ইউক্রেনের ধারাবাহিক হামলায় রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটিতে নতুন করে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। রাশিয়ার অন্তত ৩০টি অঞ্চল এই সংকটে আক্রান্ত বলে জানা গেছে। আগের সংকটের তুলনায় এবারের পরিস্থিতির বিশেষত্ব হলো, মস্কো ও এর আশপাশের এলাকাতেও জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা দেখা দিয়েছে।
রাজধানীতে জ্বালানি বিক্রিতে বিধিনিষেধ
রাশিয়ার বড় জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো রাজধানীতে জ্বালানি বিক্রির ওপর ইতোমধ্যে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে পেট্রোল পাম্পে অপেক্ষা করতে হচ্ছে মানুষকে। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলীয় ক্রাসনোদার এলাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
এই সংকট শুধু ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকদের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে না, এর প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতেও। ট্যাক্সি চালক, পণ্য সরবরাহকারী, নির্মাণ খাতসহ জ্বালানিনির্ভর নানা ব্যবসা ইতোমধ্যে ক্ষতির মুখে পড়ছে। জ্বালানি সংকটের কারণে পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থায়ও তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে বলছেন, চলতি গ্রীষ্মের পর্যটন মৌসুমও সংকটে পড়েছে। কৃষ্ণসাগর উপকূলের সোচি শহরে পর্যটক ও যানবাহনের চাপ কমে গেলেও সেখানে প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
নিম্নমানের জ্বালানিতেও বাড়ছে ভোগান্তি
সংকট শুধু জ্বালানি পাওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই। রাশিয়ায় সরবরাহ করা জ্বালানির মান নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বিভিন্ন গাড়িতে নিম্নমানের বা অপরিশোধিত উপাদান মিশ্রিত জ্বালানি ব্যবহারের কারণে ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
অনেক গাড়ি মাঝপথে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং মেরামতের জন্য কারখানায় নিয়ে যেতে হচ্ছে। কিন্তু মেরামতের কেন্দ্রগুলোতেও দীর্ঘ অপেক্ষার তালিকা তৈরি হয়েছে। যন্ত্রাংশের সংকট থাকায় গাড়ি মেরামত করতে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব সমস্যা রাশিয়ার জ্বালানি খাতে আরও বড় ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর পর দেশটির তেল রপ্তানি ও উৎপাদন উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
২০১৯ সালে রাশিয়ায় প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদিত হলেও বর্তমানে উৎপাদন ৯০ লাখ ব্যারেলের নিচে নেমে এসেছে বলে অর্থনীতিবিদ নিকোলাই করঝেনেভস্কির দাবি। পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত থাকলে উৎপাদন আরও কমে ৮০ লাখ ব্যারেলে নেমে যেতে পারে। এর ফলে দেশটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিদেশ থেকে জ্বালানি আনার পরিকল্পনা কতটা বাস্তবসম্মত
জ্বালানি ঘাটতি মোকাবিলায় ভারত, চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি আমদানির কথা ভাবছে রাশিয়া। তবে এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
রাশিয়ার বর্তমান আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ টন জ্বালানি আমদানি করে দেশের চাহিদা পূরণ করা কঠিন বলে মনে করছেন দেশটির কয়েকজন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায় বিশ্লেষক।
অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত তেল শোধনাগারগুলো দ্রুত সচল করাও সহজ নয়। আরও বিমান হামলার আশঙ্কায় এগুলো আবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতেও রয়েছে।
সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় রাশিয়ায় ইতোমধ্যে ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি ও জরুরি সেবার যানবাহনকে সাধারণ মানুষের আগে জ্বালানি নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসা, উদ্ধারকাজ, পুলিশ ও দমকল বাহিনীর যানবাহনের পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনী ও সরকারি কর্মকর্তারাও অগ্রাধিকার পাচ্ছেন।
কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করা সাধারণ মানুষের সামনে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত যানবাহনগুলোকে আগে জ্বালানি দেওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদ ইগর লিপসিত এই পরিস্থিতির সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের আগের সময়ের তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, তখন সমাজের একটি বিশেষ শ্রেণির জন্য আলাদা সরবরাহব্যবস্থা ছিল। সাধারণ মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষার বিপরীতে সুবিধাভোগী শ্রেণি সহজেই প্রয়োজনীয় পণ্য পেত। বর্তমান জ্বালানি সংকটেও একই ধরনের বিভাজন তৈরি হলে জনমনে অসন্তোষ আরও তীব্র হতে পারে।
যুদ্ধের ওপর কতটা প্রভাব পড়তে পারে
অর্থনীতিবিদ ভ্যাচেস্লাভ শিরিয়ায়েভের মতে, ইউক্রেন যদি রাশিয়ার সামরিক ও বেসামরিক—উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলার মাত্রা আরও বাড়াতে পারে, তাহলে দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় তৈরি হতে পারে।
তার মতে, জ্বালানি সংকট রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়বে।
বিশেষ করে ডিজেলের ঘাটতি ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে। রাশিয়ার প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ রেল নেটওয়ার্ক, শত শত কারখানা ও ব্যবসা এবং বিপুলসংখ্যক পণ্যবাহী ট্রাক ডিজেলনির্ভর। জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হলে খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য দোকানে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে। কৃষকদের জন্যও ফসল কাটার কাজ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন ওই অর্থনীতিবিদ।
তবে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে কি
রাশিয়ার জ্বালানি সংকট যে দেশটির অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনে চাপ তৈরি করছে, তা নিয়ে সন্দেহ কম। কিন্তু এই সংকট একাই ইউক্রেন যুদ্ধ দ্রুত শেষ করে দেবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প ব্যবস্থা, বিদেশ থেকে আমদানি, সরকারি নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনের সক্ষমতা—এসব বিষয়ও পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। একই সঙ্গে ইউক্রেনের হামলার মাত্রা এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে সংকট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং জ্বালানি ঘাটতি পরিবহন, শিল্প, কৃষি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় একযোগে বড় ধাক্কা দেয়, তাহলে রাশিয়ার অর্থনীতি ও যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতার ওপর এর প্রভাব ক্রমেই গভীর হতে পারে।
রাশিয়ার জ্বালানি সংকট, ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান এবং অর্থনৈতিক চাপ—এই তিনটি বিষয় আগামী দিনগুলোতে একে অপরের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে উঠতে পারে।
রাশিয়ার জ্বালানি সংকট ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ত্বরান্বিত করতে পারে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তেল শোধনাগারে হামলা, জ্বালানি ঘাটতি ও অর্থনৈতিক চাপ মস্কোর যুদ্ধ চালানোর সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















