০১:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬
এক ইয়াসমিনে যে দেশ জেগেছিল, শত ইয়াসমিনে আজ কেন নীরব? অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করাতে গ্রামকেই করতে হবে প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র টিনুবুর মাদক-সংক্রান্ত নথি গোপনে আদালতে জমা দেওয়ার অনুমতি এফবিআইকে ২০২৭ সালের নির্বাচনে দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ-দক্ষিণাঞ্চলকে ঘিরে টিনুবু শিবিরের নতুন হিসাব নাইজেরিয়ায় খ্রিস্টান অধ্যুষিত এলাকায় সহিংসতা, তীব্র সমালোচনার মুখে প্রেসিডেন্ট টিনুবু নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় চাপে ইরান, স্বীকার করলেন প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বার্লিন প্রাচীর নির্মাণের ৬৫ বছর: স্মরণে নানা আয়োজন, ব্রান্ডেনবুর্গ ফটকে শিল্পস্থাপনা ঠিকানা না থাকলেও ভোট দিতে পারবেন গৃহহীনরা, বার্লিনে বিশেষ উদ্যোগ মিসর-জর্ডানের নতুন পর্যটন জোট, এক সফরেই মিলবে দুই দেশের ঐতিহ্যের স্বাদ গাজার আকাশে যুদ্ধ কমলেও বদলে যাচ্ছে মানচিত্র

দক্ষিণ আফগানিস্তানে নারীর কণ্ঠ স্তব্ধ, সংবাদমাধ্যমে নেই কোনো নারী সাংবাদিক

আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলের কান্দাহার, হেলমান্দ, জাবুল ও উরুজগান প্রদেশে সংবাদমাধ্যম থেকে নারীদের উপস্থিতি পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। বর্তমানে এসব প্রদেশের কোনো সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে একজন নারী সাংবাদিকও কর্মরত নেই। একসময় যেসব নারী সাংবাদিক সংবাদ সংগ্রহ, প্রতিবেদন তৈরি এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় সক্রিয় ছিলেন, তাদের কেউ দেশ ছেড়েছেন, আবার কেউ কাজ হারিয়ে ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন।

একসময় কর্মচঞ্চল ছিল নারীদের সংবাদকক্ষ

কান্দাহারের একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের এক সাংবাদিক জানান, প্রজাতান্ত্রিক সরকার পতনের আগে প্রদেশটির বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রায় ২৫ জন নারী সাংবাদিক কাজ করতেন। তারা নিয়মিত সংবাদ সংগ্রহের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুষ্ঠান উপস্থাপন করতেন। তাদের মাসিক বেতন ছিল প্রায় ১০ হাজার থেকে ২৫ হাজার আফগানি।

তবে তালেবান ক্ষমতা গ্রহণের পর ধীরে ধীরে এসব নারী সাংবাদিককে কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। অনেকে নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কারণে দেশ ছেড়ে চলে যান। যারা দেশে রয়ে গেছেন, তাদের অনেকেই এখন কর্মহীন অবস্থায় ঘরে অবস্থান করছেন।

কান্দাহারে থাকা কয়েকজন নারী সাংবাদিক জানিয়েছেন, ২০২৩ সালে তাদের পরিবারকে নৈতিকতা প্রচার ও অনৈতিকতা প্রতিরোধ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে তারা যেন সংবাদমাধ্যমে কাজ বন্ধ করে দেন।

Female Afghan Journalists Describe Life Under Taliban Misogyny

চাকরি হারিয়ে অর্থকষ্টে সাংবাদিকেরা

সাত বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এক নারী সাংবাদিক জানান, প্রায় দুই বছর আগে বাধ্য হয়ে তাকে পেশা ছাড়তে হয়েছে। বর্তমানে তিনি তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছেন। তবু একদিন আবার সাংবাদিকতায় ফিরতে পারবেন—এই আশায় আছেন তিনি।

তার ভাষায়, নারীদের কাজের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের পর চাকরি ছেড়ে দেওয়া ছাড়া তার সামনে আর কোনো পথ ছিল না। অর্থনৈতিক সংকট তাকে প্রতিনিয়ত চাপে ফেললেও সংবাদমাধ্যমে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা এখনও অটুট। তার কাছে সাংবাদিকতা কেবল একটি চাকরি নয়, এটি তার পরিচয়ের অংশ।

উরুজগানেও নারীদের জন্য বন্ধ সাংবাদিকতার দরজা

উরুজগান প্রদেশেও নারী সাংবাদিকদের কাজের সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ। প্রদেশ ছেড়ে পরিবারের সঙ্গে পাকিস্তানে আশ্রয় নেওয়া এক নারী সাংবাদিক বলেন, দেশের বড় শহরগুলোতে নারীরা সাংবাদিক হিসেবে কাজ করার কিছু সুযোগ পাচ্ছেন। তাহলে উরুজগানের নারীরা কেন সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।

