পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থাকে ‘ধসে পড়া’ বলে মন্তব্য করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভি নতুন প্রদেশ ও প্রশাসনিক ইউনিট গঠনের বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যের আহ্বান জানানোর পর দেশটির প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে বিতর্ক আবারও সামনে এসেছে। ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রিসেট’-এর কথাও আলোচনায় এসেছে। মনে হচ্ছে, কাঠামোগত পরিবর্তনের ধারণাটি নতুন করে রাজনৈতিক আকর্ষণ তৈরি করছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, শাসনব্যবস্থা যদি সত্যিই অকার্যকর হয়ে পড়ে থাকে, তাহলে শুধু দেশের মানচিত্রে নতুন সীমানা টানলেই কি তার সমাধান হবে?
আমার দৃষ্টিতে পাকিস্তানের সংকট প্রদেশের আয়তন বা সংখ্যা নিয়ে নয়। মূল সমস্যা হলো ক্ষমতার অবস্থান এবং সেই ক্ষমতার ওপর নাগরিকের নিয়ন্ত্রণের অভাব। সিদ্ধান্ত গ্রহণ এমন সব কেন্দ্রের হাতে কেন্দ্রীভূত, যেগুলো সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে। ফলে প্রকৃত সংস্কার হওয়া উচিত ক্ষমতাকে আরও নিচের স্তরে নিয়ে যাওয়া—যেখানে নাগরিক জানবেন কে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং ব্যর্থ হলে কাকে ভোটের মাধ্যমে জবাবদিহির মুখোমুখি করা যায়।
বিকেন্দ্রীকরণ প্রাদেশিক রাজধানীতে গিয়ে থেমে গেছে
পাকিস্তানে ১৮তম সংশোধনী এবং সপ্তম এনএফসি অ্যাওয়ার্ড ফেডারেল কাঠামো ও আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। এর মাধ্যমে কেন্দ্র থেকে প্রদেশগুলোর হাতে দায়িত্ব ও সম্পদের উল্লেখযোগ্য অংশ স্থানান্তরিত হয়। কিন্তু সেই বিকেন্দ্রীকরণ প্রাদেশিক রাজধানীগুলোর বাইরে যথেষ্ট দূর এগোয়নি।
ইসলামাবাদ থেকে ক্ষমতা লাহোর, করাচি, পেশোয়ার ও কোয়েটায় গেছে ঠিকই, কিন্তু সেখান থেকে তা শহর, জেলা, তেহসিল কিংবা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর হাতে পর্যাপ্তভাবে পৌঁছায়নি। ফলে পাকিস্তানের একটি অদ্ভুত প্রশাসনিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে—ক্ষমতা কেন্দ্র থেকে প্রদেশে গেছে, কিন্তু প্রদেশ থেকে স্থানীয় পর্যায়ে যায়নি।
এর ফল সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় নাগরিক জীবনে। মানুষ রাষ্ট্রকে সংবিধানের ধারা বা রাজস্ব বণ্টনের সূত্র দিয়ে চেনে না। তারা রাষ্ট্রকে চেনে রাস্তা, স্কুল, হাসপাতাল, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় পরিবহন ও পুলিশের মাধ্যমে। এসবের বড় অংশই স্থানীয় পর্যায়ের বিষয়। অথচ এসব সেবার দায়িত্ব এমনভাবে ভাগ করা যে ব্যর্থতার দায় স্পষ্ট থাকে না।
আইনপ্রণেতাদের কাছ থেকে স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পের প্রত্যাশা করা হয়, প্রাদেশিক মন্ত্রীরা স্থানীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেন, আমলারা সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করেন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অর্থের জন্য প্রাদেশিক সরকারের ওপর নির্ভর করতে হয়। এটি গণতান্ত্রিক জবাবদিহির সুস্থ কাঠামো নয়; বরং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।
প্রশাসনিক বিভাগগুলোকে প্রকৃত সরকারে পরিণত করা যেতে পারে
নতুন প্রদেশ তৈরির পরিবর্তে বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে শক্তিশালী স্থানীয় সরকারব্যবস্থা গড়ে তোলা বেশি কার্যকর হতে পারে। প্রশাসনিক বিভাগগুলোকে কেবল আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর অংশ না রেখে নির্বাচিত সরকারের কার্যকর ইউনিটে পরিণত করা দরকার।
