মাজার-ই-শরিফের নারী অধিকারকর্মী সামিয়া শেরজাদ হাজারো আফগান নারীর একজন, যাঁদের জীবন ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর আমূল বদলে গেছে। স্বাধীনতা, শিক্ষা, কাজ ও সমান অধিকারের দাবিতে রাজপথে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন থেকে শুরু করে তালেবানের কারাগারে বন্দিত্ব—এরপর বাধ্যতামূলক নির্বাসন; সামিয়ার জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন আফগান নারীদের ওপর চলা দমন-পীড়নের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।
প্রতিবাদের রাজপথ থেকে কারাগারে
২০২১ সালের আগস্টে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করার পর সামিয়া ও তাঁর সহযোদ্ধারা নীরব থাকেননি। তাঁরা রাস্তায় নেমে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাধীনভাবে চলাফেরা এবং মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার দাবি করেন।
সামিয়ার ভাষায়, তাঁদের প্রতিবাদ ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। কিন্তু সেই প্রতিবাদের জবাব আসে সহিংসতার মাধ্যমে। অস্ত্র ও লাঠি নিয়ে তালেবান সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালায়। নারী, কিশোরী ও পুরুষ—কেউই সেই নির্যাতন থেকে রেহাই পাননি। সামিয়াকেও সেদিন অন্য অনেক নারীর সঙ্গে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়।

কারাগারে নির্যাতনের ভয়াবহ দিন
কারাগারে সামিয়ার অভিজ্ঞতা ছিল আরও ভয়াবহ। তাঁর দাবি, বন্দিদের শুধু আটক করেই রাখা হয়নি, তাঁদের মানসিকভাবে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে।
তাঁকে মারধর করা হয়েছে, এমনকি এমন অবস্থায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে যে দাঁড়িয়ে থাকাও কঠিন হয়ে পড়েছিল। তাঁর অভিযোগ, স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য তাঁদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হতো এবং তাঁরা যে অপরাধ করেননি, সেই অপরাধের কথাও ক্যামেরার সামনে বলতে বাধ্য করা হতো।
সামিয়ার মতে, এই নির্যাতনের উদ্দেশ্য ছিল শুধু প্রতিবাদী কণ্ঠ থামিয়ে দেওয়া নয়; অন্যদের জন্যও ভয় সৃষ্টি করা। বার্তাটি ছিল স্পষ্ট—তালেবানের বিরুদ্ধে কথা বললে কেউ নিরাপদ থাকবে না।
মুক্তির পরও নিরাপত্তা ছিল না
জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর সামিয়া বুঝতে পারেন, আফগানিস্তানে তাঁর পক্ষে আর স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব নয়। নজরদারি ও হুমকি তাঁকে প্রতিনিয়ত ঘিরে রাখছিল।
বাড়ির দরজায় প্রতিটি কড়া নাড়ার শব্দই তাঁর কাছে নতুন আতঙ্ক হয়ে উঠেছিল। আবার গ্রেপ্তার হলে তিনি বেঁচে ফিরতে পারবেন কি না, সেই আশঙ্কাও তাঁকে তাড়া করছিল।
শেষ পর্যন্ত ছোট ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিবেশী একটি দেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন তিনি। পেছনে পড়ে থাকে তাঁর বাড়ি, কাজ এবং বহুদিনের স্বপ্ন।
নির্বাসনেও অনিশ্চয়তা
দেশ ছাড়লেও সামিয়ার দুর্ভোগ শেষ হয়নি। নির্বাসিত জীবনে বৈধ কাগজপত্রের সংকট, গ্রেপ্তার ও ফেরত পাঠানোর ভয় এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তাঁকে প্রতিদিন তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।
তাঁর আশঙ্কা, যেকোনো সময় তাঁকে আবার আফগানিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়া হতে পারে। আর সেখানে ফিরে গেলে আগের নির্যাতনের চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সামিয়ার মতো আরও অসংখ্য আফগান নারী ও তাঁদের পরিবার বর্তমানে একই ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছেন। তাঁদের কেউ দেশ ছাড়তে পেরেছেন, কেউ আবার নিজ দেশেই অধিকার হারিয়ে এক ধরনের বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন।
বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান
সামিয়া এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তাঁদের দুর্দশার কথা তুলে ধরছেন। তাঁর আহ্বান, জাতিসংঘ ও মানবিক সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যেন আফগান নারীদের অভিজ্ঞতা তদন্ত করে এবং তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়।
তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে তালেবানকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে সেই সব আফগান নারীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা, যাঁরা এই শাসনের অধীনে নির্যাতন ও অধিকারহরণের শিকার হয়েছেন।
তালেবান শাসনে আফগান নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও জনজীবনে অংশগ্রহণের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে। সামিয়ার ভাষায়, তাঁদের নিজেদের দেশেই বন্দির মতো করে রাখা হয়েছে।
তবু নির্বাসনেও তিনি নীরব হতে রাজি নন। বিশ্ববাসীকে আফগান নারীদের বাস্তব পরিস্থিতি জানানো এবং তাঁদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি তুলে যাওয়াকেই তিনি নিজের দায়িত্ব হিসেবে দেখছেন।
স্বাধীনতার আগুন নেভেনি
নির্যাতন, কারাবাস ও নির্বাসন—কোনোটিই সামিয়ার লড়াই থামাতে পারেনি। ন্যায়বিচার একদিন অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত হবে—এই বিশ্বাসেই তিনি এগিয়ে চলেছেন।
তাঁর দৃঢ় বক্তব্য, তিনি শুধু নিজের অধিকার নয়, সব আফগানের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই চালিয়ে যাবেন। তালেবান হয়তো অনেক কণ্ঠ স্তব্ধ করতে পেরেছে, কিন্তু স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে পুরোপুরি নিভিয়ে দিতে পারেনি।
সামিয়ার জীবন তাই শুধু একজন নারীর ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প নয়; এটি এমন এক দেশের নারীদের প্রতিরোধের প্রতিচ্ছবি, যেখানে ভয় ও দমননীতির মধ্যেও স্বাধীনভাবে বাঁচার স্বপ্ন এখনো বেঁচে আছে।
আফগান নারীদের ওপর তালেবানের দমননীতি, কারাবাস ও নির্বাসনের বাস্তবতা তুলে ধরে সামিয়া শেরজাদের সংগ্রাম বিশ্ববাসীর সামনে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—অধিকারহীন করে দেওয়া একটি জনগোষ্ঠীর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে কতদিন আটকে রাখা সম্ভব?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















