যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা থেকে গাড়ি নির্মাতারা শুল্ক কমানোর আশায় ছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশার বিপরীতে কানাডা থেকে আমদানি করা গাড়ি, ট্রাক ও যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক দ্বিগুণ করে ৫০ শতাংশ করার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নতুন এই শুল্ক আগামী ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা।
সমঝোতার বদলে দ্বিগুণ হলো শুল্ক
গত সপ্তাহেও গাড়ি শিল্পের কর্মকর্তারা আশা করছিলেন, গ্রীষ্মকালীন যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্য আলোচনায় একটি সমঝোতা হবে। এর মাধ্যমে কানাডা থেকে আমদানি করা গাড়ি ও হালকা ট্রাকের ওপর বিদ্যমান ২৫ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছিল।
কিন্তু সোমবার পরিস্থিতি পুরোপুরি পাল্টে যায়। ট্রাম্প ঘোষণা দেন, কানাডার গাড়ি, ট্রাক ও গাড়ির যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক ৫০ শতাংশ করা হবে। ফলে গাড়ি নির্মাতাদের জন্য সীমান্ত পেরিয়ে গাড়ি ও যন্ত্রাংশ পরিবহনের ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, জানুয়ারি পর্যন্ত সময় থাকায় এখনো চুক্তিতে পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে। কারণ কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ গাড়ির বাজার এবং কানাডায় তৈরি অনেক গাড়িতেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মার্কিন যন্ত্রাংশ ব্যবহৃত হয়। ফলে কানাডাকে চীনের মতো শুল্কের আওতায় ফেলা শিল্পটির জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি শিল্পেও বাড়বে খরচ
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি হওয়া গাড়ির মাত্র প্রায় ৬ শতাংশ কানাডায় তৈরি হয়েছিল। তবে কানাডার ওপর শুল্ক দ্বিগুণ হলে ফোর্ড, জেনারেল মোটরস, স্টেলান্টিস, টয়োটা ও হোন্ডার মতো বড় নির্মাতাদের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি গাড়ির উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে যন্ত্রাংশের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করা হলে এর প্রভাব শুধু কানাডা থেকে গাড়ি আমদানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তৃত গাড়ি উৎপাদন ব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
এশিয়া ও ইউরোপের প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে বৈষম্যের অভিযোগ
ডেট্রয়েটের গাড়ি নির্মাতারা দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতিতে তারা এশিয়া ও ইউরোপের প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছেন।
এশিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি দেশের সঙ্গে আলাদা বাণিজ্য চুক্তির কারণে সেসব বাজার থেকে আমদানি করা গাড়ির ওপর শুল্ক ১৫ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে কানাডা ও মেক্সিকোর ক্ষেত্রে শুল্ক ২৫ শতাংশে রয়ে গেছে, যদিও গাড়িতে ব্যবহৃত মার্কিন উপাদানের মূল্যের ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় রয়েছে।
এখন কানাডার ওপর প্রস্তাবিত ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হলে প্রতিযোগিতার ভারসাম্য আরও বদলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে গাড়ি শিল্প।
জিএমের পিকআপ ও টয়োটার গাড়ি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে

কানাডার উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে বড় মার্কিন ও জাপানি গাড়ি নির্মাতাদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। জেনারেল মোটরসের জনপ্রিয় শেভ্রোলেট সিলভেরাডো পিকআপের উৎপাদনের প্রায় ১৭ শতাংশ কানাডায় হয়।
স্টেলান্টিসের ক্রাইসলার প্যাসিফিকা তৈরির একমাত্র উৎপাদনকেন্দ্রও কানাডায়। অন্যদিকে ফোর্ডের ওকলভিল কারখানা থেকে বড় আকারের সুপার ডিউটি ট্রাক যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।
তবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে টয়োটা ও হোন্ডা। ২০২৫ সালে কানাডায় উৎপাদিত প্রায় ১২ লাখ গাড়ির ৭৫ শতাংশেরও বেশি তৈরি করেছে এই দুই জাপানি নির্মাতা। এসব গাড়ির বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে যায়।
নতুন কারখানা নিয়েও অনিশ্চয়তা
বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা গাড়ি নির্মাতাদের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের ওপরও প্রভাব ফেলছে। হোন্ডার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ইতিমধ্যে সতর্ক করেছেন, উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো না হলে মহাদেশটিতে নতুন একটি সংযোজন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে পারে প্রতিষ্ঠানটি।
ফলে কানাডা-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিরোধ শুধু বর্তমান গাড়ির দাম ও উৎপাদন ব্যয়ের ওপর নয়, উত্তর আমেরিকার ভবিষ্যৎ গাড়ি শিল্পের বিনিয়োগ ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















