সিরিয়াকে সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দীর্ঘদিন ধরে দেশটির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে থাকা এই তালিকাভুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্তে সিরিয়ার বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ফেরার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
৪৭ বছর পর তালিকা থেকে বাদ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৮ জুলাই সিদ্ধান্তটি কংগ্রেসকে জানান। এরপর ৪৫ দিনের পর্যালোচনা শেষে সিদ্ধান্তটি কার্যকর হয়। ১৯৭৯ সাল থেকে সিরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রের তালিকায় ছিল।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ থেকে দূরে সরে আসার ক্ষেত্রে সিরিয়ার নেওয়া পদক্ষেপকে স্বীকৃতি দিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শিবানি সিদ্ধান্তটিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, তালিকা থেকে বাদ পড়া ছিল বিনিয়োগের পথে থাকা শেষ বড় বাধা।
বিনিয়োগ ও পুনর্গঠনে নতুন সম্ভাবনা
সিরিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর নিষেধাজ্ঞা ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রত্যাহার করা হলেও সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ও তার সহযোগী, মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী ব্যক্তি, মাদক পাচারকারী এবং উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কিছু নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে।
সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রের তালিকায় থাকার কারণে সিরিয়ার সঙ্গে ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর আর্থিক লেনদেনে অতিরিক্ত আইনি ও নিয়ন্ত্রক জটিলতা তৈরি হতো। সেই বাধা সরে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক আর্থিক সহযোগিতা সহজ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
দামেস্ক আশা করছে, এই সিদ্ধান্ত যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার পুনর্গঠনে আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিনিয়োগকারীদের আরও সক্রিয় করবে। একই সঙ্গে দেশটির বৈশ্বিক আর্থিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে যোগাযোগও বাড়বে।
নুসরাহ ফ্রন্টের ওপর থেকেও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র নুসরাহ ফ্রন্টকেও বিশেষভাবে চিহ্নিত বৈশ্বিক সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকা থেকে সরিয়েছে। এর ফলে এখন যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রের তালিকায় কেবল কিউবা, ইরান ও উত্তর কোরিয়া রয়েছে।
এই তালিকাভুক্তির কারণে বিদেশি সহায়তা, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানি, নির্দিষ্ট দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্য এবং আর্থিক লেনদেনে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ফলে সিরিয়ার তালিকাভুক্তি বাতিল দেশটির ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তর্জাতিক বাজারে ফেরার সুযোগ বাড়াতে পারে।
বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় ফেরার উদ্যোগ
সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগেই সিরিয়ার প্রতি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ বাড়তে শুরু করেছিল। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ ইয়াসর বারনিয়েহের সঙ্গে ব্যাংক অব আমেরিকার কর্মকর্তাদের আলোচনা হয়েছে।
এ ছাড়া মাস্টারকার্ড কাতার ন্যাশনাল ব্যাংক গোষ্ঠী ও সিরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে আন্তর্জাতিক কার্ডভিত্তিক লেনদেন অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা জানিয়েছে। এসব উদ্যোগ সিরিয়াকে বৈশ্বিক আর্থিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত করার আগ্রহের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ওয়াশিংটন-দামেস্ক সম্পর্কে নতুন অধ্যায়
সিরিয়া ও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে কয়েক মাসের আলোচনার পর সর্বশেষ সিদ্ধান্তটি এসেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রায় ১৪ বছর ধরে চলা সংঘাতের পর বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করতে আল-শারার নেতৃত্বাধীন বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সিরিয়ার নতুন সরকারের পদক্ষেপকে ইতিবাচকভাবে দেখছে ওয়াশিংটন। দেশটিতে বিনিয়োগ বাড়ানো, অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















