দক্ষিণ চীনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় নারার প্রভাবে ভারী বৃষ্টিপাত থেকে সৃষ্ট বন্যা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গুয়াংসি অঞ্চলের বিভিন্ন শহরে পানির উচ্চতা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ঘরবাড়ি ও দোকানপাট পানিতে তলিয়ে গেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে প্রায় ৫৪ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
রেকর্ড উচ্চতায় নদীর পানি
চীনের গুয়াংসি অঞ্চলের ছোংজুও শহরে বন্যার পানি প্রবেশ করে বিভিন্ন সড়ক ও স্থাপনা তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও পানির উচ্চতা ভবনের ছাদ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। বিদ্যুতের খুঁটি ও তারও পানিতে ডুবে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
শহরটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নদীর পানি ২০০৮ সালের সর্বোচ্চ রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার পর ১৫ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতির অবনতির কারণে শহরের সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সরিয়ে নেওয়া বাসিন্দাদের ফিরে না যাওয়ারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, গুয়াংসি অঞ্চলে বন্যার পানি বাড়তে থাকায় মোট প্রায় ৫৪ হাজার মানুষকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
আরও কয়েক দিন ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা
ঘূর্ণিঝড় নারা কয়েক দিন ধরে দক্ষিণ চীন সাগরের উত্তর-পশ্চিম অংশের বেইবু উপসাগরের ওপর অবস্থান করে গুয়াংসি ও আশপাশের এলাকায় প্রবল বৃষ্টিপাত ঘটাচ্ছে। এর প্রভাবে হাইনান ও গুয়াংডং প্রদেশেও ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়েছে।
আবহাওয়া পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বুধবার পর্যন্ত ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ চীনের বিভিন্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। গুয়াংসি, গুয়াংডং, হাইনান ও ফুজিয়ান প্রদেশের কিছু এলাকায় অতি ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে দক্ষিণ চীনের পাশাপাশি এ অঞ্চলের আরও কয়েকটি দেশেও বৈরী আবহাওয়ার প্রভাব দেখা দিয়েছে। নতুন একটি ঘূর্ণিঝড় জাপান ও তাইওয়ানের দিকে এগিয়ে যাওয়ায় সেখানেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
জাপান ও তাইওয়ানের দিকে ঘূর্ণিঝড় সাউদেল
ঘূর্ণিঝড় সাউদেল এখন দক্ষিণ জাপান ও উত্তর তাইওয়ানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এর প্রভাবে ওই অঞ্চলে দমকা বাতাস ও ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জাপানের আবহাওয়া কর্তৃপক্ষ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ওকিনাওয়া দ্বীপপুঞ্জের কাছে ঘূর্ণিঝড়টি এগিয়ে আসায় শক্তিশালী ঝোড়ো বাতাস ও উত্তাল সমুদ্রের বিষয়ে সতর্ক করেছে।
তাইওয়ানের আবহাওয়া কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত সাউদেল তাইওয়ানের উত্তরাঞ্চলের ওপর দিয়ে বৃষ্টিপাত ঘটাতে পারে। তবে সময়ের সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়টির শক্তি কিছুটা কমে আসবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এর প্রভাব ঠিক কতটা বিস্তৃত হবে, তা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
তাইওয়ানে নিহত ১, নিখোঁজ ৪
এর মধ্যেই পৃথক একটি নিম্নচাপের প্রভাবে তাইওয়ানের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে একজন নিহত এবং চারজন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির সরকার।
তাইওয়ানের তাইনান ও কাওশিয়ং শহরে বন্যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। এই দুই শহরে চার কোটিরও বেশি মানুষ বসবাস করেন।
রোববার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত মাত্র তিন দিনে কাওশিয়ংয়ে প্রায় এক মিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। দেশটির সরকার জানিয়েছে, এই বৃষ্টিপাত ২০০৯ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় মোরাকোটের সময়ের বৃষ্টিপাতকেও ছাড়িয়ে গেছে। ওই ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ৭০০ মানুষ নিহত হন এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েকশ কোটি ডলারে পৌঁছেছিল।
ফুজিয়ানের দিকেও এগোচ্ছে সাউদেল
পূর্বাভাস অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড় সাউদেল বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার ভোরের মধ্যে চীনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় ফুজিয়ান প্রদেশের উপকূলে আঘাত হানতে পারে। ফলে দক্ষিণ চীনে চলমান বন্যা পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন করে ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
একদিকে নারা’র প্রভাবে গুয়াংসিতে ভয়াবহ বন্যা, অন্যদিকে সাউদেলের সম্ভাব্য প্রভাবে জাপান, তাইওয়ান ও চীনের উপকূলীয় অঞ্চলে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস—সব মিলিয়ে পূর্ব এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