তার মতে, সংবাদমাধ্যমে নারীদের উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নারীরা নারীদের সমস্যা ও অভিজ্ঞতা সরাসরি তুলে ধরতে পারেন। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক সংকট ও নিরাপত্তার আশঙ্কায় তাদের পরিবারকে আফগানিস্তান ছাড়তে হয়েছে।

পাকিস্তানে গিয়েও তাদের জীবন সহজ হয়নি। সেখানে নানা ধরনের সংকটের মুখে পড়তে হচ্ছে বলে তিনি জানান। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি তিনি তাদের পরিস্থিতির দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

IFJBlog: Silenced but Unbroken: The Struggle of Women Journalists in  Taliban-Controlled Afghanistan - IFJ

শুধু চাকরি নয়, কথা বলার অধিকারও সংকুচিত

দক্ষিণ আফগানিস্তানে নারীদের ওপর বিধিনিষেধ শুধু সংবাদমাধ্যমে চাকরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোকে সরাসরি সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানে নারী শ্রোতাদের ফোনে অংশ নেওয়ার সুযোগ না দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

হেলমান্দের এক নারী শ্রোতা জানান, প্রায় তিন বছর ধরে তিনি সরাসরি সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারছেন না। প্রতিবার ফোন করলে অনুষ্ঠানের উপস্থাপক তার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

তিনি বলেন, এটি স্পষ্ট বৈষম্য। পুরুষদের মতো নারীদেরও ফোন করে নিজেদের উদ্বেগ ও মতামত জানানোর সুযোগ থাকা উচিত।

নীরব হয়ে যাচ্ছে দক্ষিণের সংবাদমাধ্যম

হেলমান্দ ও জাবুলের সংবাদমাধ্যমের ব্যবস্থাপকরাও জানিয়েছেন, বর্তমানে তাদের কোনো প্রতিষ্ঠানে নারী কর্মরত নেই। ফলে দক্ষিণ আফগানিস্তানের সংবাদমাধ্যমে নারীদের কণ্ঠ যেমন হারিয়ে যাচ্ছে, তেমনি নারীদের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত নানা সমস্যা ও অভিজ্ঞতাও সরাসরি তুলে ধরার সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।

কান্দাহার ও আশপাশের প্রদেশগুলোতে নারীদের সংবাদমাধ্যমে অংশগ্রহণের ওপর বিধিনিষেধ ক্রমেই কঠোর হচ্ছে। একসময় সংবাদকক্ষ ও বেতার-টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে যেসব নারী সক্রিয় ছিলেন, তাদের অনুপস্থিতি এখন দক্ষিণ আফগানিস্তানের গণমাধ্যমের বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

দক্ষিণ আফগানিস্তানে নারীদের সাংবাদিকতা থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার এই পরিস্থিতি শুধু কর্মসংস্থানের সংকট নয়; এটি সমাজের অর্ধেক মানুষের নিজস্ব অভিজ্ঞতা, সমস্যা ও মতামত প্রকাশের সুযোগও সংকুচিত করে দিচ্ছে।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

এক ইয়াসমিনে যে দেশ জেগেছিল, শত ইয়াসমিনে আজ কেন নীরব?

দক্ষিণ আফগানিস্তানে নারীর কণ্ঠ স্তব্ধ, সংবাদমাধ্যমে নেই কোনো নারী সাংবাদিক

১২:২৯:২৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬

আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলের কান্দাহার, হেলমান্দ, জাবুল ও উরুজগান প্রদেশে সংবাদমাধ্যম থেকে নারীদের উপস্থিতি পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। বর্তমানে এসব প্রদেশের কোনো সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে একজন নারী সাংবাদিকও কর্মরত নেই। একসময় যেসব নারী সাংবাদিক সংবাদ সংগ্রহ, প্রতিবেদন তৈরি এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় সক্রিয় ছিলেন, তাদের কেউ দেশ ছেড়েছেন, আবার কেউ কাজ হারিয়ে ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন।

একসময় কর্মচঞ্চল ছিল নারীদের সংবাদকক্ষ

কান্দাহারের একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের এক সাংবাদিক জানান, প্রজাতান্ত্রিক সরকার পতনের আগে প্রদেশটির বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রায় ২৫ জন নারী সাংবাদিক কাজ করতেন। তারা নিয়মিত সংবাদ সংগ্রহের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুষ্ঠান উপস্থাপন করতেন। তাদের মাসিক বেতন ছিল প্রায় ১০ হাজার থেকে ২৫ হাজার আফগানি।

তবে তালেবান ক্ষমতা গ্রহণের পর ধীরে ধীরে এসব নারী সাংবাদিককে কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। অনেকে নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কারণে দেশ ছেড়ে চলে যান। যারা দেশে রয়ে গেছেন, তাদের অনেকেই এখন কর্মহীন অবস্থায় ঘরে অবস্থান করছেন।

