অভিবাসী শিশুদের সহায়তায় কাজ করা একটি সংগঠনে অনুদান দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন মার্কিন কান্ট্রি সংগীতশিল্পী কেসি মাসগ্রেভস। নিজের জন্মদিনের ইচ্ছা হিসেবে ভক্তদের ওই সংগঠনকে অর্থ সহায়তা দেওয়ার অনুরোধ করার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে বয়কটের ডাক দিয়েছেন একদল সমালোচক।
শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে নিজের নতুন সংগীত সফরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ৩৮তম জন্মদিন উদ্যাপন করেন মাসগ্রেভস। অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে তিনি দর্শকদের কাছে অভিবাসী শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করা একটি সংগঠনকে সহায়তার আহ্বান জানান।
‘শিশুগুলোর সাহায্য দরকার’
মাসগ্রেভস বলেন, সংগঠনটি এমন শিশুদের আইনি সহায়তা ও আর্থিক সহযোগিতা দেয়, যাদের বাবা-মাকে অন্যায়ভাবে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে তারা মনে করে। বিষয়টি কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব শিশুর সাহায্য প্রয়োজন।
দর্শকদের উদ্দেশে তিনি অল্প পরিমাণ অর্থ দেওয়ারও আহ্বান জানান। তিনি বলেন, কেউ চাইলে সামান্য অর্থও দিতে পারেন, আবার কেউ না চাইলে সেটিও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।

শিকাগোর অনুষ্ঠানে দর্শকদের কাছ থেকে তার বক্তব্যের পরপরই করতালি ও উচ্ছ্বাস শোনা যায়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে তার বক্তব্য নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়।
‘চুপ করে গান গাও’—সমালোচকদের মন্তব্য
রক্ষণশীল মতাদর্শের কয়েকজন মন্তব্যকারী মাসগ্রেভসের বক্তব্যের সমালোচনা করেন। কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন, ‘অন্যায়ভাবে বহিষ্কার’ বলতে তিনি ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন।
একদল সমালোচক আবার সংগীতশিল্পীদের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে কথা না বলে শুধু গান করার আহ্বান জানান। তাদের অভিযোগ, এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে শিল্পীরা নিজেদের শ্রোতাদের একটি বড় অংশকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন।
কয়েকজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী মাসগ্রেভসের গান ও কনসার্ট বয়কটের ঘোষণাও দেন। কেউ মন্তব্য করেন, অভিবাসীদের সন্তানদের জন্য অনুদান চাওয়ার কারণে তারা আর তার সংগীত সমর্থন করবেন না।
‘নিজের অর্থেই সাহায্য করুন’—আরেক সমালোচনা
মাসগ্রেভসের সমালোচকদের আরেকটি অংশের বক্তব্য, তিনি যদি বিষয়টি নিয়ে এতটাই উদ্বিগ্ন হন, তাহলে নিজের অর্থেই ওই শিশুদের সহায়তা করা উচিত ছিল।
একজন মন্তব্যকারী দাবি করেন, মাসগ্রেভসের সম্পদের পরিমাণ বিপুল এবং তার কনসার্টের টিকিট কিনে ভক্তরা ইতিমধ্যে তাকে অর্থ দিয়েছেন। এরপর তাদের কাছেই আবার অনুদান চাওয়া উচিত হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তবে মাসগ্রেভসের অনেক ভক্ত তার অবস্থানের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। তাদের বক্তব্য, অভিবাসননীতি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও কঠিন পরিস্থিতিতে থাকা শিশুদের সহায়তা করা মানবিক ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ।
একজন সমর্থক বলেন, এসব শিশু নিজেরা কোনো ভুল করেনি। আরেকজন মন্তব্য করেন, অভিবাসনসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত আইনসঙ্গত ছিল কি না, সেটি আদালত ও নীতিনির্ধারকদের বিষয়; কিন্তু বিপদে থাকা শিশুদের পাশে দাঁড়ানো অবশ্যই সম্মানের কাজ।
অবস্থান থেকে সরেননি মাসগ্রেভস
সমালোচনার পরও নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি মাসগ্রেভস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি এমন একটি বার্তা শেয়ার করেন, যার অর্থ—শিশুদের যেন একা অভিবাসন আদালতের মুখোমুখি হতে না হয়, সেটি নিশ্চিত করাই গুরুত্বপূর্ণ।
অভিবাসী শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনটিও মাসগ্রেভসের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। সংগঠনটির মূল লক্ষ্য হলো সরকারি হেফাজতে থাকা একা বা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অভিবাসী শিশুদের নিরাপদ রাখা, স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং তাদের পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনে সহায়তা করা।
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তারা ৫৩টি দেশের প্রায় দুই হাজার শিশুকে সহায়তা করেছে এবং নতুন করে এক হাজারের বেশি মামলা গ্রহণ করেছে। ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, শিশুদের গড়ে আটক থাকার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং আটক বাবা-মায়েদের সহায়তার আবেদনও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
আগেও অভিবাসী শিশুদের পাশে ছিলেন

অভিবাসী শিশুদের জন্য মাসগ্রেভসের সমর্থন অবশ্য নতুন নয়। চলতি বছরের এপ্রিলে নিজের ব্যবহৃত পোশাকের কয়েকটি সংগ্রহ বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়, যার পুরো অর্থ ওই সংগঠনের কাজে দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।
এর আগে মে মাসে তিনি টেক্সাসে নিজের তিনটি অনুষ্ঠানের শুরুতে তিন ভাইকে সংগীত পরিবেশনের সুযোগ দেন। ওই ভাইদের পরিবারকে অভিবাসন কর্তৃপক্ষের হেফাজত থেকে মুক্তি দেওয়ার পর তারা অনুষ্ঠানে অংশ নেয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনবিরোধী অভিযান জোরদার হওয়ার মধ্যেই মাসগ্রেভসের সাম্প্রতিক মন্তব্য সামনে এসেছে। দেশটির অভিবাসন কর্তৃপক্ষের গ্রেপ্তারও সাম্প্রতিক সময়ে রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেও মাসগ্রেভসের অবস্থান স্পষ্ট—অভিবাসননীতি নিয়ে মতভেদ থাকলেও অভিভাবকহীন বা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুদের সহায়তা করা প্রয়োজন।
কেসি মাসগ্রেভসের উত্তর আমেরিকাজুড়ে সংগীত সফর শিকাগো থেকে শুরু হয়েছে। এই সফর অক্টোবর পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে।
অভিবাসী শিশুদের সহায়তায় তার আহ্বান যেমন সমালোচনার জন্ম দিয়েছে, তেমনি মানবিক অবস্থানের জন্য প্রশংসাও কুড়িয়েছে। ফলে সংগীতের মঞ্চে দেওয়া কয়েক মিনিটের বক্তব্যই এখন তাকে ঘিরে নতুন সামাজিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















