০৮:৩৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬
শত্রুর পেছনে ৩২০ কিলোমিটার উড়ে যাবে ব্রিটিশ সেনা, পিঠে থাকবে ‘উড়ন্ত ব্যাগ’ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনের নিষেধ অমান্য করে ফের খেলার মাঠ সংস্কার ১০ দিনের বিরতির পর ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে এক দিনেই যুক্তরাজ্যে প্রায় ৫০০ অভিবাসী লন্ডনে ইহুদি সম্প্রদায়ের চার অ্যাম্বুলেন্সে অগ্নিসংযোগ, দোষ স্বীকার চার তরুণের নেপাল-তিব্বত আকস্মিক বন্যায় নিখোঁজ প্রায় ৩০০ ভারতীয়, স্বপ্নের তীর্থযাত্রায় গিয়ে দুই নারীও নিখোঁজ পাকিস্তানের অর্থনীতিতে উদযাপনের মতো তেমন কিছু নেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ধাক্কায় বিশ্ব ভয়াবহ পরিবর্তনের মুখে, প্রস্তুতি নেই: বিল গেটস টানা দ্বিতীয় সপ্তাহে আদিয়ালা কারাগারে ইমরান খানের সঙ্গে বোন নূরিন নিয়াজির সাক্ষাৎ যুক্তরাষ্ট্রে কিশোরদের ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারে কারফিউ ও দৈনিক সময়সীমা পাঞ্জাবে ক্যানসারের উন্নত চিকিৎসা আরও বিস্তৃত, বসছে পাঁচ নতুন ক্রায়োঅ্যাবলেশন যন্ত্র

নেপালের বন্যা মোকাবিলায় অর্থসংস্থান: ত্রাণের পর আসল পরীক্ষা পুনর্গঠন

ভোটেকোশি বন্যায় বিপর্যস্ত নেপালের সামনে এখন শুধু উদ্ধার ও ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার প্রশ্ন নয়; একই সঙ্গে দাঁড়িয়ে গেছে বিপুল অর্থসংস্থানের কঠিন বাস্তবতা। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ হিসাব এখনও স্পষ্ট নয়, অথচ দুর্গত মানুষের তাৎক্ষণিক সহায়তা, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো সামলানো এবং পরবর্তী পুনর্বাসনের জন্য দ্রুত অর্থের প্রয়োজন। ফলে দেশটির সরকারকে একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বাজেট পুনর্বিন্যাস, বেসরকারি খাতের সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পথ খুঁজতে হচ্ছে।

নেপালের অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরের বাজেটে আগে থেকেই বরাদ্দ থাকা বিভিন্ন খাত থেকে প্রায় ২০ বিলিয়ন নেপালি রুপি তাৎক্ষণিকভাবে দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্যবহার করা সম্ভব। এসব অর্থ মূলত ত্রাণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ ছিল। অর্থাৎ নতুন করে অর্থ ছাড়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় না গিয়ে সরকার বিদ্যমান বরাদ্দ থেকেই প্রাথমিক প্রয়োজন মেটাতে পারবে।

কিন্তু এখানেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। বন্যার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি এখনও নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে মোট কত অর্থ প্রয়োজন হবে, তারও কোনো নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই। অর্থ মন্ত্রণালয়কে তাই এখন থেকেই অতিরিক্ত সম্পদের সম্ভাব্য উৎস খুঁজতে হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সহায়তার দিকে তাকিয়ে নেপাল

বিপর্যয়ের মাত্রা বিবেচনায় বিদেশি সহায়তা নেপালের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারত, চীন ও বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে উদ্ধার ও পুনর্গঠন সহায়তার বিষয়ে সমন্বয় শুরু করেছে। নেপালের অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন উৎস থেকে জরুরি সহায়তা হিসেবে সর্বোচ্চ ২৫ বিলিয়ন রুপি পর্যন্ত সংগ্রহের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

ভারত তাৎক্ষণিকভাবে কোন কোন ত্রাণসামগ্রী প্রয়োজন, তার তালিকা চেয়েছে এবং কিছু সরবরাহ ইতোমধ্যে পৌঁছেছে। চীনও তাৎক্ষণিক নগদ সহায়তা দিতে সম্মত হয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর এই সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দুর্যোগের প্রথম পর্যায়ে দ্রুত অর্থ ও উপকরণ পাওয়া গেলে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের গতি বাড়ানো সম্ভব।

তবে আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা যেন দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠনের একমাত্র কৌশল না হয়ে ওঠে, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। দুর্যোগের পর বিদেশি অর্থ পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু সেই অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে এবং কোন অবকাঠামো আগে পুনর্গঠন করা হবে—এই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত নেপালকেই নিতে হবে।

দেশীয় সম্পদের সীমাবদ্ধতা

নেপালের সাবেক ন্যাশনাল রিকনস্ট্রাকশন অথরিটির প্রধান গোবিন্দ রাজ পোখরেলের মূল্যায়ন পরিস্থিতির গভীরতা বোঝায়। তাঁর মতে, ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের চেয়েও বড় হতে পারে এবং এত ব্যাপক অবকাঠামো পুনর্গঠন কেবল দেশীয় অর্থে সম্ভব নয়।

