পাকিস্তানে বর্তমান ক্ষমতাসীন জোট সরকার দেশটির সাংবিধানিকভাবে নির্ধারিত প্রাদেশিক কাঠামো পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক এককের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এই উদ্যোগের পক্ষে সরকারের ঘনিষ্ঠ মহল থেকে এমন কিছু যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, যেন নতুন প্রদেশ তৈরি করলেই শাসনব্যবস্থা উন্নত হবে এবং দেশের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে।
প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তন এবং প্রদেশ ভাগ করার সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে গণমাধ্যমে আলোচনা শুরু হলেও এখনো সংসদে এ বিষয়ে কোনো বিস্তারিত আলোচনা হয়নি। বিষয়টি অবশ্য খুব একটা বিস্ময়কর নয়। কারণ বর্তমান সংসদে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও মতবিনিময়ের চর্চা খুব একটা দেখা যায় না। অতীতেও সাংবিধানিক সংশোধন দ্রুততার সঙ্গে, কখনো গভীর রাতে, যথেষ্ট আলোচনা ছাড়াই পাস করা হয়েছে। এরই মধ্যে নতুন একটি সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে ‘প্রশাসনিক পরিবর্তন’ আনার প্রস্তুতি চলছে—এমন গুঞ্জনও জোরালো হচ্ছে।
পাকিস্তানের ইতিহাসের সতর্কবার্তা
প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের এই পরিকল্পনায় পাকিস্তানের ইতিহাস থেকে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলো যেন উপেক্ষিত হচ্ছে। দেশটি গত কয়েক দশকে সংসদীয়, রাষ্ট্রপতি, আধা-রাষ্ট্রপতি, আধা-সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে শুরু করে সরাসরি সামরিক শাসন এবং সর্বশেষ বেসামরিক ও সামরিক শক্তির ক্ষমতা ভাগাভাগির একটি মিশ্র ব্যবস্থাও পরীক্ষা করেছে।
অর্থাৎ পাকিস্তান প্রায় সব ধরনের শাসনব্যবস্থাই দেখেছে। কিন্তু প্রতিবার ব্যবস্থার পরিবর্তন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাই বাড়িয়েছে। একমাত্র সংসদীয় গণতন্ত্রই তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বেশি বৈধতা ও জনসমর্থন পেয়েছে। যদিও নির্বাহী বিভাগের ওপর সংসদের প্রকৃত কর্তৃত্ব কখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
শাসনব্যবস্থার এসব পরীক্ষার সঙ্গে প্রদেশগুলোর মর্যাদা ও অধিকারও গভীরভাবে যুক্ত। পাকিস্তানের প্রদেশগুলোর সীমানা অনেকাংশে জনগোষ্ঠীর জাতিগত ও ভাষাগত পরিচয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় ফেডারেল ব্যবস্থা কার্যকর করা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শুধু সংবিধানে ফেডারেল কাঠামোর কথা লিখে রাখলেই হয়নি; চার প্রদেশের মানুষ যাতে রাষ্ট্রের অংশীদার এবং ন্যায্যভাবে প্রতিনিধিত্বশীল মনে করেন, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি ছিল।
‘ওয়ান ইউনিট’ থেকে পাওয়া ভয়াবহ শিক্ষা
পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রাদেশিক কাঠামো পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ১৯৫০-এর দশকে ‘ওয়ান ইউনিট’ ব্যবস্থা চালু করা। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের সব প্রদেশকে একত্র করে একটি প্রশাসনিক এককে পরিণত করা হয়েছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যার সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের ‘সমতা’ তৈরি করা এবং পূর্ব অংশের সংখ্যাগত প্রাধান্যকে রাজনৈতিকভাবে খর্ব করা।

এই প্রকল্পের পক্ষে বলা হয়েছিল, এতে প্রাদেশিক সংকীর্ণতা দূর হবে, প্রশাসনিক ব্যয় কমবে এবং পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোর উন্নয়ন হবে। কিন্তু বাস্তবে এর ফল হয়েছিল সম্পূর্ণ বিপরীত।
ওয়ান ইউনিট ব্যবস্থা পশ্চিম পাকিস্তানের ছোট প্রদেশগুলোতে জাতীয়তাবাদী ও আঞ্চলিক চেতনা আরও তীব্র করে তোলে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের ভেতরের বিচ্ছিন্নতামুখী শক্তিও শক্তিশালী হয়। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মধ্যেও বৈষম্যের অনুভূতি আরও গভীর হয়। অন্যান্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণের সঙ্গে মিলিত হয়ে এই অসন্তোষ শেষ পর্যন্ত বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে শক্তিশালী করে এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখে।
প্রাদেশিক অধিকার সংকট আরও গভীর হয়েছে
১৯৭৩ সালের সংবিধান কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল। বহুজাতিক রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের প্রদেশগুলোকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার পাশাপাশি কেন্দ্র ও প্রদেশের পারস্পরিক দায়িত্বও নির্ধারণ করা হয়েছিল।
কিন্তু বাস্তবে সেই সাংবিধানিক নীতির যথাযথ প্রয়োগ হয়নি। স্বাধীনতার পর থেকেই কেন্দ্রীয় সরকার বিভিন্ন সময়ে প্রাদেশিক সরকারকে সরিয়ে দেওয়ার যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করেছিল, তা পরবর্তী সময়েও অব্যাহত থাকে। ১৯৭০-এর দশকে প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর সময় বিরোধী দল পরিচালিত প্রাদেশিক সরকারগুলোও বরখাস্ত করা হয়। এসব পদক্ষেপ জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করে।
এর ফলে প্রদেশগুলোর মধ্যে বৈষম্য বাড়ে এবং ছোট প্রদেশগুলোর মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি গভীর হয়। বেলুচিস্তানে ১৯৭০-এর দশকে যে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল, তার পেছনে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ কাজ করেছে। ২০০০-এর দশকে সেই সংঘাত আরও তীব্র হয়। আজও বেলুচিস্তানের রাজনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী অসন্তোষ পুরোপুরি শেষ হয়নি।
অন্যদিকে কর্তৃত্ববাদী শাসন পশতুন জাতীয়তাবাদকেও একসময় শক্তিশালী করেছিল। পরে দেশের ক্ষমতাকাঠামো ও আমলাতন্ত্রে খাইবার পাখতুনখোয়ার প্রতিনিধিত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রবণতা কিছুটা দুর্বল হয়।
নতুন প্রদেশ কি সত্যিই সমাধান?
