ক্রিকেটে পরিসংখ্যানের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। একজন ব্যাটারের রান, একজন বোলারের উইকেট কিংবা একটি দলের জয়-পরাজয়ের হিসাবের বাইরেও এখন ক্রিকেটের নানা সূক্ষ্ম বিষয় পরিসংখ্যানের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় ক্রিকেটভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ক্রিকভিজের কাছে পাঠকদের করা বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর সামনে এসেছে। এতে উঠে এসেছে ডিআরএসে সবচেয়ে সফল ব্যাটার, বাঁহাতি ও ডানহাতি ব্যাটারের পার্থক্য, জো রুটের রেকর্ডের সম্ভাবনা, কোন গতির বলে বেশি উইকেট পড়ে এবং ক্রিকেটের আরও বেশ কিছু চমকপ্রদ তথ্য।
দুই বলে দুই উইকেটের পর হ্যাটট্রিক কতটা কঠিন
টেস্ট ক্রিকেটে কোনো বোলার পরপর দুই বলে দুই উইকেট নেওয়ার পর হ্যাটট্রিক করার সুযোগ পান। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগানো যে কতটা কঠিন, তার প্রমাণ মিলেছে পরিসংখ্যানে।
তথ্যভান্ডারে থাকা টেস্ট ম্যাচগুলোতে ১ হাজার ৩৫৫ বার বোলাররা টানা দুই বলে দুই উইকেট নিয়েছেন। এর মধ্যে মাত্র ৪৩ বার বোলাররা পরের বলেও উইকেট নিয়ে হ্যাটট্রিক সম্পন্ন করতে পেরেছেন। অর্থাৎ দুই বলে দুই উইকেট নেওয়ার পর হ্যাটট্রিক করার সাফল্যের হার মাত্র ৩ দশমিক ২ শতাংশ।
ইংল্যান্ডের জশ টং চারবার টেস্টে টানা দুই বলে দুই উইকেট নিয়েছেন, কিন্তু এখনো হ্যাটট্রিক করতে পারেননি। পাকিস্তানের বিপক্ষে হেডিংলিতে সর্বশেষ টেস্টেই তিনি এমন কীর্তি দুবার করেছিলেন।
অস্ট্রেলিয়ার মিচেল স্টার্কের পরিসংখ্যানও বেশ বিস্ময়কর। টেস্টে তিনি ১৭ বার টানা দুই বলে দুই উইকেট নিয়েছেন। কিন্তু এখনো তার নামের পাশে একটি হ্যাটট্রিকও নেই।
জো রুটের সঙ্গীও রেকর্ডের অংশ
জর্ডান কক্সের সঙ্গে হেডিংলিতে ১৫০ রানের জুটি গড়ার মাধ্যমে ইংল্যান্ডের জো রুট আরও একটি বিরল রেকর্ডে নিজের নাম লিখিয়েছেন।
টেস্ট ক্রিকেটে রুট এখন পর্যন্ত ৪৫ জন আলাদা ব্যাটারের সঙ্গে অন্তত ৫০ রানের জুটি গড়েছেন। এই সংখ্যায় তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের শিবনারায়ণ চন্দরপলের সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে রয়েছেন।
কক্সের সঙ্গে ওই জুটিটি ছিল টেস্ট ক্রিকেটে রুটের ৮৮তম শতরানের বেশি জুটি। এই সংখ্যাতেও তিনি ভারতের রাহুল দ্রাবিড়ের সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছেন।

কোন বোলারের বল সবচেয়ে বেশি স্টাম্পে আঘাত করত
২০০৬ সাল থেকে বলের গতিপথ বিশ্লেষণের তথ্য বিবেচনা করলে পাকিস্তানের সাবেক অলরাউন্ডার মোহাম্মদ হাফিজের বল সবচেয়ে বেশি স্টাম্পে আঘাত করার সম্ভাবনা দেখিয়েছে। তার ৪১ শতাংশ বলই স্টাম্পে গিয়ে আঘাত করার মতো অবস্থায় ছিল।
শুধু পেস বোলারদের বিবেচনায় ইংল্যান্ডের পল কলিংউড এগিয়ে। তার প্রায় ১৯ শতাংশ বল স্টাম্পে আঘাত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল।
দেশভিত্তিক হিসাবেও বাংলাদেশের পরিসংখ্যান উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত টেস্টে মোট বলের ২৭ শতাংশ স্টাম্পে আঘাত করার সম্ভাবনা দেখিয়েছে। স্পিনের আধিক্যের কারণে এটি খুব একটা বিস্ময়কর নয়।
অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার দ্রুত ও বাউন্সি উইকেটে এই হার মাত্র ১২ শতাংশ। টেস্ট খেলা দেশগুলোর মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন।
