ইরানের মুদ্রা রিয়ালের দর ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। দেশটির খোলা বাজারে এক মার্কিন ডলারের বিনিময়মূল্য ২০ লাখ রিয়াল ছাড়িয়েছে। দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং দ্রুত বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির সম্মিলিত চাপে দেশটির অর্থনীতি এখন গভীর সংকটে।
রিয়ালের এই পতনে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। খাদ্য, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দ্রুত বেড়েছে। প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ মানুষের দেশ ইরানে বহু বছর ধরেই নিষেধাজ্ঞা ও মূল্যস্ফীতির চাপ ছিল। সাম্প্রতিক যুদ্ধ সেই সংকটকে আরও তীব্র করেছে।
২০ লাখ রিয়ালে এখন কতটুকু বাজার
যুদ্ধের আগে ২০ লাখ রিয়ালে প্রায় চার কেজি টমেটো, আধা কেজি মুরগির মাংস এবং এক লিটারের সামান্য কম রান্নার তেল কেনা যেত। এখন একই অর্থে প্রায় অর্ধেক পরিমাণ পণ্য কেনা সম্ভব।
তেহরানে নিত্যপণ্যের গড় দামের হিসাবে টমেটোর দাম ৭১ শতাংশ, মুরগির মাংস ৭৪ শতাংশ এবং রান্নার তেলের দাম ১৭৭ শতাংশ বেড়েছে।
ওষুধের বাজারেও দেখা দিয়েছে ভয়াবহ মূল্যবৃদ্ধি। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য জরুরি ইনসুলিনের দাম বেড়েছে ৬৪২ শতাংশ। জ্বর ও ব্যথার ওষুধ প্যারাসিটামলের দাম বেড়েছে ৯৩ শতাংশ। শিশুদের জন্য ব্যবহৃত গুঁড়া দুধের দামও ৯৫ শতাংশ বেড়েছে। সরকার কিছু ক্ষেত্রে ভর্তুকি দিলেও পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ কমছে না।
রিয়ালের বিনিময়মূল্য দ্রুত ওঠানামা করায় এসব দামও পরিবর্তনশীল।
সংসারের খরচ সামলাতে হিমশিম পরিবার
জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ইরানের পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার ক্ষেত্রেও কাটছাঁট করতে হচ্ছে। তেহরানের ৩৫ বছর বয়সী এক মা জানান, যুদ্ধের পর তাঁদের পরিবারের সাপ্তাহিক বাজার খরচ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে।
তিনি বলেন, আগে কয়েক মাস পরের পরিকল্পনা করা সম্ভব হলেও এখন মাসের শেষ পর্যন্ত আয় দিয়ে কীভাবে সংসার চালানো যাবে, সেটিই প্রধান চিন্তা।
স্বামী-স্ত্রী দুজনেই কাজ করলেও তাঁদের এক বছর বয়সী সন্তানের দেখাশোনার ব্যয় বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রে প্রতিদিনের খরচ প্রায় পাঁচ লাখ রিয়াল পর্যন্ত পৌঁছেছে। শিশুর দুধে সরকারি সহায়তা কিছুটা স্বস্তি দিলেও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পুষ্টিকর সম্পূরকের খরচ অনেক ক্ষেত্রে বীমার আওতায় নেই।
ফলে নতুন পোশাক কেনা, গাড়ি পরিবর্তন কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা পিছিয়ে দিতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে।
ব্যবসায়ও নেমেছে মন্দা
অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যেও। যুদ্ধের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে সামুদ্রিক অবরোধের কারণে আমদানি-রপ্তানিও কঠিন হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে রিয়ালের দুর্বলতার কারণে পণ্যের দাম বেড়েছে, অথচ শ্রমিকদের আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি।
চলতি ইরানি অর্থবছর, যা ২০২৭ সালের মার্চে শেষ হবে, তার জন্য সরকার নির্ধারিত সর্বনিম্ন মজুরি ১৬ কোটি ৬০ লাখ রিয়াল। সরকারি সহায়তা ও বিভিন্ন সুবিধা ধরেও মোট অর্থ ২২ কোটি রিয়ালের নিচে থাকে।

তেহরানের পুরুষদের পোশাক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ৩৫ বছর বয়সী এক ব্যবসায়ী জানান, গত বছরের তুলনায় তাঁর বিক্রি প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে।
তাঁর আশঙ্কা, শীত শেষ হওয়ার আগেই এই খাতের বহু ব্যবসায়ী দেউলিয়া হয়ে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারেন। শ্রমিকের মজুরি, কাঁচামালের দামসহ প্রায় সব ধরনের ব্যয় বেড়েছে। অনেক দোকানি এখন লোকসান দিয়ে গ্রীষ্মের পোশাক বিক্রি করছেন। শরতে আবারও পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বেতন পাওয়ার আগেই কমছে আয়ের মূল্য
মূল্যস্ফীতি এত দ্রুত বাড়ছে যে মাসিক বেতন হাতে পাওয়ার পর পরবর্তী বেতন পাওয়ার আগেই সেই অর্থের প্রকৃত মূল্য অনেকটাই কমে যাচ্ছে।
দক্ষিণ ইরানের হরমুজগান প্রদেশের ২৮ বছর বয়সী এক নারী জানান, আগে তাঁদের পরিবারের সাপ্তাহিক বাজার করতে প্রায় পাঁচ লাখ তুমান লাগত। এখন একই বাজারের জন্য অন্তত ৫০ লাখ তুমান প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে মাংস ও মুরগির মতো খাবার কমিয়ে দিতে হয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরোপুরি বাদও দিতে হচ্ছে।
আয় বাড়ার বদলে কমে যাওয়ায় তাঁকে আরও বেশি খরচ কমাতে হচ্ছে। শিশুদের সাধারণ সর্দির ওষুধ কিংবা মৌসুমি অ্যালার্জির ওষুধ কিনতেও এখন প্রায় তিন লাখ তুমান লাগে। একজন সাধারণ চিকিৎসকের কাছে গেলেও খরচ এক লাখ তুমানের কম নয়।
ইরানে প্রচলিত তুমান আসলে ১০ রিয়ালের সমান একটি অনানুষ্ঠানিক হিসাবের একক। বড় অঙ্কের অর্থ প্রকাশকে সহজ করতে সাধারণ মানুষ এটি বেশি ব্যবহার করে।

যুদ্ধের আগেও ছিল গভীর অর্থনৈতিক সংকট
ইরানের বর্তমান অর্থনৈতিক দুরবস্থা কেবল সাম্প্রতিক যুদ্ধের কারণে তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে চলা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং মানুষের দুর্বল ক্রয়ক্ষমতা দেশটির অর্থনীতিকে চাপে রেখেছিল।
বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের নিষেধাজ্ঞা অর্থনীতির ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধ সেই সংকটের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত করেছে অবকাঠামো ক্ষতি, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, বাণিজ্যে বাধা এবং আমদানি জটিলতার মতো সমস্যা।
ফলে এক ডলারের বিপরীতে ২০ লাখ রিয়ালের বেশি বিনিময়মূল্য এখন শুধু মুদ্রাবাজারের একটি রেকর্ড নয়। সাধারণ ইরানির জীবনে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ছোট হয়ে আসা বাজারের ব্যাগে, বাড়তে থাকা চিকিৎসা ব্যয়ে এবং মাসের আয় দিয়ে সংসার চালানোর ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়া বাস্তবতায়।
পরিচয় গোপন রাখতে কয়েকজনের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















