সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে কোথায় খেতে যাওয়া যায়, কোন খাবারটি ভালো কিংবা কোন রেস্তোরাঁটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে—এসব জানতে এখন আর শুধু সংবাদপত্র বা পেশাদার খাদ্যসমালোচকের ওপর নির্ভর করতে হয় না। অনেকেই শুক্রবার রাতে কোথায় খাওয়া যায় বা কোন খাবার ঘরে আনা যায়, সেই সিদ্ধান্ত নিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত খাদ্যপ্রভাবকদের পরামর্শ অনুসরণ করছেন।
তবে এই জনপ্রিয়তার সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে এসেছে—খাদ্যপ্রভাবকদের দেওয়া প্রশংসা কতটা নির্ভরযোগ্য? বিনা মূল্যে খাবার পাওয়ার বিনিময়ে কেউ কোনো রেস্তোরাঁর প্রশংসা করলে সেই বিষয়টি কি দর্শক বা অনুসারীদের জানানো উচিত? আর পেশাদার খাদ্যসমালোচকদের সঙ্গে তাঁদের পার্থক্যই বা কোথায়?
ভুয়া রেস্তোরাঁ খুলে গবেষণা
ব্রিস্টলের খাদ্যলেখক মেগ হাফটন-গিলমোর খাদ্যপ্রভাবকদের কাজের ধরন ও স্বচ্ছতা যাচাই করতে একটি অভিনব গবেষণা চালান। তিনি ব্রিস্টলে শিগগিরই চালু হবে—এমন একটি কাল্পনিক জাপানি রেস্তোরাঁর নামে একটি ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হিসাব তৈরি করেন।
এরপর তিনি ৪৮ জন খাদ্যপ্রভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে চান, তাঁরা কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রচারের জন্য কত টাকা নেন, ইতিবাচক প্রচারের নিশ্চয়তা দিতে কী ধরনের শর্ত রাখেন এবং বিনিময়ে পাওয়া খাবার বা অর্থের কথা প্রকাশ্যে জানাবেন কি না।
৩৩ জন প্রভাবক তাঁর বার্তার উত্তর দেন। তাঁদের চাওয়া পারিশ্রমিকের পরিমাণে ছিল বড় ধরনের পার্থক্য। কেউ কেউ অতিরিক্ত অর্থ না নিয়ে শুধু বিনা মূল্যে খাবার ও পানীয়ের বিনিময়ে প্রচার করতে রাজি ছিলেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন এমনও জানান, বিনা মূল্যে পাওয়া খাবারের বিনিময়ে প্রচার করলেও সেটিকে বিজ্ঞাপন হিসেবে উল্লেখ করবেন না।
গবেষণাটি আরও একটি বিষয় সামনে আনে। রেস্তোরাঁটি আদৌ বাস্তবে নেই এবং সেখানে কেউ খাবারও খাননি—তার আগেই কয়েকজন ইতিবাচক প্রচারের বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন।
বিজ্ঞাপন গোপন রাখা নিয়ে প্রশ্ন
ব্রিটেনে অর্থের বিনিময়ে করা প্রচার বা বিনা মূল্যে খাবার পাওয়ার বিনিময়ে করা প্রচারকে স্পষ্টভাবে বিজ্ঞাপন হিসেবে চিহ্নিত করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সব সময় সেই বিষয়টি পরিষ্কারভাবে জানানো হয় না।
মেগ হাফটন-গিলমোরের মতে, সমস্যাটি শুধু খাদ্যপ্রভাবকদের নয়; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বর্তমান কাঠামোও বিজ্ঞাপন ও ব্যক্তিগত মতামতের পার্থক্য অনেক সময় অস্পষ্ট করে দেয়।
তাঁর গবেষণায় আরও দেখা যায়, একই ধরনের জায়গা নিয়ে অনেক প্রভাবক একই ধরনের কথা বলছেন। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খাবারের জগতটি অনেকটা একই বৃত্তের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে বলেও তিনি মনে করেন।
প্রভাবকদের শক্তি অস্বীকার করছেন না কেউ
ব্রিস্টলের জনপ্রিয় খাদ্যপ্রভাবক অস্কার বস্টক মনে করেন, মানুষের কোথায় খেতে যাওয়ার সিদ্ধান্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এখন অনেক বেশি। তাঁর বিপুলসংখ্যক অনুসারী রয়েছে এবং তাঁর প্রকাশিত খাবারসংক্রান্ত বিষয়গুলো লাখোবার দেখা হয়েছে।
তবে তিনি নিজেকে পেশাদার খাদ্যসমালোচকের বিকল্প মনে করেন না। তাঁর মতে, খাদ্যপ্রভাবকদের কাজের একটি বড় অংশ হলো মানুষকে খাবার উপভোগ করতে উৎসাহ দেওয়া এবং নতুন জায়গার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।
তিনি বলেন, কোনো রেস্তোরাঁর প্রশংসা করার জন্য অর্থ নেওয়া এবং নতুন খাবারের তালিকা বা নতুন রেস্তোরাঁর প্রচারের জন্য পারিশ্রমিক নেওয়া এক বিষয় নয়। তাঁর নিজের ক্ষেত্রেও তিনি এমন জায়গার সঙ্গে কাজ করতে চান, যেটিকে তিনি সত্যিই পছন্দ করেন এবং নিজের সময়েও সেখানে যেতে আগ্রহী।
পেশাদার সমালোচকের গুরুত্ব কোথায়
খাদ্যসমালোচক জে রেইনার মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তা বাড়লেও পেশাদার খাদ্যসমালোচকের প্রয়োজন শেষ হয়ে যায়নি।
তাঁর দায়িত্ব হলো খাবার ও রেস্তোরাঁ নিয়ে যতটা সম্ভব আকর্ষণীয়, উপভোগ্য এবং সত্যনিষ্ঠ লেখা তৈরি করা। তাঁর মতে, ভালো কোনো সমালোচনা প্রকাশিত হলে সেটি এখনো রেস্তোরাঁয় মানুষের আগ্রহ ও বুকিং বাড়াতে পারে।