কান্দাহারে থাকা কয়েকজন নারী সাংবাদিক জানিয়েছেন, ২০২৩ সালে তাদের পরিবারকে নৈতিকতা প্রচার ও অনৈতিকতা প্রতিরোধ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে তারা যেন সংবাদমাধ্যমে কাজ বন্ধ করে দেন।

Female Afghan Journalists Describe Life Under Taliban Misogyny

চাকরি হারিয়ে অর্থকষ্টে সাংবাদিকেরা

সাত বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এক নারী সাংবাদিক জানান, প্রায় দুই বছর আগে বাধ্য হয়ে তাকে পেশা ছাড়তে হয়েছে। বর্তমানে তিনি তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছেন। তবু একদিন আবার সাংবাদিকতায় ফিরতে পারবেন—এই আশায় আছেন তিনি।

তার ভাষায়, নারীদের কাজের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের পর চাকরি ছেড়ে দেওয়া ছাড়া তার সামনে আর কোনো পথ ছিল না। অর্থনৈতিক সংকট তাকে প্রতিনিয়ত চাপে ফেললেও সংবাদমাধ্যমে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা এখনও অটুট। তার কাছে সাংবাদিকতা কেবল একটি চাকরি নয়, এটি তার পরিচয়ের অংশ।

উরুজগানেও নারীদের জন্য বন্ধ সাংবাদিকতার দরজা

উরুজগান প্রদেশেও নারী সাংবাদিকদের কাজের সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ। প্রদেশ ছেড়ে পরিবারের সঙ্গে পাকিস্তানে আশ্রয় নেওয়া এক নারী সাংবাদিক বলেন, দেশের বড় শহরগুলোতে নারীরা সাংবাদিক হিসেবে কাজ করার কিছু সুযোগ পাচ্ছেন। তাহলে উরুজগানের নারীরা কেন সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।

তার মতে, সংবাদমাধ্যমে নারীদের উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নারীরা নারীদের সমস্যা ও অভিজ্ঞতা সরাসরি তুলে ধরতে পারেন। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক সংকট ও নিরাপত্তার আশঙ্কায় তাদের পরিবারকে আফগানিস্তান ছাড়তে হয়েছে।

পাকিস্তানে গিয়েও তাদের জীবন সহজ হয়নি। সেখানে নানা ধরনের সংকটের মুখে পড়তে হচ্ছে বলে তিনি জানান। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি তিনি তাদের পরিস্থিতির দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

IFJBlog: Silenced but Unbroken: The Struggle of Women Journalists in  Taliban-Controlled Afghanistan - IFJ

শুধু চাকরি নয়, কথা বলার অধিকারও সংকুচিত

দক্ষিণ আফগানিস্তানে নারীদের ওপর বিধিনিষেধ শুধু সংবাদমাধ্যমে চাকরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোকে সরাসরি সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানে নারী শ্রোতাদের ফোনে অংশ নেওয়ার সুযোগ না দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

হেলমান্দের এক নারী শ্রোতা জানান, প্রায় তিন বছর ধরে তিনি সরাসরি সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারছেন না। প্রতিবার ফোন করলে অনুষ্ঠানের উপস্থাপক তার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

তিনি বলেন, এটি স্পষ্ট বৈষম্য। পুরুষদের মতো নারীদেরও ফোন করে নিজেদের উদ্বেগ ও মতামত জানানোর সুযোগ থাকা উচিত।

নীরব হয়ে যাচ্ছে দক্ষিণের সংবাদমাধ্যম

হেলমান্দ ও জাবুলের সংবাদমাধ্যমের ব্যবস্থাপকরাও জানিয়েছেন, বর্তমানে তাদের কোনো প্রতিষ্ঠানে নারী কর্মরত নেই। ফলে দক্ষিণ আফগানিস্তানের সংবাদমাধ্যমে নারীদের কণ্ঠ যেমন হারিয়ে যাচ্ছে, তেমনি নারীদের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত নানা সমস্যা ও অভিজ্ঞতাও সরাসরি তুলে ধরার সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।

কান্দাহার ও আশপাশের প্রদেশগুলোতে নারীদের সংবাদমাধ্যমে অংশগ্রহণের ওপর বিধিনিষেধ ক্রমেই কঠোর হচ্ছে। একসময় সংবাদকক্ষ ও বেতার-টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে যেসব নারী সক্রিয় ছিলেন, তাদের অনুপস্থিতি এখন দক্ষিণ আফগানিস্তানের গণমাধ্যমের বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

দক্ষিণ আফগানিস্তানে নারীদের সাংবাদিকতা থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার এই পরিস্থিতি শুধু কর্মসংস্থানের সংকট নয়; এটি সমাজের অর্ধেক মানুষের নিজস্ব অভিজ্ঞতা, সমস্যা ও মতামত প্রকাশের সুযোগও সংকুচিত করে দিচ্ছে।