০৮:০৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
দক্ষিণ চীনে ভয়াবহ বন্যা, ঘরবাড়ি ডুবে সরিয়ে নেওয়া হলো ৫৪ হাজার মানুষ সাভিনিওকে ৭৫ মিলিয়ন পাউন্ডে দলে ভেড়াল টটেনহ্যাম আফ্রিকার স্বাস্থ্য সম্মেলন: প্রতিশ্রুতি নয়, এবার চাই বাস্তব পদক্ষেপ অস্কারের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বিভাগে দক্ষিণ কোরিয়ার হয়ে লি চ্যাং-দংয়ের ‘পসিবল লাভ’ ইউক্রেনকে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির তথ্য, যুদ্ধে ব্রিটেনের সরাসরি অংশগ্রহণের অভিযোগ বাংলাদেশ কৃষকের গুদাম ভাঙার পর সারের অনিয়ম ধরা পড়ল, ডিলারশিপ বাতিলের সুপারিশ ইরান যুদ্ধে নতুন উত্তেজনা, হরমুজে জাহাজ চলাচল তলানিতে—বাড়ছে বিশ্বজুড়ে শঙ্কা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে কূটনীতির পথে ফেরার আহ্বান পাকিস্তানের বিশ্বসম্প্রদায়ে আফগানিস্তানের পুনঃএকত্রীকরণে ইন্দোনেশিয়ার জোরালো সমর্থন বেলুচিস্তানে শিক্ষাব্যবস্থা গভীর সংকটে, ঝুঁকিতে লাখো শিশুর ভবিষ্যৎ

বিশ্ব রাজনীতির নতুন সমীকরণ: অর্থনীতিই এখন ক্ষমতার প্রধান অস্ত্র

বিশ্বায়নের সেই সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, যখন বাণিজ্যকে কেবল ব্যবসা আর ভূরাজনীতিকে কেবল ক্ষমতার প্রতিযোগিতা হিসেবে আলাদা করে দেখা যেত। শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ এবং সরবরাহব্যবস্থা এখন আর নিছক অর্থনৈতিক বিষয় নয়। এগুলো পরিণত হয়েছে রাষ্ট্রের কৌশলগত অস্ত্রে। বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা যত তীব্র হচ্ছে, ততই অর্থনীতি আন্তর্জাতিক ক্ষমতার লড়াইয়ের কেন্দ্রে উঠে আসছে।

এই নতুন বাস্তবতাকে বোঝার জন্য ‘ভূ-অর্থনীতি’ বা জিওইকোনমিকস ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। সহজ ভাষায়, রাজনৈতিক ও কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের জন্য অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহার করাই ভূ-অর্থনীতির মূল কথা। সাম্প্রতিক সময়ে নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী, আইনজীবী ও গবেষকদের আলোচনায় বিষয়টি যে গুরুত্ব পেয়েছে, তার কারণও স্পষ্ট—বিশ্ব অর্থনীতি এখন আর আগের মতো একীভূত ও সংঘাতমুক্ত নয়।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফলে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ক্রমেই বিভক্ত হচ্ছে। এই প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন দেশ নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক কৌশল বেছে নিচ্ছে। কেউ বাজারকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার করছে, কেউ রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার মাধ্যমে শিল্প ও প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ বাড়াচ্ছে, আবার কেউ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজছে।

চীনের শক্তি: বাজার যখন রাজনৈতিক হাতিয়ার

চীন তার বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারকে আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারের একটি কার্যকর উপকরণে পরিণত করেছে। কোনো দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক বা কৌশলগত মতপার্থক্য তৈরি হলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত করার সক্ষমতা বেইজিংয়ের হাতে উল্লেখযোগ্য চাপের অস্ত্র হিসেবে কাজ করে।

তবে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্রে চীন একা নয়। যুক্তরাষ্ট্রও সাম্প্রতিক সময়ে শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা ও অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যবস্থাকে আরও বেশি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এই প্রবণতা আরও দৃশ্যমান হয়েছে। কানাডার ওপর বাণিজ্যিক বাধা, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে শুল্ক নিয়ে চাপ এবং ইরানবিরোধী অর্থনৈতিক পদক্ষেপের প্রভাব দেখিয়েছে, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত এখন মিত্রদের সঙ্গেও সম্পর্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

এখানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি মৌলিক দুর্বলতাও রয়েছে। দেশটির অর্থনীতি এখনো বাজারনির্ভর এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে সরকার হঠাৎ করে শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা বা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলে তার ব্যয় শুধু প্রতিপক্ষের ওপর পড়ে না; মার্কিন ভোক্তা, ব্যবসা এবং মিত্র দেশগুলোকেও তার মূল্য দিতে হতে পারে।

চীনের মডেলটি ভিন্ন। সেখানে রাষ্ট্র অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ওপর অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণ রাখে। পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা ও শিল্পনীতির লক্ষ্য শুধু প্রবৃদ্ধি নয়; প্রযুক্তি, উৎপাদন, অবকাঠামো ও কৌশলগত সক্ষমতার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় শক্তি বাড়ানোও এর উদ্দেশ্য।

চীনের নেতৃত্বের বক্তব্যেও এই উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়েছে। বিদেশি উৎপাদনব্যবস্থাকে চীনের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করার মাধ্যমে প্রয়োজনের সময় অর্থনৈতিক প্রতিরোধ বা পাল্টা চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা তৈরি করার কথা বলা হয়েছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগও অবকাঠামো ও যোগাযোগের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিকে চীনের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করেছে।

একই সঙ্গে ‘ডুয়াল সার্কুলেশন’ নীতির মাধ্যমে চীন তার বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারকে বিদেশি পুঁজি ও প্রযুক্তি আকর্ষণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে, আবার নিজের অর্থনীতিকে বহির্বিশ্বের ঝুঁকি থেকে তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করছে।

জাপানের ভিন্ন পথ

এই দুই শক্তির মাঝখানে জাপান এমন একটি মডেল গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, যার কেন্দ্রবিন্দু ‘অর্থনৈতিক নিরাপত্তা’। এটি যুক্তরাষ্ট্রের শাস্তিমূলক অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে যেমন পুরোপুরি মেলে না, তেমনি চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত মডেলেরও অনুকরণ নয়।

জাপানের ধারণা হলো, বর্তমান ভূ-অর্থনৈতিক ঝুঁকি সামাল দিতে সরকার ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর একা পুরো দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে তারা একই সঙ্গে লাভজনকতা, সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার মতো বিষয় সামলাতে পারবে না।

তাই জাপান চীনের সঙ্গে সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার পথে না গিয়ে নির্দিষ্ট খাতে ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছে। সরবরাহব্যবস্থার বৈচিত্র্য বাড়ানো, গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের বিকল্প উৎস তৈরি করা এবং বহুপক্ষীয় বাণিজ্য কাঠামো শক্তিশালী করা এই কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ট্রান্স-প্যাসিফিক অংশীদারত্বের বিস্তৃত কাঠামো, আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে জাপানের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব—এসব উদ্যোগ দেখায়, টোকিও বিচ্ছিন্নতার বদলে বহুমুখী অর্থনৈতিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দিচ্ছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভারতের সঙ্গে অবকাঠামো ও যোগাযোগ সহযোগিতা বাড়ানোও এই কৌশলের অংশ। গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের সঙ্গে অংশীদারত্ব চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা। একইভাবে সেমিকন্ডাক্টর খাতে তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানিকে কুমামোতোতে উৎপাদন স্থাপনা গড়তে উৎসাহিত করা এবং দেশীয়ভাবে পরবর্তী প্রজন্মের চিপ তৈরির জন্য র‌্যাপিডাসে বিনিয়োগ জাপানের কৌশলগত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা।

কিন্তু এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে ব্যবসার ওপর।The FE - Political economy of warfare

করপোরেট বোর্ডরুমেই এখন ভূ-অর্থনীতির লড়াই

একসময় বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সরবরাহব্যবস্থার ক্ষেত্রে মূলত খরচ কমানো, উৎপাদন দক্ষতা এবং দ্রুত পণ্য সরবরাহের দিকে নজর দিত। ‘জাস্ট-ইন-টাইম’ ব্যবস্থায় ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি অনেক সময় দ্বিতীয় সারির বিষয় ছিল।

সেই বাস্তবতা বদলে গেছে। এখন একটি কোম্পানিকে ভাবতে হচ্ছে, কোথা থেকে কাঁচামাল আসবে, কোন দেশে উৎপাদন করা নিরাপদ, কোনো প্রযুক্তি রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেলে কী হবে, কিংবা কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ হলে তার সরবরাহব্যবস্থা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

অর্থাৎ ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা ক্রমেই জড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু এই রূপান্তরের খরচ কম নয়। হঠাৎ শুল্ক, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বা পাল্টা নিষেধাজ্ঞার কারণে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত ব্যয় সব কোম্পানির পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।

