যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী সামরিক ঘাঁটিতে ছোট আকারের পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন ও পরিচালনার জন্য পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মোট ২২০ কোটি ডলারের চুক্তি করতে যাচ্ছে। প্রথম চুল্লিটি ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহে নতুন উদ্যোগ
‘ক্ষুদ্র পারমাণবিক চুল্লি’ নামে পরিচিত এসব স্থাপনা তুলনামূলকভাবে সহজে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়া যাবে। প্রতিটি চুল্লি সর্বোচ্চ ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে।
সেনাবাহিনী জানিয়েছে, বাণিজ্যিক পারমাণবিক চুল্লির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য পরিবেশ ও নিরাপত্তা বিধি এসব চুল্লির ক্ষেত্রেও মানা হবে। তবে বাণিজ্যিক পারমাণবিক স্থাপনার মতো জাতীয় পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরিবর্তে এসব সামরিক স্থাপনা সেনাবাহিনীর নিজস্ব তদারকিতে পরিচালিত হবে।
সেনাবাহিনীর স্থাপনা, জ্বালানি ও পরিবেশবিষয়ক দপ্তরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জেফ ওয়াকসম্যান বলেন, এই উদ্যোগের শেষ লক্ষ্য হলো এমন একটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য পণ্য তৈরি করা।
সেনাবাহিনীর সচিব ড্যান ড্রিসকলের ভাষায়, এই প্রকল্প সামরিক ঘাঁটিতে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা বাড়াবে। বাইরের বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিশ্বজুড়ে সামরিক কার্যক্রম পরিচালনায় প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
পাঁচ সামরিক ঘাঁটিতে পাঁচ প্রতিষ্ঠান
উত্তর ক্যারোলিনার ফোর্ট ব্র্যাগে অ্যান্টারেস নিউক্লিয়ার, কেন্টাকির ফোর্ট ক্যাম্পবেলে বিডব্লিউএক্সটি অ্যাডভান্সড টেকনোলজিস, টেক্সাসের ফোর্ট হুডে জেনারেল অ্যাটমিকস ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক সিস্টেমস, জর্জিয়ার ফোর্ট বেনিংয়ে রেডিয়েন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ এবং নিউইয়র্কের ফোর্ট ড্রামে ওয়েস্টিংহাউস গভর্নমেন্ট সার্ভিসেস কাজ করবে।
‘জেনাস’ নামের এই কর্মসূচি নিয়ে রেডিয়েন্ট ইন্ডাস্ট্রিজের বাণিজ্যিক বিভাগের প্রধান মাইক স্টারেট বলেন, প্রকল্পটি প্রতিষ্ঠানটিকে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করবে। ২০৩০ সালের দিকে তথ্যকেন্দ্রসহ বাণিজ্যিক গ্রাহকদের চাহিদা পূরণে এই প্রযুক্তি কাজে লাগানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিডব্লিউএক্সটির প্রধান নির্বাহী রেক্স গেভেডেন বলেন, কর্মসূচিটির মাধ্যমে দ্রুত মোতায়েনযোগ্য পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি নির্ভরযোগ্য পথ তৈরি হবে।
ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন
তবে ক্ষুদ্র পারমাণবিক চুল্লি নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। সমালোচকদের মতে, প্রচলিত বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় এসব চুল্লির উৎপাদন ব্যয় বেশি হতে পারে। নিরাপত্তাবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা পারমাণবিক প্রযুক্তির দুর্ঘটনা এবং ইচ্ছাকৃত হামলার মতো ঝুঁকির কথাও তুলে ধরেছেন।
টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যালান জে. কুপারম্যানের মতে, বেসরকারি খাতে এখনও অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর গ্রাহক খুঁজে না পাওয়া এমন পারমাণবিক প্রযুক্তিকে সামরিক বাহিনীর বিপুল অর্থায়ন কার্যত পরোক্ষ ভর্তুকি দিতে পারে।

ওয়াকসম্যানও স্বীকার করেছেন যে প্রচলিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় ক্ষুদ্র চুল্লির উৎপাদন ব্যয় কম হবে—এমনটা কেউ মনে করছে না। বরং ‘জেনাস’ কর্মসূচির মাধ্যমে কীভাবে ব্যয় কমানো যায়, সেটিই খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
তেজস্ক্রিয় বর্জ্য নিয়ে পরিকল্পনা
চুল্লিতে কোনো ত্রুটি দেখা দিলে সেগুলো নিরাপদভাবে বন্ধ হয়ে যাবে বলে জানিয়েছে সেনাবাহিনী। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো সামরিক ঘাঁটিতে চুল্লি স্থাপন করা হবে না।
তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য জ্বালানি বিভাগের সঙ্গে সেনাবাহিনী একটি চুক্তি নিয়ে কাজ করছে। সামরিক ঘাঁটিগুলোতে দীর্ঘমেয়াদে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য সংরক্ষণ করা হবে না বলেও জানানো হয়েছে।
এর আগে গত মাসে পাঁচটি অঙ্গরাজ্য পারমাণবিক জ্বালানি বর্জ্য গ্রহণের বিনিময়ে পারমাণবিক জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নে কেন্দ্রীয় সরকারের সহায়তা চেয়েছিল।
পারমাণবিক শক্তিতে ট্রাম্পের জোর
যুক্তরাষ্ট্রে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের মে মাসে একাধিক নির্বাহী আদেশে সই করেন। তিনি দেশটির পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন চার গুণ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে প্রায় পাঁচ দশকে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে মাত্র দুটি বড় পারমাণবিক চুল্লি নির্মিত হয়েছে। দুটিই নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে শেষ হয়েছে এবং নির্মাণ ব্যয় অনুমানের চেয়ে অন্তত ১ হাজার ৭০০ কোটি ডলার বেশি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে চালু থাকা ৯৪টি পারমাণবিক চুল্লি দেশটির মোট বিদ্যুতের প্রায় ১৯ শতাংশ সরবরাহ করে। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে আসে প্রায় ৬০ শতাংশ এবং নবায়নযোগ্য উৎস থেকে প্রায় ২১ শতাংশ বিদ্যুৎ।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষুদ্র পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের উদ্যোগ দেশটির জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রযুক্তির নতুন বাজার তৈরির পরীক্ষাক্ষেত্র হিসেবেও কাজ করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