প্রতিটি এলাকায় একজন নির্বাচিত মেয়র বা সমপর্যায়ের নির্বাহী স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব নিতে পারেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুলিশিং, পরিচ্ছন্নতা, স্থানীয় পরিবহন ও অবকাঠামোর মতো বিষয়গুলোর দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকারকে নিয়মিত অর্থ বরাদ্দের নিশ্চয়তা এবং নিজস্ব রাজস্বের উৎস দিতে হবে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দায়িত্ব ও সম্পদের সমন্বয়। কোনো স্থানীয় সরকারকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দিয়ে যদি সেই কাজের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ, জনবল ও প্রশাসনিক ক্ষমতা না দেওয়া হয়, তাহলে দায়িত্বটি কাগজেই থেকে যাবে। ক্ষমতা ছাড়া দায়িত্ব এবং জবাবদিহি ছাড়া ক্ষমতা—দুটিই অকার্যকর।
এমএনএ ও এমপিএদের ভূমিকা পুনর্নির্ধারণ জরুরি
বর্তমান ব্যবস্থা পাকিস্তানের রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের ওপর অস্বাভাবিক ধরনের চাপ তৈরি করেছে। একজন এমএনএ বা এমপিএকে একই সঙ্গে আইনপ্রণেতা, উন্নয়নকর্মী এবং স্থানীয় রাজনৈতিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে হয়। ফলে একজন জনপ্রতিনিধির সাফল্য অনেক সময় সংসদে তার আইন প্রণয়নের ভূমিকার চেয়ে একটি রাস্তা, ড্রেন বা পানি প্রকল্প এনে দেওয়ার ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে।
এতে রাজনীতির প্রকৃত অগ্রাধিকারও বদলে যায়। নীতিনির্ধারণ ও আইন প্রণয়নের পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা হয়ে ওঠে উন্নয়ন তহবিল ও প্রশাসনিক প্রভাব নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতা। নাগরিকরাও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে নিরপেক্ষ সেবা পাওয়ার পরিবর্তে ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে সুবিধা পাওয়ার পথ খুঁজতে বাধ্য হন।
শক্তিশালী স্থানীয় সরকার থাকলে এই রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলানো সম্ভব। সংসদ সদস্যরা আইন প্রণয়ন ও সরকারের জবাবদিহিতে মনোযোগ দিতে পারবেন। অন্যদিকে স্থানীয় নির্বাচিত নির্বাহীরা নিজেদের এলাকার সেবা ও উন্নয়ন পরিচালনার জন্য সরাসরি জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন।
নতুন প্রদেশ নতুন সমস্যাও তৈরি করতে পারে
নতুন প্রদেশের পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি সাধারণত প্রশাসনিক সুবিধা ও মানুষের কাছাকাছি সরকার তৈরির প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে নতুন প্রদেশ গঠন মানে নতুন বিধানসভা, সচিবালয়, মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও উচ্চপদস্থ আমলাতান্ত্রিক কাঠামো তৈরি করা। এর ফলে রাজনৈতিক অভিজাতদের জন্য নতুন পদ এবং পৃষ্ঠপোষকতা বণ্টনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
রাজনৈতিক অর্থনীতি যদি একই থাকে, তাহলে পুরোনো ক্ষমতার কাঠামো কেবল ছোট ভৌগোলিক পরিসরে পুনরায় গড়ে উঠবে। নতুন রাজধানী তৈরি হতে পারে, নতুন রাজনৈতিক শ্রেণি তৈরি হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের সক্ষমতা বা নাগরিকের জবাবদিহি নিশ্চিত নাও হতে পারে।
তাই পাকিস্তানের সংকটকে ভূগোলের সমস্যা হিসেবে দেখা উচিত নয়। আসল প্রশ্ন হলো—কে অর্থ নিয়ন্ত্রণ করে, কে সিদ্ধান্ত নেয় এবং ব্যর্থ হলে জনগণ কাকে সরাতে পারে।
১৮তম সংশোধনীর মূলনীতি ফিরিয়ে নেওয়া সমাধান নয়
প্রাদেশিক সরকারের ব্যর্থতা বা আর্থিক সমস্যাকে সামনে রেখে ১৮তম সংশোধনীর বিকেন্দ্রীকরণের নীতিকে উল্টে দেওয়ার যুক্তিও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রদেশগুলোর হাতে অধিক দায়িত্ব ও সম্পদ দেওয়ার মূল ধারণাটি ভুল ছিল না। সমস্যা হলো, সেই বিকেন্দ্রীকরণ স্থানীয় পর্যায়ে যথেষ্ট শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করতে পারেনি।
কেন্দ্র থেকে প্রদেশে দায়িত্ব স্থানান্তরের পর ফেডারেল সরকার তার নিজস্ব ব্যয়ও সেই অনুপাতে কমাতে পারেনি। ফলে পরবর্তী আর্থিক সমস্যার দায় কেবল প্রদেশগুলোর বেশি রাজস্ব পাওয়ার ওপর চাপানো বাস্তবতার পূর্ণ চিত্র দেয় না।