এ কারণেই সরকারের ভূমিকাও বদলানো প্রয়োজন। শুধু নিয়মকানুন নির্ধারণ বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যথেষ্ট নয়। কৌশলগত খাতে কোম্পানিগুলোকে ঝুঁকি কমাতে সহায়তা, বিনিয়োগ এবং প্রয়োজনে যৌথ অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।

এখানেই জাপানের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে অনেক সময় নিষেধাজ্ঞা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেয়, সেখানে জাপান রাষ্ট্র ও করপোরেট খাতের মধ্যে সহযোগিতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। অর্থনৈতিক বিভাজনের যুগে এই পদ্ধতি হয়তো দীর্ঘমেয়াদে বেশি টেকসই হতে পারে।

মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক, চীনের সঙ্গে বাস্তবতা

জাপানের জন্য সমস্যা আরও জটিল। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে চাইছে, যেখানে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও নিরাপত্তা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। অন্যদিকে জাপান এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মতো শক্তিগুলোর সঙ্গে তাকে একই ভূগোল ভাগ করতে হয়।

তাই টোকিওর সামনে শুধু ওয়াশিংটনের অবস্থান অনুসরণ করার প্রশ্ন নেই। নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থও রক্ষা করতে হবে। জাপানের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন—দুই শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়িয়ে নিজের কৌশলগত সক্ষমতা বাড়ানো।

এর অর্থ চীনের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়। বরং এমন একটি বহুমুখী এশীয় অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করা, যেখানে কোনো একক দেশ বাণিজ্য বা বিনিয়োগকে রাজনৈতিক চাপের অস্ত্রে পরিণত করতে না পারে।

এ ক্ষেত্রে ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা আরও গভীর করা দরকার। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ইন্দো-প্যাসিফিকের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে আরও দৃঢ়ভাবে যুক্ত করা যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজস্ব শিল্পভিত্তি পুনর্গঠনের চেষ্টা করে, জাপান সেই প্রচেষ্টায় অংশীদার হতে পারে। তবে অংশীদারত্ব যেন জাপানের নিজস্ব শিল্প ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে দুর্বল না করে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

মধ্যম শক্তির সামনে নতুন পরীক্ষা

অবাধ ও প্রায় বাধাহীন বিশ্বায়নের যে ধারণা একসময় আন্তর্জাতিক অর্থনীতিকে পরিচালিত করেছিল, তা এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। তার জায়গায় তৈরি হচ্ছে প্রতিযোগী অর্থনৈতিক বলয়, প্রযুক্তিগত সুরক্ষা, কৌশলগত শিল্পনীতি এবং অধিক সুরক্ষিত সরবরাহব্যবস্থা।

এই পরিবর্তনের যুগে জাপানের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—সে কি যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের কোনো একটির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, নাকি নিজস্ব কৌশলগত পরিসর ধরে রাখবে?

মধ্যম শক্তি হিসেবে জাপানের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা এখানেই। তার লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি বহুমেরু অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলায় নেতৃত্ব দেওয়া, যেখানে দেশগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী অংশীদারিত্ব বদলাতে পারে, সরবরাহব্যবস্থার বিকল্প রাখতে পারে এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ককে রাজনৈতিক জবরদস্তির হাত থেকে যতটা সম্ভব মুক্ত রাখতে পারে।

এই কাজ সহজ হবে না। ভূ-অর্থনীতির প্রতিযোগিতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু মধ্যম শক্তিগুলোর জন্য বিকল্পও নেই। তাদের নিজেদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত ভিত্তি, জ্বালানি ও খনিজ নিরাপত্তা এবং বহুপক্ষীয় সম্পর্ককে একই কৌশলের অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

জাপানের সামনে তাই শুধু আত্মরক্ষার প্রশ্ন নয়; একটি নতুন আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য তৈরির সুযোগও রয়েছে। সেই ভারসাম্যে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হবে, চীনও বাস্তবতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ থাকবে, কিন্তু কোনো শক্তিই যেন অন্যদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা নির্ধারণ করতে না পারে—এটাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

ভূ-অর্থনীতির এই কঠিন সময়ে সাফল্যের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, স্থিতিস্থাপকতা এবং কৌশলগত ধৈর্য। জাপান যদি নিজের স্বার্থকে বৃহত্তর আঞ্চলিক সহযোগিতার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, তবে বর্তমান বিভক্ত বিশ্বব্যবস্থার মধ্যেও সে শুধু প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্র হয়ে থাকবে না; বরং নতুন অর্থনৈতিক ভারসাম্য নির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারবে।

