নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পেছনে ভূমিকম্প নয়, বরং একটি হিমবাহ ধসের ঘটনা কাজ করে থাকতে পারে বলে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে প্রমাণ। প্রাথমিকভাবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ধারণা করেছিল, ভূমিকম্পের কারণে পাহাড়ের ঢাল ধসে গিয়ে এই বিপর্যয় ঘটেছে। তবে স্যাটেলাইট ছবি ও ভূকম্পনসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণের পর বিজ্ঞানীদের ধারণা বদলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে রেকর্ড হওয়া ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূকম্পন আসলে ভূমিকম্প ছিল না। বরং উঁচু পাহাড়ে হিমবাহ থেকে বরফ ও ধ্বংসাবশেষ নিচে পড়ে যাওয়ার আঘাতেই ওই কম্পন সৃষ্টি হয়।
ইউএসজিএসের ব্যাখ্যায়, হিমবাহ ধস ও এর সঙ্গে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ পরবর্তী সময়ে নদীর ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। সংস্থাটি স্যাটেলাইট ছবি, কাছাকাছি ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি ভূকম্পন তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে।
হিমবাহের বিশাল অংশ ভেঙে পড়ার প্রমাণ

স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, হিমবাহের একটি বড় অংশ ভেঙে প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ মিটার নিচের উপত্যকায় পড়ে। নিচে আছড়ে পড়ার সময় বরফ ও পাথরের বড় অংশ গুঁড়িয়ে গিয়ে ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
নেপালের আবহাওয়া ও জলবিদ্যা বিভাগও জানিয়েছে, একটি বিশাল বরফখণ্ড ধসে পড়ার সম্ভাবনাই তারা দেখছে। ইউনিভার্সিটি অব ডান্ডির গবেষক সাইমন কুকের মতে, উচ্চভূমিতে হঠাৎ উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ায় ব্যাপক তুষার গলতে পারে। সেই পানি হিমবাহের ফাটলের ভেতর ঢুকে সেটিকে অস্থিতিশীল করে ধসের সূত্রপাত ঘটিয়ে থাকতে পারে।
তবে এই ব্যাখ্যা নিশ্চিত করতে আরও তথ্য প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন কুক। স্যাটেলাইট ছবিতে দুর্যোগের আগে ওই এলাকায় তুষারস্তর দ্রুত কমে যাওয়ার চিত্রও দেখা গেছে।
নদী আটকে তৈরি হয়েছিল সাময়িক জলাধার?
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, হিমবাহের সঙ্গে নেমে আসা পাথর ও বরফের ধ্বংসাবশেষ কোনো এক পর্যায়ে নদীর প্রবাহ সাময়িকভাবে আটকে দেয়। এর ফলে উঁচু ও খাড়া উপত্যকায় পেছনে বিপুল পরিমাণ পানি জমে একটি বড় জলাধারের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। পরে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে পানি ও ধ্বংসাবশেষ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে নিচের দিকে ধেয়ে যায়।

ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ের অধ্যাপক লিজ স্টিফেন্স বলেন, এমন খাড়া উপত্যকায় নদী আটকে গেলে পেছনে বড় আকারের জলাধার তৈরি হতে পারে এবং বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর প্রচণ্ড গতিতে পানি নেমে আসতে পারে।
গবেষকদের একজনের হিসাব অনুযায়ী, পানির গতি ঘণ্টায় প্রায় ৫০ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। কুকের মতে, হিমবাহ ধসের মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেই স্রোত সীমান্তের পোস্টে পৌঁছে যেতে পারে। ফলে প্রচলিত আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা দিয়েও মানুষকে সময়মতো সরিয়ে নেওয়া কঠিন ছিল।
জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পর্বত ও হিমবাহের অস্থিতিশীলতা বাড়ছে বলে আগের বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। কুকের সন্দেহ, এই ঘটনাতেও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ভূমিকা থাকতে পারে। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, এ মুহূর্তে তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
অন্যদিকে ইউনিভার্সিটি অব প্লাইমাউথের অধ্যাপক সারাহ বোল্টন মনে করেন, ভূকম্পনের শক্তি দেখে এখনো ভূমিকম্পের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তার মতে, ভূমিকম্পের ফলে পাহাড়ের ঢাল ধসে গিয়ে পরে তুষার, বরফ ও পাথরের বিশাল স্রোত এবং বন্যা সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। ঠিক কীভাবে পুরো ঘটনাটি ঘটেছে, তা নিশ্চিত হতে আরও কয়েক দিন বা সপ্তাহের গবেষণা প্রয়োজন।
হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যা
নেপালের এই ঘটনা ২০২১ সালে হিমালয় অঞ্চলে ঘটে যাওয়া একটি বড় বন্যার সঙ্গে কিছুটা মিল রয়েছে। তবে কুকের মতে, এবারের ঘটনা আকার ও প্রভাবের দিক থেকে আরও বড় এবং নজিরবিহীন হতে পারে।
নেপাল-চীন সীমান্তের উপত্যকায় স্যাটেলাইট ছবিতে বন্যার আগে ও পরের দৃশ্যের ব্যাপক পার্থক্য দেখা গেছে। এতে বরফ, পাথর ও মাটির বিশাল পরিমাণ স্থানচ্যুতির চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















