খুলনার কয়রায় পানীয় জলের অর্ধেকের বেশি উৎসে লবণাক্ততা পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে উপকূলীয় এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে হৃদ্রোগের ঝুঁকিও জাতীয় গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পরিচালিত এক গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলে উঠে এসেছে এমন তথ্য। গবেষকদের মতে, জলনিরাপত্তা, জলবায়ু অভিযোজন এবং অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
ঢাকার মহাখালীতে icddr,b-এর সাসাকাওয়া অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘পানীয় জলের লবণাক্ততা ও স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব: বাংলাদেশি প্রমাণ ও নীতিগত সুপারিশ’ শীর্ষক নীতি ও গবেষণা সেমিনারে এসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়। icddr,b এবং ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হয়।
কয়রায় পানির সংকট বেশি
গবেষণার বাংলাদেশ কর্মসূচির আওতায় খুলনার কয়রা ও সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার ১৭২টি গ্রামে ৭১টি কমিউনিটি ক্লিনিকের আওতাধীন এলাকার পানির উৎস জরিপ করা হয়। মোট ২৭ হাজার ৬৯৭টি পানির উৎস পরীক্ষা করা হলেও এর মধ্যে পানীয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল ৬ হাজার ৭০৩টি।
এসব পানীয় জলের উৎসের মধ্যে কয়রায় ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ লবণাক্ত পাওয়া গেছে। গবেষকদের ভাষ্য, উপকূলীয় মানুষের দৈনন্দিন পানির ওপর নির্ভরতা যখন লবণাক্ততার কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে, তখন বিষয়টি কেবল পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী ১৫ হাজার ৪৭১ জন প্রাপ্তবয়স্কের হৃদ্রোগের ঝুঁকিও মূল্যায়ন করা হয়। তাদের মধ্যে ২১ দশমিক ৬ শতাংশের আগামী ১০ বছরে মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার হৃদ্রোগের ঝুঁকি রয়েছে বলে অনুমান করা হয়েছে। কয়রায় এ হার ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ। জাতীয় পর্যায়ে এই ঝুঁকির আনুমানিক হার প্রায় ৯ দশমিক ০২ শতাংশ।
লবণাক্ত পানি ও উচ্চ রক্তচাপ
গবেষকদের মতে, পানিতে অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপের পাশাপাশি হৃদ্রোগ ও কিডনি রোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। গর্ভাবস্থায় নারীদের জন্যও অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। উপকূলীয় বাংলাদেশে প্রায় দুই দশকের গবেষণায় লবণাক্ত পানির সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক পাওলো ভিনেইস জানান, পানীয় জলের লবণাক্ততার জন্য স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব বিবেচনায় একটি নির্দিষ্ট সীমা এখনো স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়নি। তাই গবেষণা চলমান রাখার পাশাপাশি পানীয় জলে স্বাস্থ্যভিত্তিক লবণাক্ততার উপযুক্ত নির্দেশিকা তৈরির বিষয়টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ঘূর্ণিঝড়েও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব
অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান বাটলার জানান, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাসের কারণে পানির পুকুর ও অগভীর ভূগর্ভস্থ পানির উৎস দীর্ঘ সময়ের জন্য লবণাক্ত হয়ে থাকতে পারে। এ কারণে বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বাঁধ উঁচু করার পাশাপাশি জলোচ্ছ্বাসের পর দ্রুত পানির উৎস পরিষ্কার ও পুনরুদ্ধারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
পানি ও স্বাস্থ্যসেবায় সমন্বিত উদ্যোগ
গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে গবেষকরা কম লবণাক্ত পানির সহজলভ্যতা বাড়াতে একটি সমন্বিত কর্মসূচি তৈরি করেছেন। এতে জনসচেতনতা ও স্থানীয় অংশগ্রহণ, পানির উৎসের রক্ষণাবেক্ষণ, স্থানীয় পর্যায়ে পরিচালনা ও নজরদারি এবং ডিজিটালভাবে পানির উৎসের তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে। কর্মসূচির আওতায় থাকবে কমিউনিটি ও পারিবারিক বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুরের বালু ফিল্টার এবং নলকূপ।
একই সঙ্গে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা, রেফারেল ও ফলোআপ জোরদার করা হবে। প্রশিক্ষিত কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে অ্যালগরিদমভিত্তিক ডিজিটাল ক্লিনিক্যাল সিদ্ধান্ত সহায়তা ব্যবস্থাও যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
icddr,b-এর নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে প্রমাণ এখনো সীমিত। তাই নিরাপদ পানীয় জল, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণকে একসঙ্গে যুক্ত করে বাস্তবসম্মত সমাধান পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।
সেমিনারে পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা, শিক্ষাবিদ ও উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনায় পানির মান পর্যবেক্ষণ ও তথ্য বিনিময় বাড়ানো, পানীয় জলে সোডিয়ামের স্বাস্থ্যভিত্তিক নির্দেশিকা, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়, পানির উৎসের টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মোকাবিলার ওপর জোর দেওয়া হয়।
উপকূলের পানির নিরাপত্তাকে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধের সঙ্গে যুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গবেষকদের মতে, নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা কেবল পানি ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
উপকূলীয় বাংলাদেশে পানীয় জলের লবণাক্ততা বাড়ার সঙ্গে হৃদ্রোগ ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে গবেষণার প্রাথমিক ফল সামনে এসেছে। খুলনার কয়রায় ৫৫.৩ শতাংশ পানীয় জলের উৎস লবণাক্ত পাওয়া গেছে, যা নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসেবায় সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়েছে।
উপকূলীয় বাংলাদেশে পানীয় জলের লবণাক্ততা
কয়রায় পানীয় জলের ৫৫.৩ শতাংশ উৎস লবণাক্ত; গবেষণায় উপকূলীয় মানুষের হৃদ্রোগ ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি মোকাবিলায় নিরাপদ পানির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