লেখক: স্টিফেন আর. নাগি। আন্তর্জাতিক খ্রিস্টান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ম্যাকডোনাল্ড-লরিয়ার ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো এবং জাপান ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের ভিজিটিং ফেলো। তাঁর নতুন বই “জাপান অ্যাজ আ মিডল পাওয়ার স্টেট” চলতি শরতে রাউটলেজ থেকে প্রকাশিত হওয়ার কথা।

জনপ্রিয় সংবাদ

দক্ষিণ চীনে ভয়াবহ বন্যা, ঘরবাড়ি ডুবে সরিয়ে নেওয়া হলো ৫৪ হাজার মানুষ

বিশ্ব রাজনীতির নতুন সমীকরণ: অর্থনীতিই এখন ক্ষমতার প্রধান অস্ত্র

০৭:০৯:২৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬

বিশ্বায়নের সেই সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, যখন বাণিজ্যকে কেবল ব্যবসা আর ভূরাজনীতিকে কেবল ক্ষমতার প্রতিযোগিতা হিসেবে আলাদা করে দেখা যেত। শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ এবং সরবরাহব্যবস্থা এখন আর নিছক অর্থনৈতিক বিষয় নয়। এগুলো পরিণত হয়েছে রাষ্ট্রের কৌশলগত অস্ত্রে। বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা যত তীব্র হচ্ছে, ততই অর্থনীতি আন্তর্জাতিক ক্ষমতার লড়াইয়ের কেন্দ্রে উঠে আসছে।

এই নতুন বাস্তবতাকে বোঝার জন্য ‘ভূ-অর্থনীতি’ বা জিওইকোনমিকস ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। সহজ ভাষায়, রাজনৈতিক ও কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের জন্য অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহার করাই ভূ-অর্থনীতির মূল কথা। সাম্প্রতিক সময়ে নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী, আইনজীবী ও গবেষকদের আলোচনায় বিষয়টি যে গুরুত্ব পেয়েছে, তার কারণও স্পষ্ট—বিশ্ব অর্থনীতি এখন আর আগের মতো একীভূত ও সংঘাতমুক্ত নয়।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফলে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ক্রমেই বিভক্ত হচ্ছে। এই প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন দেশ নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক কৌশল বেছে নিচ্ছে। কেউ বাজারকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার করছে, কেউ রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার মাধ্যমে শিল্প ও প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ বাড়াচ্ছে, আবার কেউ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজছে।

চীনের শক্তি: বাজার যখন রাজনৈতিক হাতিয়ার

চীন তার বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারকে আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারের একটি কার্যকর উপকরণে পরিণত করেছে। কোনো দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক বা কৌশলগত মতপার্থক্য তৈরি হলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত করার সক্ষমতা বেইজিংয়ের হাতে উল্লেখযোগ্য চাপের অস্ত্র হিসেবে কাজ করে।

তবে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্রে চীন একা নয়। যুক্তরাষ্ট্রও সাম্প্রতিক সময়ে শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা ও অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যবস্থাকে আরও বেশি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এই প্রবণতা আরও দৃশ্যমান হয়েছে। কানাডার ওপর বাণিজ্যিক বাধা, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে শুল্ক নিয়ে চাপ এবং ইরানবিরোধী অর্থনৈতিক পদক্ষেপের প্রভাব দেখিয়েছে, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত এখন মিত্রদের সঙ্গেও সম্পর্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

এখানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি মৌলিক দুর্বলতাও রয়েছে। দেশটির অর্থনীতি এখনো বাজারনির্ভর এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে সরকার হঠাৎ করে শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা বা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলে তার ব্যয় শুধু প্রতিপক্ষের ওপর পড়ে না; মার্কিন ভোক্তা, ব্যবসা এবং মিত্র দেশগুলোকেও তার মূল্য দিতে হতে পারে।

চীনের মডেলটি ভিন্ন। সেখানে রাষ্ট্র অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ওপর অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণ রাখে। পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা ও শিল্পনীতির লক্ষ্য শুধু প্রবৃদ্ধি নয়; প্রযুক্তি, উৎপাদন, অবকাঠামো ও কৌশলগত সক্ষমতার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় শক্তি বাড়ানোও এর উদ্দেশ্য।