ডিআরএসে সবচেয়ে সফল লিটন দাস
সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের লিটন দাসের পরিসংখ্যান দারুণ। ২০১৬ সাল থেকে টেস্টে অন্তত ১৫টি পুনর্বিবেচনার আবেদন করা ৩৫ জন ব্যাটারের মধ্যে লিটনের সাফল্যের হার সবচেয়ে বেশি।
তিনি ১৬টি পুনর্বিবেচনার মধ্যে ১১টিতে আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করাতে পেরেছেন। তার সাফল্যের হার ৬৮ দশমিক ৮ শতাংশ।
এই তালিকায় দ্বিতীয় ভারতের চেতেশ্বর পূজারা। ১৫টি আবেদনের মধ্যে ৯টিতে সিদ্ধান্ত বদল হয়েছে, সাফল্যের হার ৬০ শতাংশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রেইগ ব্র্যাথওয়েট ১৮টির মধ্যে ১০টিতে সফল হয়ে ৫৫ দশমিক ৬ শতাংশ সাফল্যের হার নিয়ে তৃতীয়।
বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে সফল ওয়েস্ট ইন্ডিজের কেমার রোচ। ৪০টি পুনর্বিবেচনার মধ্যে ১৪টিতে সিদ্ধান্ত বদল হয়েছে, সাফল্যের হার ৩৫ শতাংশ। ইংল্যান্ডের ক্রিস ওকস ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ এবং স্টুয়ার্ট ব্রড ২৯ দশমিক ১ শতাংশ সাফল্য নিয়ে পরের অবস্থানে রয়েছেন।
টেন্ডুলকারের রেকর্ডের দিকে এগিয়ে রুট
টেস্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি রানের রেকর্ড এখনো ভারতের কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকারের দখলে। তার সংগ্রহ ১৫ হাজার ৯২১ রান।
জো রুটের সংগ্রহ এখন ১৪ হাজার ১৮০ রান। অর্থাৎ টেন্ডুলকারের রেকর্ড থেকে তিনি ১ হাজার ৭৪১ রান পিছিয়ে।
২০২৪ সালের শুরু থেকে রুট ৩২টি টেস্টের ৫৮ ইনিংসে ২ হাজার ৭৯৪ রান করেছেন। ইনিংসপ্রতি তার গড় ৪৭ দশমিক ৬ রান। এই হার ধরে রাখতে পারলে টেন্ডুলকারকে ছাড়িয়ে যেতে তার আরও প্রায় ৩৭টি ইনিংস প্রয়োজন হবে।
এটি প্রায় ২০টি টেস্ট ম্যাচের সমান। ইংল্যান্ডের পরবর্তী সূচিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে বর্তমান সিরিজের আরও দুটি টেস্ট, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তিনটি, বাংলাদেশের বিপক্ষে দুটি, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে একটি বিশেষ টেস্ট, বাংলাদেশের বিপক্ষে লর্ডসে একটি টেস্ট এবং অ্যাশেজের পাঁচটি টেস্ট রয়েছে।
ফলে রুটের সামনে টেন্ডুলকারের রেকর্ড ভাঙার বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এর জন্য তাকে বর্তমান ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে।
গত এক দশকে সেরা অলরাউন্ড ব্যাটিং গড় কোহলির
২০১৬ সাল থেকে পুরুষদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যারা টেস্টে অন্তত ১ হাজার ৫০০, এক দিনের ক্রিকেটে ১ হাজার এবং টি-টোয়েন্টিতে ৫০০ রান করেছেন, এমন ৪৩ জন ব্যাটারকে বিবেচনা করা হয়েছে।
তাদের মধ্যে তিন সংস্করণ মিলিয়ে সর্বোচ্চ গড় ভারতের বিরাট কোহলির। তার সামগ্রিক গড় ৫৬ দশমিক ৪।
টেস্টে কোহলির গড় ৪৮ দশমিক ৩, এক দিনের ক্রিকেটে ৬৭ দশমিক ৬ এবং টি-টোয়েন্টিতে ৫০ দশমিক ৩।
বাঁহাতি ব্যাটাররাই কি এগিয়ে
ক্রিকেটে বাঁহাতি ব্যাটারদের অনেক সময় দেখতে বেশি আকর্ষণীয় লাগে—এমন কথা প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু পরিসংখ্যান কি সেই ধারণাকে সমর্থন করে?