তবে তিনি এটাও স্বীকার করেন যে সমালোচকদের অবস্থান প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। তাঁর ভাষায়, কোনো সমালোচক শুধু নিজের পরিচিতি বা পেশাগত অবস্থানের কারণে সব সময় শ্রেষ্ঠ—এমন দাবি করার সুযোগ নেই।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। সংবাদপত্রের হয়ে কোনো সমালোচক রেস্তোরাঁ নিয়ে লিখতে গেলে সাধারণত সেই খাবারের বিল প্রতিষ্ঠানকে না দিয়ে সংবাদপত্রই পরিশোধ করে। অন্যদিকে অনেক খাদ্যপ্রভাবককে বিনা মূল্যে খাবারের আমন্ত্রণ জানানো হয়। ফলে পাঠক বা দর্শককে জানা দরকার, সংশ্লিষ্ট খাবারটির জন্য প্রভাবক নিজে অর্থ দিয়েছেন কি না।
রেস্তোরাঁর প্রচারে নতুন দরজা
বাথের একটি রেস্তোরাঁর প্রধান রাঁধুনি অ্যাডাম আর্মস্ট্রং বলেন, খাদ্যপ্রভাবকদের মাধ্যমে প্রচার পাওয়ার সুযোগ রেস্তোরাঁশিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তাঁর মতে, কোনো রেস্তোরাঁ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সামান্য আলোচনা হলেও সেটি মানুষের নজরে আসতে পারে। তবে প্রভাবকদের মতামতকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ারও প্রয়োজন নেই। তাঁরা মূলত নিজেদের মতামত প্রকাশ করেন, যা দর্শক গ্রহণ করবেন কি না, সেটি সম্পূর্ণ তাঁদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত।
চেলটেনহামের একটি রেস্তোরাঁর প্রতিষ্ঠাতা এডওয়ার্ড সারম্যানও মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের গল্প নিজেদের মতো করে মানুষের কাছে তুলে ধরার সুযোগ দিয়েছে। তাঁর মতে, খাদ্যপ্রভাবকেরা পেশাদার সমালোচকদের জায়গা দখল করছেন না; বরং তাঁদের কাজ খাদ্যসংক্রান্ত আলোচনাকে আরও বিস্তৃত করছে।
খাবার নিয়ে আলোচনায় নতুন পরিবর্তন
উইল্টশায়ারের খাদ্যপ্রভাবক বলজিন্দার কৌর সাংহা-গিল মনে করেন, খাদ্যপ্রভাবকেরা পেশাদার সমালোচকদের সরিয়ে দেননি। বরং তাঁরা খাবার নিয়ে সাধারণ মানুষের আলোচনার পরিসর আরও বড় করেছেন।
আগে নতুন রেস্তোরাঁ বা রান্নার পরামর্শ জানতে মানুষ হয়তো সপ্তাহান্তের সংবাদপত্রের অপেক্ষা করত। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েক মুহূর্তেই অসংখ্য মানুষের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ পাওয়া যায়।
তবে তিনিও সতর্ক করে দিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিটি তথ্যকে সত্য বা নিরপেক্ষ ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কোনো প্রতিষ্ঠান বিনা মূল্যে খাবার বা অন্য সুবিধা দিয়ে প্রচার করাতে পারে। তাই দর্শকের উচিত, কোনো প্রচারের পেছনে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা বিবেচনা করা।
আসল বিষয় বিশ্বাসযোগ্যতা

খাদ্যপ্রভাবকদের জনপ্রিয়তা মূলত তাঁদের সহজ যোগাযোগ, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কের কারণে। তাঁরা অনেক সময় এমন জায়গার কথা তুলে ধরেন, যেগুলো হয়তো পেশাদার সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় আসে না।
অন্যদিকে পেশাদার খাদ্যসমালোচকের কাজের ভিত্তি হলো স্বাধীন মূল্যায়ন, অভিজ্ঞতা ও বিশ্লেষণ। ফলে দুই পক্ষের কাজের ধরন এক নয়।
সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন বিজ্ঞাপন, ব্যক্তিগত মতামত এবং অর্থের বিনিময়ে প্রচারের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়। একজন দর্শক যদি মনে করেন কোনো প্রশংসা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে এসেছে, অথচ তার পেছনে অর্থ বা বিনা মূল্যে পাওয়া সুবিধা থাকে, তাহলে সেই মতামতের বিশ্বাসযোগ্যতা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
শেষ পর্যন্ত খাদ্যপ্রভাবক হোক কিংবা পেশাদার সমালোচক—দুজনের ক্ষেত্রেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সততা ও স্বচ্ছতা। খাবার নিয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়ানো, নতুন রেস্তোরাঁর পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং খাওয়ার সংস্কৃতিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলা—সবই ইতিবাচক। কিন্তু সেই প্রভাব যেন তথ্য গোপন বা বিভ্রান্তিকর প্রচারের ওপর দাঁড়িয়ে না থাকে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