চীনের নেতৃত্বের বক্তব্যেও এই উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়েছে। বিদেশি উৎপাদনব্যবস্থাকে চীনের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করার মাধ্যমে প্রয়োজনের সময় অর্থনৈতিক প্রতিরোধ বা পাল্টা চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা তৈরি করার কথা বলা হয়েছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগও অবকাঠামো ও যোগাযোগের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিকে চীনের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করেছে।

একই সঙ্গে ‘ডুয়াল সার্কুলেশন’ নীতির মাধ্যমে চীন তার বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারকে বিদেশি পুঁজি ও প্রযুক্তি আকর্ষণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে, আবার নিজের অর্থনীতিকে বহির্বিশ্বের ঝুঁকি থেকে তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করছে।

জাপানের ভিন্ন পথ

এই দুই শক্তির মাঝখানে জাপান এমন একটি মডেল গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, যার কেন্দ্রবিন্দু ‘অর্থনৈতিক নিরাপত্তা’। এটি যুক্তরাষ্ট্রের শাস্তিমূলক অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে যেমন পুরোপুরি মেলে না, তেমনি চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত মডেলেরও অনুকরণ নয়।

জাপানের ধারণা হলো, বর্তমান ভূ-অর্থনৈতিক ঝুঁকি সামাল দিতে সরকার ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর একা পুরো দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে তারা একই সঙ্গে লাভজনকতা, সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার মতো বিষয় সামলাতে পারবে না।

তাই জাপান চীনের সঙ্গে সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার পথে না গিয়ে নির্দিষ্ট খাতে ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছে। সরবরাহব্যবস্থার বৈচিত্র্য বাড়ানো, গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের বিকল্প উৎস তৈরি করা এবং বহুপক্ষীয় বাণিজ্য কাঠামো শক্তিশালী করা এই কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ট্রান্স-প্যাসিফিক অংশীদারত্বের বিস্তৃত কাঠামো, আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে জাপানের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব—এসব উদ্যোগ দেখায়, টোকিও বিচ্ছিন্নতার বদলে বহুমুখী অর্থনৈতিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দিচ্ছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভারতের সঙ্গে অবকাঠামো ও যোগাযোগ সহযোগিতা বাড়ানোও এই কৌশলের অংশ। গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের সঙ্গে অংশীদারত্ব চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা। একইভাবে সেমিকন্ডাক্টর খাতে তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানিকে কুমামোতোতে উৎপাদন স্থাপনা গড়তে উৎসাহিত করা এবং দেশীয়ভাবে পরবর্তী প্রজন্মের চিপ তৈরির জন্য র‌্যাপিডাসে বিনিয়োগ জাপানের কৌশলগত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা।

কিন্তু এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে ব্যবসার ওপর।The FE - Political economy of warfare

করপোরেট বোর্ডরুমেই এখন ভূ-অর্থনীতির লড়াই

একসময় বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সরবরাহব্যবস্থার ক্ষেত্রে মূলত খরচ কমানো, উৎপাদন দক্ষতা এবং দ্রুত পণ্য সরবরাহের দিকে নজর দিত। ‘জাস্ট-ইন-টাইম’ ব্যবস্থায় ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি অনেক সময় দ্বিতীয় সারির বিষয় ছিল।

সেই বাস্তবতা বদলে গেছে। এখন একটি কোম্পানিকে ভাবতে হচ্ছে, কোথা থেকে কাঁচামাল আসবে, কোন দেশে উৎপাদন করা নিরাপদ, কোনো প্রযুক্তি রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেলে কী হবে, কিংবা কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ হলে তার সরবরাহব্যবস্থা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

অর্থাৎ ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা ক্রমেই জড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু এই রূপান্তরের খরচ কম নয়। হঠাৎ শুল্ক, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বা পাল্টা নিষেধাজ্ঞার কারণে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত ব্যয় সব কোম্পানির পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।

এ কারণেই সরকারের ভূমিকাও বদলানো প্রয়োজন। শুধু নিয়মকানুন নির্ধারণ বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যথেষ্ট নয়। কৌশলগত খাতে কোম্পানিগুলোকে ঝুঁকি কমাতে সহায়তা, বিনিয়োগ এবং প্রয়োজনে যৌথ অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।