সঠিক শিক্ষা হওয়া উচিত বিকেন্দ্রীকরণকে পেছনে না নেওয়া, বরং তা সম্পূর্ণ করা। স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহি, নিজস্ব রাজস্ব সংগ্রহ এবং কার্যকর সেবা প্রদানের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
রাজনৈতিক সমঝোতার বাইরে বাস্তবসম্মত পথ
পাকিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নতুন প্রদেশ গঠনের বিতর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে। ফেডারেল সরকারের অংশীদার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাদেশিক স্বার্থ এক নয়। বিশেষ করে সিন্ধুতে ক্ষমতাসীন পাকিস্তান পিপলস পার্টির জন্য এমন কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন সহজে গ্রহণযোগ্য হওয়ার কথা নয়, যা তাদের প্রাদেশিক রাজনৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করতে পারে।
অন্যদিকে ফেডারেশন ও প্রদেশগুলোর মধ্যকার সাংবিধানিক সম্পর্ক নতুন করে খুলে বসারও বড় রাজনৈতিক মূল্য রয়েছে। এই কারণে স্থানীয় সরকার সংস্কার তুলনামূলকভাবে বেশি বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে। এতে ফেডারেল ও প্রাদেশিক কাঠামো পুরোপুরি পাল্টে না দিয়েও ক্ষমতার প্রকৃত বণ্টনে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
সরকারের দায়িত্ব হওয়া উচিত সবচেয়ে নিচের কার্যকর স্তরে
পাকিস্তান বিদ্যমান চার প্রদেশ বজায় রেখেই একটি শক্তিশালী তৃতীয় স্তরের সরকার গড়ে তুলতে পারে। বিভাগ, জেলা, তেহসিল, শহর ও স্থানীয় প্রশাসনের সক্ষমতা অনুযায়ী দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া সম্ভব।
এখানে একটি মৌলিক নীতি অনুসরণ করা দরকার: যে কাজ যে স্তরে সবচেয়ে কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা যায়, সেই কাজের দায়িত্ব সেই স্তরেই থাকা উচিত।
জাতীয় পর্যায়ের বিষয় ফেডারেল সরকার দেখবে। প্রাদেশিক সমন্বয় প্রয়োজন এমন বিষয় প্রাদেশিক সরকারের হাতে থাকবে। আর নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করা সেবাগুলো স্থানীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত। প্রতিটি স্তরের হাতে তার দায়িত্ব পালনের মতো পর্যাপ্ত আর্থিক ক্ষমতাও থাকতে হবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি সীমানার নয়
পাকিস্তানের মূল সংকট ক্ষমতা ও সম্পদের কেন্দ্রীভবন। নতুন প্রদেশ তৈরি করলে সেই কেন্দ্রীভবন দূর হবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং একই রাজনৈতিক কাঠামো নতুন প্রদেশগুলোর ভেতরেও পুনরায় গড়ে উঠতে পারে।
দশকের পর দশক পাকিস্তান প্রশাসনিক সীমানা বদলেছে, সাংবিধানিক কাঠামো পুনর্গঠন করেছে এবং বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে। কিন্তু সাধারণ নাগরিকের কাছে এমন একটি সরকার পৌঁছে দেওয়ার কাজ এখনো অসম্পূর্ণ, যাকে সহজে চিহ্নিত করা যায় এবং যার ব্যর্থতার জন্য ভোটের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব।
যদি পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থা সত্যিই সংকটে পড়ে থাকে, তাহলে একই রাজনৈতিক শ্রেণির হাতে আরও প্রদেশ তুলে দেওয়া সমাধান নয়। পাকিস্তানের প্রয়োজন আরও বেশি সরকার নয়; প্রয়োজন এমন সরকার, যা মানুষের কাছাকাছি থাকবে, তাদের কাছে সরাসরি দায়বদ্ধ থাকবে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করলে জনগণ তাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারবে।
প্রকৃত সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দু তাই নতুন সীমানা নয়, ক্ষমতার পুনর্বণ্টন। রাষ্ট্রের ক্ষমতা যতটা সম্ভব মানুষের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া এবং সেই ক্ষমতাকে জনগণের কাছে জবাবদিহির আওতায় আনা—পাকিস্তানের জন্য এটাই হতে পারে টেকসই বিকেন্দ্রীকরণের পথ।
মুহাম্মদ জুবায়ের 


