উত্তর হলো, অনেকটাই করে।
পুরুষ ও নারী—উভয় ক্রিকেটেই টেস্ট, এক দিনের ক্রিকেট ও টি-টোয়েন্টি—তিন সংস্করণে স্বীকৃত ব্যাটারদের গড় বিবেচনা করলে বাঁহাতিরাই ডানহাতিদের চেয়ে এগিয়ে।
অর্থাৎ শুধু চোখে দেখার সৌন্দর্য নয়, ব্যাটিং গড়ের হিসাবেও বাঁহাতি ব্যাটারদের পারফরম্যান্স তুলনামূলকভাবে ভালো।
কোন গতির বলে সবচেয়ে বেশি উইকেট
২০০৬ সাল থেকে বলের গতির তথ্য পাওয়া যায় এমন টেস্ট ম্যাচ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঘণ্টায় ৮৪ থেকে ৮৫ মাইল গতির বলেই পেস বোলাররা সবচেয়ে বেশি উইকেট পেয়েছেন।
এই গতিসীমার বলে মোট ১ হাজার ৫৯৪টি উইকেট পড়েছে।
আর গতি যদি দশমিক পর্যন্ত নির্দিষ্ট করে দেখা হয়, তাহলে ঘণ্টায় ৮৪ দশমিক ৬ মাইল গতির বল সবচেয়ে বেশি উইকেট এনে দিয়েছে। এই গতির বল থেকে মোট ১৯৩টি উইকেট এসেছে।
আক্রমণাত্মক শট মানেই বেশি ঝুঁকি
টেস্ট ক্রিকেটে রক্ষণাত্মক ব্যাটিংকে সাধারণত নিরাপদ বলে মনে করা হয়। কিন্তু সব আক্রমণাত্মক শট যে রক্ষণাত্মক শটের চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, পরিসংখ্যান সব ক্ষেত্রে তা বলছে না।
গত তিন বছরের পেস বোলিংয়ের বিপক্ষে শটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রক্ষণাত্মক শটে প্রতি ৪১ বলে একটি করে উইকেট পড়েছে। কাট শটে প্রতি ৪০ দশমিক ৪ বলে এবং ফ্লিকে প্রতি ৩৮ দশমিক ১ বলে একটি করে উইকেট পড়েছে।
তবে ড্রাইভে ব্যাটারদের রান করার গতি অনেক বেশি হলেও উইকেট হারানোর হারও তুলনামূলক বেশি। হুক শটে প্রতি ১৫ বলে এবং পুল শটে প্রতি ২২ দশমিক ৭ বলে একটি করে উইকেট পড়েছে।
সবচেয়ে নিরাপদ শট হিসেবে অবশ্য সামনে এসেছে বল ছেড়ে দেওয়া। কোনো ব্যাটার বল না খেলেই ছেড়ে দিলে প্রতি ২৯৫ দশমিক ৫ বলে একটি উইকেট পড়েছে। অর্থাৎ ভালোভাবে বল ছেড়ে দেওয়াই উইকেট বাঁচানোর সবচেয়ে কার্যকর কৌশলগুলোর একটি।
ওভারের কোন বলে সবচেয়ে বেশি উইকেট
অনেকেই মনে করতে পারেন, একটি ওভারের শেষ বলেই সবচেয়ে বেশি উইকেট পড়ে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা।
টেস্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি উইকেট পড়েছে ওভারের দ্বিতীয় বলে। এই বলে মোট ১১ হাজার ৮৬৬টি উইকেট পড়েছে।
