কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভর করে কর্মীদের বড় একটি অংশের কাজ কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করেছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠান মেটা। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গের নেতৃত্বে নেওয়া এই পরিকল্পনায় কোনো কোনো দলের কর্মীসংখ্যা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হয়েছিল। তবে কর্মীদের তীব্র ক্ষোভ, প্রযুক্তিটির প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া এবং বিনিয়োগকারীদের চাপের মুখে পরিকল্পনার বড় একটি অংশ শেষ পর্যন্ত বাতিল করা হয়।
কর্মী কমানোর পরিকল্পনা
চলতি বছরের জানুয়ারিতে হাওয়াইয়ে জাকারবার্গ ও মেটার শীর্ষ কর্মকর্তাদের এক বৈঠকে প্রতিষ্ঠানের কর্মপদ্ধতিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর করার একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা তৈরি হয়। পরিকল্পনাটির নাম দেওয়া হয় ‘প্রকল্প ওটি’, যার লক্ষ্য ছিল এমন একটি কর্মপরিবেশ তৈরি করা, যেখানে মানুষের দৈনন্দিন অনেক কাজ করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বড় মানবদলগুলোর পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত ছোট কিন্তু দক্ষ কর্মীদল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ভার্চুয়াল কর্মীদের তদারকি করবে। বিভিন্ন সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণের সময় মেটার একাধিক দলের আকার ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর কথাও বিবেচনা করা হয়।
পরিকল্পনাটি দুই ধাপে বাস্তবায়নের কথা ছিল। প্রথম ধাপে মে মাসে কর্মী কমানো এবং দ্বিতীয় ধাপে নভেম্বর মাসে আরও বড় ধরনের পুনর্গঠন করার পরিকল্পনা ছিল। কর্মী ছাঁটাইয়ের পাশাপাশি শূন্য পদ বন্ধ করা এবং যাদের কর্মদক্ষতা প্রত্যাশিত মানে নেই বলে মনে করা হবে, তাদেরও সরিয়ে দেওয়ার কথা ছিল।
এক পর্যায়ে মেটার একজন মানবসম্পদ কর্মকর্তা ধারণা করেছিলেন, এই পুনর্গঠন তিন বছর আগের প্রায় ২৫ শতাংশ কর্মী কমানোর সমান বা তার চেয়েও বড় হতে পারে।
শেষ মুহূর্তে পরিকল্পনায় পরিবর্তন
মে মাসের ১৯ তারিখ রাতে, প্রথম দফার কর্মী ছাঁটাইয়ের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে জাকারবার্গ পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন আনেন। পরদিন মেটা প্রায় ১০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই করলেও নভেম্বরের দ্বিতীয় দফার ব্যাপক পুনর্গঠনের প্রস্তুতি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এর মধ্যে কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তীব্র হয়ে উঠেছিল। অনেক কর্মী মনে করছিলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে তাদের কাজের জায়গা দখল করা।
একই সময়ে মেটার অভ্যন্তরীণ তথ্যেও দেখা যাচ্ছিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্বয়ংক্রিয় কর্মী প্রযুক্তি থেকে প্রত্যাশিত উৎপাদনশীলতা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয় করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামো তৈরির সুফল নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও প্রশ্ন তৈরি হয়।
বদলে যাচ্ছিল কাজের ধরন
মেটা প্রচলিত কর্মপদ্ধতির পরিবর্তে ছোট ছোট কর্মদল গঠনের দিকে এগোচ্ছিল। আগে যেখানে একটি পণ্য তৈরিতে প্রকৌশলী, নকশাবিদ, তথ্যবিজ্ঞানীসহ বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের আলাদা দায়িত্ব ছিল, সেখানে নতুন ব্যবস্থায় তিন থেকে পাঁচজনের ছোট দলকে বেশি দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়।
এই কর্মীদের কাজের পরিচয়ও আরও সাধারণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ছোট দলগুলোকে দ্রুত নতুন পণ্যের নমুনা তৈরি করতে বলা হয়, আর দীর্ঘ কয়েক মাসের পরিকল্পনার বদলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কাজ শেষ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ব্যবস্থাপনার স্তরও কমিয়ে আনার পরিকল্পনা ছিল। মাঝারি পর্যায়ের ব্যবস্থাপকদের অনেক দায়িত্ব সরিয়ে দিয়ে ছোট কর্মদলগুলোকে সরাসরি উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অধীনে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এশিয়ার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রভাব
মেটার কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা গত বছর এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কেন্দ্র করে তৈরি ছোট ও নমনীয় কর্মদল তাদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে।
এরপর মেটার ভেতরেও পরীক্ষামূলকভাবে এমন ছোট কর্মদল গঠন শুরু হয়। চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে প্রকৌশল ও গবেষণাসহ অন্তত ১১টি বিভাগে এ ধরনের কর্মপদ্ধতি চালু হয়েছিল।
মেটার কর্মকর্তাদের ধারণা ছিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে একজন দক্ষ কর্মী আগের তুলনায় অনেক বেশি কাজ করতে পারবেন। তাই ছাঁটাই থেকে সাশ্রয় হওয়া অর্থের একটি অংশ অত্যন্ত দক্ষ কর্মীদের আকৃষ্ট করতে বড় বেতন দেওয়ার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করার পরিকল্পনা ছিল।
কর্মীদের তীব্র প্রতিক্রিয়া
মার্চে বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মেটার কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। পরে মে মাসে প্রায় ১০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাইয়ের বিষয়টি নিশ্চিত হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