পাকিস্তানের ফেডারেল ব্যবস্থা ও প্রাদেশিক টানাপোড়েনের ইতিহাস স্পষ্টভাবে দেখায়, জাতিগতভাবে স্বতন্ত্র চারটি প্রদেশের কাঠামো পরিবর্তন করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অতীতে প্রাদেশিক কাঠামো পরিবর্তন কিংবা সংবিধাননির্ধারিত প্রাদেশিক অধিকার দুর্বল করার উদ্যোগ কখনো সমস্যার সমাধান করেনি। বরং পুরোনো বিভাজন আরও গভীর করেছে এবং নতুন সংকট তৈরি করেছে।
এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্যও প্রকৃতপক্ষে উন্নত প্রশাসন ছিল না; ছিল ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক আধিপত্য আরও শক্তিশালী করার স্বার্থই সেখানে বড় হয়ে উঠেছিল। জাতীয় ঐক্য ও সংহতির বিষয়টি ছিল গৌণ।
বর্তমান ক্ষমতাসীন জোট সরকারের নতুন প্রদেশ তৈরির উদ্যোগের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন উঠছে। এর লক্ষ্য কি সত্যিই প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানো, নাকি ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ আরও কেন্দ্রীভূত করা?
তবে কিছু অঞ্চলের মানুষের নিজস্ব প্রদেশের দাবির বাস্তব ভিত্তিও রয়েছে। যেমন দক্ষিণ পাঞ্জাবের সেরাইকি ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে পৃথক প্রদেশের দাবি জানিয়ে আসছে। কয়েকটি রাজনৈতিক দলও এই দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। কিন্তু নতুন একটি প্রদেশ তৈরি করতে গিয়ে সংবিধানের সূক্ষ্ম ভারসাম্য নষ্ট হবে কি না, অন্য অঞ্চলেও একই ধরনের দাবি জোরালো হবে কি না—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
অষ্টাদশ সংশোধনের শিক্ষা
২০১০ সালে সব রাজনৈতিক দলের সমর্থনে পাস হওয়া অষ্টাদশ সাংবিধানিক সংশোধন প্রাদেশিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। কেন্দ্র থেকে এক ডজনেরও বেশি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রদেশগুলোর হাতে হস্তান্তর করা হয়।
তবে এর ফলে প্রদেশগুলোর সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। অতিরিক্ত আর্থিক ক্ষমতা ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তারা কতটা দক্ষতার সঙ্গে পালন করতে পারবে, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
আর্থিক বিষয়টি সবচেয়ে বেশি সমালোচনার জন্ম দেয়। ২০০৯ সালের জাতীয় অর্থ কমিশনের পুরস্কারের মাধ্যমে প্রদেশগুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ হস্তান্তর করা হয়। এতে কেন্দ্রীয় সরকারের নিজস্ব আর্থিক দায়বদ্ধতা পূরণে চাপ তৈরি হয়। রাজস্ব নিয়ে কেন্দ্র ও প্রদেশের এই বিরোধের সমাধান প্রয়োজন। প্রদেশগুলোকেও নিজেদের রাজস্ব সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
কিন্তু এর সমাধান নতুন নতুন প্রদেশ তৈরি করা কিংবা অষ্টাদশ সংশোধন বাতিল বা পিছিয়ে দেওয়া নয়।
আসল সংস্কার হতে হবে স্থানীয় সরকারে
প্রাদেশিক সীমানা পুনর্নির্ধারণের যুক্তি এখনো স্পষ্ট নয়। এই অস্পষ্টতাই মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি করছে যে উদ্দেশ্য প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানো নয়, বরং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করা।
যদি পাকিস্তানে সত্যিকার অর্থে প্রশাসনিক সংস্কার করতে হয়, তাহলে নতুন প্রদেশ কেটে তৈরি করার পথ বেছে নেওয়া উচিত নয়। বরং স্থানীয় সরকারকে ক্ষমতাবান করা, তাদের আর্থিক ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হতে পারে কার্যকর পথ।
পাকিস্তানের ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—প্রশাসনিক মানচিত্র বদলালেই রাষ্ট্রের গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের সমাধান হয় না। ইতিহাসের সেই শিক্ষা উপেক্ষা করে আবারও একই পথে হাঁটলে পুরোনো বিভাজন আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।
ইতিহাস তাই শুধু অতীতের গল্প নয়; বর্তমানের জন্যও একটি সতর্কবার্তা।
পাকিস্তানের প্রাদেশিক কাঠামো পরিবর্তনের বিতর্কে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—নতুন প্রদেশ কি সত্যিই জনগণের ক্ষমতায়ন করবে, নাকি ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করবে?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















