মুম্বাইয়ে খাবারের মান ও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ এবার কঠোর হাতে দমন করতে নেমেছেন মহারাষ্ট্রের খাদ্যনিরাপত্তা কমিশনার তুকারাম মুণ্ধে। আকস্মিক অভিযান, অনিয়ম ধরা পড়লেই ব্যবস্থা এবং অভিযানের ছবি ও তথ্য প্রকাশ—সব মিলিয়ে তিনি এখন ভারতের মানুষের কাছে আলোচিত এক সরকারি কর্মকর্তা।
মহারাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মে মাস থেকে মুম্বাই ও আশপাশের এলাকায় তিন হাজারের বেশি অভিযান চালিয়েছে তাঁর দল। এসব অভিযানে বড় আন্তর্জাতিক খাবারের প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে হোটেল, ক্রিকেট ক্লাব, পুরোনো রেস্তোরাঁ, মিষ্টির দোকান ও পথের খাবারের দোকানও বাদ যায়নি।
বড় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে চারটি ডমিনোজ ও একটি পিৎজা হাটের শাখার খাবারের অনুমতিপত্র স্থগিত করা হয়েছে। একটি ম্যাকডোনাল্ডস শাখাতেও তেলাপোকার উপস্থিতি ও পচা খাবারের অভিযোগ পাওয়ার পর একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
মুণ্ধের বক্তব্য, খাদ্য ব্যবসায়ীদের নিয়ম মেনে চলতেই হবে। মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।
![]()
এমনকি আদালতের ক্যান্টিনও তাঁর নজর এড়ায়নি। একটি আদালতে বিচারক প্রশ্ন তোলেন, বেসরকারি খাবারের দোকানেই কি শুধু অভিযান চালানো হচ্ছে, আদালতের ক্যান্টিন পরীক্ষা করা হয়েছে কি না। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মুণ্ধের দল সেখানে পরিদর্শনে যায়। কিছু ক্যান্টিনের অনুমতিপত্র না থাকায় সেগুলো বন্ধও করে দেওয়া হয়।
ইঁদুর, তেলাপোকা আর মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার
মুণ্ধের অভিযানের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো খাবারের দোকান ও গুদামের ভেতরের ভয়াবহ পরিস্থিতি প্রকাশ্যে আনা। অভিযানের পর প্রকাশিত ছবিতে নোংরা দেয়াল, ঘুরে বেড়ানো তেলাপোকা ও ইঁদুর এবং মেয়াদোত্তীর্ণ খাবারের চিত্র সামনে এসেছে।
এ ধরনের ছবি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে যেমন ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তেমনি খাদ্য ব্যবসায়ীদের মধ্যেও বেড়েছে আতঙ্ক।
মুম্বাইয়ের ২৫টি পথের খাবারের দোকান ও রেস্তোরাঁ ঘুরে দেখা গেছে, অনেক ব্যবসায়ী আগেভাগেই নিজেদের নিয়মকানুন বদলাতে শুরু করেছেন। কেউ কৃত্রিম লাল রঙের পরিবর্তে প্রাকৃতিক মরিচ ব্যবহার করছেন, কেউ দিনে তিনবার ভাজার তেল বদলাচ্ছেন। আবার অনেক দোকানে কর্মীদের জন্য হাতমোজা ও মাথা ঢাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জনপ্রিয় বড়া পাওয়াতেও বদল
মুম্বাইয়ের জনপ্রিয় পথের খাবার বড়া পাও মুণ্ধের নজর থেকেও রেহাই পায়নি। সাধারণত খবরের কাগজে মুড়িয়ে এই খাবার পরিবেশনের প্রচলন ছিল। জুন মাসে খাবার মোড়ানোর কাজে খবরের কাগজ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়।
এখন অনেক দোকানে পরিচ্ছন্ন মাখন কাগজে বড়া পাও দেওয়া হচ্ছে। এতে ক্রেতাদের মধ্যেও স্বস্তি তৈরি হয়েছে। পরিচ্ছন্নভাবে খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে দেখে অনেকেই আগের তুলনায় পথের খাবার খেতে বেশি নিশ্চিন্ত বোধ করছেন।

জনসমর্থনে তারকা কর্মকর্তা
মুণ্ধের কঠোর অবস্থান তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে। ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষের জায়গায় তিনি যেন নতুন আশার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে প্রতি বছর ভারতে এক লাখের বেশি খাদ্য নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ নমুনা অনিরাপদ, নিম্নমানের অথবা যথাযথ পরিচয়সংবলিত তথ্যবিহীন হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। গত তিন বছরে প্রায় আট হাজার খাদ্য ব্যবসার অনুমতিপত্র বাতিল করা হয়েছে।
মুণ্ধে অবশ্য নিজেকে তারকা কর্মকর্তা হিসেবে দেখতে রাজি নন। তাঁর ভাষ্য, তিনি শুধু খাদ্যনিরাপত্তা কমিশনার হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করছেন।
সমালোচনাও কম নয়
তবে মুণ্ধের অভিযান নিয়ে ব্যবসায়ীদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, হঠাৎ করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আগে ব্যবসায়ীদের সংশোধনের জন্য যথেষ্ট সময় দেওয়া উচিত।
![]()
কয়েকটি প্রতিষ্ঠান উচ্চ আদালতেরও দ্বারস্থ হয়েছে। একটি মামলায় আদালত মুণ্ধের দপ্তরকে পাঁচ লাখ রুপি জরিমানাও করে। কারণ, সংশ্লিষ্ট খাবারের দোকান নিয়ম মেনে চলার উন্নতি করার পরও তার অনুমতিপত্র স্থগিত রাখা হয়েছিল।
সমালোচনার বিষয়ে মুণ্ধে বলেছেন, আদালতের পর্যবেক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কোথাও উন্নতির সুযোগ থাকলে তাঁর দপ্তরও নিজেদের পদ্ধতিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনে।
সাধারণ মানুষের আস্থাই বড় অর্জন
দিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে মুণ্ধেকে ঘিরে মানুষের উৎসাহও দেখা গেছে। অনেকে তাঁর সঙ্গে ছবি তুলতে এগিয়ে আসেন, করমর্দনের জন্য ভিড় করেন। এক ভক্ত এমনকি তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে দায়িত্ব দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি আহ্বান জানান।
তবে জনপ্রিয়তার মধ্যেও মুণ্ধে নিজের অবস্থান স্পষ্ট রেখেছেন। তাঁর কাছে এটি কোনো প্রচারাভিযান নয়; খাবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই মূল দায়িত্ব।
মুম্বাইয়ের খাদ্য ব্যবসায় এখন তাঁর অভিযানের প্রভাব স্পষ্ট। বড় প্রতিষ্ঠান হোক কিংবা রাস্তার ছোট দোকান—খাবারের পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের অবহেলার জায়গায় তৈরি হয়েছে নতুন সতর্কতা। আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে থাকা কর্মকর্তা তুকারাম মুণ্ধে এখন ভারতের অন্যতম আলোচিত সরকারি মুখ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