কিছু প্রকৌশলীকে নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রকৌশল বিভাগে সরিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রশিক্ষণের জন্য সফটওয়্যার তৈরির বিভিন্ন অনুশীলন ও তথ্য প্রস্তুতের কাজ করতে হতো। অনেক কর্মী এই কাজকে একঘেয়ে ও বিরক্তিকর বলে অভিহিত করেন।
এদিকে কর্মীদের কম্পিউটারে মাউসের নড়াচড়া ও বোতাম চাপার তথ্য সংগ্রহের প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগও ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি করে। কর্মীদের ধারণা ছিল, তারা নিজেদের কাজের বিকল্প তৈরির জন্যই যেন তথ্য সরবরাহ করছেন।
মেটার অভ্যন্তরীণ কর্মী সন্তুষ্টি জরিপেও এর প্রভাব পড়ে। কর্মীদের ইতিবাচক মনোভাবের হার ৭৪ শতাংশ থেকে কমে ৫৫ শতাংশে নেমে আসে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উৎপাদনশীলতা নিয়েও প্রশ্ন
মেটার কর্মীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ সফটওয়্যার সংকেত তৈরি করতে সক্ষম হলেও এর বাস্তব সুফল নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।
প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, কর্মীরা যে সফটওয়্যার পরিবর্তন করছিলেন তার পরিমাণ এক বছরে ২২০ শতাংশ বেড়েছিল। কিন্তু মেটার ব্যবহারকারীদের জন্য নতুন বা উন্নত সুবিধা তৈরিতে পৌঁছানো পরিবর্তনের পরিমাণ বেড়েছিল মাত্র ৩৬ শতাংশ।
আরও উদ্বেগজনক ছিল প্রযুক্তিগত ত্রুটি ও নিরাপত্তা সমস্যা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি বিপুল পরিমাণ সফটওয়্যার পরিবর্তনের পর অবকাঠামো বিভাগগুলো নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সতর্কবার্তা দেয়। কিছু স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এমন বড় ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবর্তন করছিল, যা সাধারণত কোনো মানুষ করতেন না।
এর ফলে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তা সমস্যার ঘটনা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে যায়। এসব সমস্যা সামাল দিতে কর্মীদের যে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হয়েছে, তা বেড়েছে প্রায় ৭০ শতাংশ।
জাকারবার্গের স্বীকারোক্তি
পরিস্থিতি সামলাতে জাকারবার্গ পরে কর্মীদের সঙ্গে এক অভ্যন্তরীণ সভায় স্বীকার করেন যে প্রতিষ্ঠানটির পুনর্গঠনের সময় নির্ধারণে ভুল হিসাব হয়েছিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় কর্মী প্রযুক্তি তাঁর প্রত্যাশা অনুযায়ী দ্রুত উন্নতি করতে পারেনি বলেও জানান তিনি।
তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, পরবর্তী কয়েক মাসে প্রযুক্তিটির সক্ষমতা বাড়বে এবং এর বাস্তব সুফল আরও স্পষ্ট হবে।
এরপর কর্মীদের মনোবল ফেরাতে মেটা বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়। কর্মীদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়। মাউস ও বোতাম চাপার তথ্য সংগ্রহের কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিভাগে যাওয়া কিছু কর্মীকে আগের দলে ফিরে যাওয়ার সুযোগও দেওয়া হয়।
অফিসের খাবার, ভ্রমণ ও সামাজিক কার্যক্রমে ব্যয় বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়।
চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি
জাকারবার্গ চলতি বছর আর প্রতিষ্ঠানজুড়ে বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাই হবে না বলে কর্মীদের আশ্বস্ত করেছেন। তবে তাঁর বক্তব্যে ‘প্রতিষ্ঠানজুড়ে’ এবং ‘এ বছর’—এই দুই সীমারেখা থাকায় কর্মীদের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অনেকে মনে করছেন, মেটা হয়তো নির্দিষ্ট বিভাগে কর্মী কমানো অব্যাহত রাখতে পারে। কর্মদক্ষতার ভিত্তিতেও কর্মী বাদ দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাই আগামী বছর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় মেটার ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। চলতি বছর প্রতিষ্ঠানটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চিপ ও অবকাঠামোতে অন্তত ১৩ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। বিপুল এই ব্যয় কমিয়ে আনার চাপের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশাও মেটার ওপর বাড়ছে।
মানুষ নাকি যন্ত্র—মেটার সামনে কঠিন প্রশ্ন
জাকারবার্গ এখন প্রকাশ্যে এমন একটি ভবিষ্যতের কথা বলছেন, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের ক্ষমতা বাড়াবে। তাঁর বক্তব্য, প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য মানুষের কাজ কেড়ে নেওয়া নয়, বরং কোটি কোটি মানুষের হাতে নতুন প্রযুক্তির শক্তি তুলে দেওয়া।
তবে মেটার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কর্মীদের কাজ প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনা কাগজে যতটা সহজ, বাস্তবে তা ততটা নয়। প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা, কর্মীদের প্রতিরোধ, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং বিপুল ব্যয়ের কারণে মেটাকে শেষ পর্যন্ত তার সবচেয়ে কঠোর পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে হয়েছে।
তবে কর্মী কমানোর চাপ পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। বরং মেটার সামনে এখন বড় প্রশ্ন—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করে কীভাবে কর্মীদের সংখ্যা কমানোর বদলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো যায় এবং একই সঙ্গে কর্মীদের আস্থাও ধরে রাখা যায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