এর পরেই রয়েছে পঞ্চম বল, যেখানে উইকেট পড়েছে ১১ হাজার ৭৮৭টি।
পুরোনো টেস্ট ক্রিকেটে ওভারে চার, পাঁচ কিংবা আট বলও করা হতো। পরিসংখ্যানে এসব ম্যাচও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
টেস্টে সবচেয়ে বেশি দেখা দলীয় ও ব্যক্তিগত স্কোর
টেস্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি দেখা দলীয় স্কোর হলো ২৯৬ রান। এই স্কোর হয়েছে ৪৪ বার।
এর পর রয়েছে ১৯১ রান, যা হয়েছে ৪৩ বার। ২২৩ রান হয়েছে ৪২ বার।
ব্যক্তিগত স্কোরের ক্ষেত্রে অবশ্য শূন্য সবার ওপরে। টেস্ট ক্রিকেটে ১১ হাজার ৮৭৭ বার কোনো ব্যাটার শূন্য রানে ইনিংস শেষ করেছেন। এর মধ্যে আউট হওয়া ও অপরাজিত থাকা—দুই ধরনের ঘটনাই অন্তর্ভুক্ত।
এর পর সবচেয়ে বেশি দেখা ব্যক্তিগত স্কোর ১ রান, ৪ হাজার ৬৮৪ বার। চার রান হয়েছে ৩ হাজার ৮৯৭ বার।
জয়ের শেষ বলে ছক্কার রাজা ধোনি
আন্তর্জাতিক এক দিনের ও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে রান তাড়া করতে গিয়ে ছক্কা মেরে ম্যাচ জেতানোর ক্ষেত্রে সবার ওপরে রয়েছেন ভারতের মহেন্দ্র সিং ধোনি।
তিনি মোট ১২ বার ছক্কা মেরে দলকে জয় এনে দিয়েছেন। এর মধ্যে এক দিনের ক্রিকেটে ৯টি এবং টি-টোয়েন্টিতে ৩টি।
তার পরে রয়েছেন বিরাট কোহলি, ৯ বার। ইংল্যান্ডের ইয়োন মরগ্যান ও জস বাটলার ৮ বার করে এবং পাকিস্তানের শোয়েব মালিক ও ভারতের লোকেশ রাহুল ৭ বার করে ছক্কা মেরে জয় নিশ্চিত করেছেন।
ক্রিকেটের এসব পরিসংখ্যান দেখায়, মাঠের প্রতিটি মুহূর্তের পেছনে রয়েছে অসংখ্য হিসাব। কোনো বোলারের হ্যাটট্রিকের সুযোগ, কোনো ব্যাটারের ডিআরএস সিদ্ধান্ত বদলানো কিংবা একটি নির্দিষ্ট গতির বলে উইকেট পাওয়ার হার—সবকিছুই ক্রিকেটকে আরও গভীরভাবে বোঝার সুযোগ করে দেয়। আর সেই পরিসংখ্যানের ভেতরেই অনেক সময় লুকিয়ে থাকে এমন কিছু গল্প, যা সাধারণ চোখে দেখা যায় না।
ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা শুধু রোমাঞ্চকর ম্যাচ বা তারকা খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভর করে না। মাঠের প্রতিটি বল, প্রতিটি রান এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে থাকা তথ্যও খেলাটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















