখ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের বড় উদ্বেগ হলো, এই ঋণের প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সরকারের সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়বে। একই সময়ে সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমানোর রাজনৈতিক ইচ্ছা সীমিত এবং কর বাড়ানোর ক্ষেত্রেও রয়েছে প্রবল রাজনৈতিক বাধা।
ফলে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়লেই বাজেট ঘাটতির মূল সমস্যা সমাধান হবে—এমন ধারণা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাফল্যই এখন বড় পরীক্ষা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপুল বিনিয়োগ শেষ পর্যন্ত কতটা উৎপাদনশীলতা বাড়াবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
এই প্রযুক্তি যদি উৎপাদনশীলতা দ্রুত বাড়িয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে বড় আকারের বিনিয়োগের সুফল কর রাজস্ব ও অর্থনীতির ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু সেই সুফল পেতে সময় লাগবে।
তার আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো নির্মাণের কারণে করপোরেট রাজস্বের চাপ সামলাতে হবে, অন্যদিকে সরকারি ঋণের সুদ ও বাধ্যতামূলক ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান বোঝাও বহন করতে হবে।
অর্থাৎ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য ভবিষ্যতের সম্ভাবনার প্রতীক হলেও বর্তমানে এটি দেশটির আর্থিক ব্যবস্থার জন্য একটি বড় পরীক্ষাও হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তির এই বিপুল বিনিয়োগ শেষ পর্যন্ত অর্থনীতিকে কতটা শক্তিশালী করবে এবং সেই সুফল সরকারি ঋণের পাহাড় সামলাতে কতটা সহায়তা করবে—তার ওপরই অনেকটাই নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ আর্থিক স্থিতিশীলতা।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিনিয়োগ—এই দুইয়ের সম্পর্কই এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















