যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দেওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রায় ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধের মধ্যে ওয়াশিংটন তেহরানকে নিজেদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য করতে অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর কথা বলছে। এর জবাবে ইরান কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল চলাচল বন্ধের হুমকি
ইরানের সাবেক বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী প্রধান ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সাবেক সচিব মোহসেন রেজাই হুমকি দিয়েছেন, অর্থনৈতিক যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এক ফোঁটা তেলও রপ্তানি হতে দেওয়া হবে না।
তিনি হরমুজ প্রণালি এবং পারস্য উপসাগরের অন্য পথ দিয়ে তেল রপ্তানি বন্ধ করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হামলা ও হুমকির কারণে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। অথচ সংঘাতের আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কিছু তেলবাহী জাহাজ হরমুজ দিয়ে চলাচল করলেও এর পরিমাণ খুবই কম। এর মধ্যেই ২৩ আগস্ট ইরান ৪৫টি তেলবাহী জাহাজকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। তেহরানের দাবি, এসব জাহাজ হরমুজে চলাচলের জন্য ইরানের নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলেনি।

তেলবাহী জাহাজে হামলার ঝুঁকি
গত ছয় মাসে তেলবাহী জাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র, চালকবিহীন বিমান ও দ্রুতগতির নৌযানের হামলা এবং হামলার হুমকিতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম একাধিকবার বেড়েছে।
একই সময়ে ইরানের মিত্র ইয়েমেনভিত্তিক হুথিরাও লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বাধা তৈরি করেছে। সৌদি আরবের এশিয়াগামী অপরিশোধিত তেল পরিবহনকারী জাহাজগুলোর ওপর হামলা এবং অবরোধের হুমকির কারণে বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
আগে কিছু জাহাজ হামলার ঝুঁকি উপেক্ষা করে ওই পথ ব্যবহার করলেও পরিস্থিতি এখন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, চীনের কয়েকটি নৌপরিবহন প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বাব আল-মান্দাব এড়িয়ে বিকল্প পথ ব্যবহার করছে।
সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগরীয় তেলবন্দর ইয়ানবুর কাছে সোমবার একটি জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা এবং আগস্টের শুরুতে সুয়েজ খালের কাছে চালকবিহীন বিমানের হামলার মতো আরও ঘটনা ঘটলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হতে পারে।
উপসাগরীয় দেশগুলোও কি হামলার ঝুঁকিতে?
ইরান হুমকি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে তার অর্থনীতি চাপে ফেলার প্রচেষ্টায় কোনো প্রতিবেশী দেশ সহযোগিতা করলে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর প্রতিশোধ নেওয়া হবে।
যুদ্ধের সময় ইরান ইতোমধ্যে কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ ও জর্ডানে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি। তবে জ্বালানি অবকাঠামোসহ অন্যান্য স্থাপনাও হামলার আওতায় এসেছে।
আগামীতে ইরান যদি তেল ও গ্যাস উত্তোলন কিংবা সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে আরও বড় হামলা চালায়, তাহলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়তে পারে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপও বাড়তে পারে।
এ ছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পানি বিশুদ্ধকরণ এবং লবণমুক্তকরণ স্থাপনায় হামলা হলে উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। প্রচণ্ড গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ার এই অঞ্চলে পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পশ্চিমা দেশগুলোতেও কি সরাসরি হামলা হতে পারে?
ইরানের প্রধান ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক অস্ত্রের সক্ষমতা পশ্চিমা দেশগুলোর বেশির ভাগ এলাকায় সরাসরি হামলার জন্য সীমিত। তবে ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী অতীতে বিকল্প পদ্ধতিতে পশ্চিমা স্বার্থে আঘাত করার সক্ষমতা দেখিয়েছে বলে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর দাবি।
সোমবার ব্রিটেন জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হ্যাকাররা দেশটির একটি ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্র অচল করে দিয়েছিল। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলেছেন, মিনেসোটার কয়েকটি পানি সরবরাহ স্থাপনায় চালানো সাইবার হামলার পেছনে ইরানের সংশ্লিষ্টতার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ নিয়ে ইরান কোনো মন্তব্য করেনি। পশ্চিমা নিরাপত্তা সংস্থাগুলো এর আগে ইরানের বিরুদ্ধে স্থানীয় লোকজনকে ব্যবহার করে হামলা ও হত্যাচেষ্টার পরিকল্পনা করার অভিযোগও তুলেছে। তেহরান অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
অর্থনৈতিক চাপ থেকে সংঘাতের নতুন পর্যায়?
ইরানের হাতে অর্থনৈতিক চাপের জবাব দেওয়ার অন্যতম বড় অস্ত্র হলো মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া। হরমুজ প্রণালি, লোহিত সাগর, উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামো এবং সাইবার হামলা—সবগুলো ক্ষেত্রেই তেহরানের সম্ভাব্য পদক্ষেপ বিশ্ববাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্র যদি নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করে এবং ইরান তার হুমকি বাস্তবায়ন শুরু করে, তাহলে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতিতেও নতুন অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