এখানেই জাপানের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে অনেক সময় নিষেধাজ্ঞা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেয়, সেখানে জাপান রাষ্ট্র ও করপোরেট খাতের মধ্যে সহযোগিতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। অর্থনৈতিক বিভাজনের যুগে এই পদ্ধতি হয়তো দীর্ঘমেয়াদে বেশি টেকসই হতে পারে।

মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক, চীনের সঙ্গে বাস্তবতা

জাপানের জন্য সমস্যা আরও জটিল। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে চাইছে, যেখানে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও নিরাপত্তা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। অন্যদিকে জাপান এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মতো শক্তিগুলোর সঙ্গে তাকে একই ভূগোল ভাগ করতে হয়।

তাই টোকিওর সামনে শুধু ওয়াশিংটনের অবস্থান অনুসরণ করার প্রশ্ন নেই। নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থও রক্ষা করতে হবে। জাপানের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন—দুই শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়িয়ে নিজের কৌশলগত সক্ষমতা বাড়ানো।

এর অর্থ চীনের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়। বরং এমন একটি বহুমুখী এশীয় অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করা, যেখানে কোনো একক দেশ বাণিজ্য বা বিনিয়োগকে রাজনৈতিক চাপের অস্ত্রে পরিণত করতে না পারে।

এ ক্ষেত্রে ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা আরও গভীর করা দরকার। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ইন্দো-প্যাসিফিকের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে আরও দৃঢ়ভাবে যুক্ত করা যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজস্ব শিল্পভিত্তি পুনর্গঠনের চেষ্টা করে, জাপান সেই প্রচেষ্টায় অংশীদার হতে পারে। তবে অংশীদারত্ব যেন জাপানের নিজস্ব শিল্প ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে দুর্বল না করে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

মধ্যম শক্তির সামনে নতুন পরীক্ষা

অবাধ ও প্রায় বাধাহীন বিশ্বায়নের যে ধারণা একসময় আন্তর্জাতিক অর্থনীতিকে পরিচালিত করেছিল, তা এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। তার জায়গায় তৈরি হচ্ছে প্রতিযোগী অর্থনৈতিক বলয়, প্রযুক্তিগত সুরক্ষা, কৌশলগত শিল্পনীতি এবং অধিক সুরক্ষিত সরবরাহব্যবস্থা।

এই পরিবর্তনের যুগে জাপানের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—সে কি যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের কোনো একটির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, নাকি নিজস্ব কৌশলগত পরিসর ধরে রাখবে?

মধ্যম শক্তি হিসেবে জাপানের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা এখানেই। তার লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি বহুমেরু অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলায় নেতৃত্ব দেওয়া, যেখানে দেশগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী অংশীদারিত্ব বদলাতে পারে, সরবরাহব্যবস্থার বিকল্প রাখতে পারে এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ককে রাজনৈতিক জবরদস্তির হাত থেকে যতটা সম্ভব মুক্ত রাখতে পারে।

এই কাজ সহজ হবে না। ভূ-অর্থনীতির প্রতিযোগিতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু মধ্যম শক্তিগুলোর জন্য বিকল্পও নেই। তাদের নিজেদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত ভিত্তি, জ্বালানি ও খনিজ নিরাপত্তা এবং বহুপক্ষীয় সম্পর্ককে একই কৌশলের অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

জাপানের সামনে তাই শুধু আত্মরক্ষার প্রশ্ন নয়; একটি নতুন আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য তৈরির সুযোগও রয়েছে। সেই ভারসাম্যে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হবে, চীনও বাস্তবতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ থাকবে, কিন্তু কোনো শক্তিই যেন অন্যদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা নির্ধারণ করতে না পারে—এটাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

ভূ-অর্থনীতির এই কঠিন সময়ে সাফল্যের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, স্থিতিস্থাপকতা এবং কৌশলগত ধৈর্য। জাপান যদি নিজের স্বার্থকে বৃহত্তর আঞ্চলিক সহযোগিতার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, তবে বর্তমান বিভক্ত বিশ্বব্যবস্থার মধ্যেও সে শুধু প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্র হয়ে থাকবে না; বরং নতুন অর্থনৈতিক ভারসাম্য নির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারবে।

লেখক: স্টিফেন আর. নাগি। আন্তর্জাতিক খ্রিস্টান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ম্যাকডোনাল্ড-লরিয়ার ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো এবং জাপান ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের ভিজিটিং ফেলো। তাঁর নতুন বই “জাপান অ্যাজ আ মিডল পাওয়ার স্টেট” চলতি শরতে রাউটলেজ থেকে প্রকাশিত হওয়ার কথা।