এই বাস্তবতা নেপালের জন্য একটি মৌলিক অর্থনৈতিক প্রশ্ন সামনে এনেছে। জরুরি ত্রাণের অর্থ সংগ্রহ করা এক বিষয়, আর ধ্বংস হয়ে যাওয়া রাস্তা, বসতি ও অন্যান্য অবকাঠামো দীর্ঘমেয়াদে পুনর্নির্মাণ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। প্রথমটির জন্য দ্রুত অর্থ জোগাড় করা সম্ভব হলেও দ্বিতীয়টির জন্য প্রয়োজন হতে পারে বহু বছরের পরিকল্পনা ও বড় অঙ্কের বৈদেশিক মূলধন।

বিশেষ করে রাসুয়া অঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতি যদি কিছু বসতিকে নতুন স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন তৈরি করে, তাহলে পুনর্বাসনের ব্যয় আরও বাড়বে। তখন শুধু ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ করলেই হবে না; নতুন যোগাযোগব্যবস্থা, জনসেবা এবং নিরাপদ বসতি গড়ে তোলার প্রশ্নও সামনে আসবে।

উন্নয়ন পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন জরুরি

এই বন্যা নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি উন্নয়ন পরিকল্পনার দুর্বলতাকেও সামনে এনেছে। নদীর তীর ধরে রাস্তা নির্মাণ এবং পরে সেই রাস্তার আশপাশে বসতি গড়ে ওঠার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। দুর্যোগের পর একই ধরনের অবকাঠামো একই জায়গায় পুনর্নির্মাণ করলে পুনরায় বিপর্যয়ের আশঙ্কা থেকেই যাবে।

অতএব পুনর্গঠনকে শুধু আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার প্রকল্প হিসেবে দেখলে চলবে না। কোথায় রাস্তা হবে, কোথায় বসতি নিরাপদ, কোন অবকাঠামো নদী ও পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকি থেকে দূরে রাখা দরকার—এসব প্রশ্নকে উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে আনতে হবে। দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্গঠনকে ভবিষ্যৎ দুর্যোগের ঝুঁকি কমানোর সুযোগ হিসেবেও ব্যবহার করতে হবে।Global aid heads to Nepal after devastating flash flood | Reuters

অর্থসংগ্রহে স্বচ্ছতার প্রয়োজন

নেপাল সরকার ত্রাণ সংগ্রহ ও বিতরণে ‘ওয়ান-ডোর’ নীতি চালু করেছে। ব্যক্তি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, দাতা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোকে সরকারি জাতীয় দুর্যোগ ত্রাণ তহবিলের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও সংস্থাকে ত্রাণ সংগ্রহ ও বিতরণের সমন্বয়ের দায়িত্ব দিয়েছে।

এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য স্পষ্ট—ত্রাণের নামে অনিয়ম ঠেকানো এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দ্রুত প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। বড় ধরনের দুর্যোগে একাধিক উৎস থেকে বিচ্ছিন্নভাবে অর্থ ও ত্রাণ বিতরণ হলে একই এলাকায় অতিরিক্ত সহায়তা পৌঁছানোর বিপরীতে অন্য দুর্গত এলাকা বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকও করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অর্থ ব্যবহারের নিয়মে পরিবর্তন এনেছে। নতুন ব্যবস্থায় দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের চিকিৎসা, উদ্ধার ও ত্রাণে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয় CSR-এর আওতায় গণ্য করা যাবে। এতে বেসরকারি খাতের সম্পদকে জরুরি মানবিক সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

নেপালের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো এই অর্থ ও সহায়তাকে কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়। জরুরি তহবিল, বিদেশি অনুদান, বেসরকারি সহায়তা—সবই প্রয়োজনীয়। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ক্ষয়ক্ষতির নির্ভুল মূল্যায়ন, অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা।

বন্যার পানি নেমে গেলে জরুরি পর্ব শেষ হবে, কিন্তু পুনর্গঠনের কাজ তখনই শুরু হবে। সেই পুনর্গঠন যদি পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ উন্নয়ন কাঠামোকেই পুনরায় তৈরি করে, তাহলে আজকের ব্যয় ভবিষ্যতের আরেক বিপর্যয়ের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। নেপালের জন্য তাই ত্রাণের অর্থ জোগাড়ের পাশাপাশি এখন থেকেই এমন একটি পুনর্গঠন কৌশল তৈরি করা জরুরি, যা শুধু ক্ষতি পূরণ করবে না—পরবর্তী দুর্যোগের ক্ষতিও কমাবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

শত্রুর পেছনে ৩২০ কিলোমিটার উড়ে যাবে ব্রিটিশ সেনা, পিঠে থাকবে ‘উড়ন্ত ব্যাগ’

নেপালের বন্যা মোকাবিলায় অর্থসংস্থান: ত্রাণের পর আসল পরীক্ষা পুনর্গঠন

০৬:৫৩:২৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬

ভোটেকোশি বন্যায় বিপর্যস্ত নেপালের সামনে এখন শুধু উদ্ধার ও ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার প্রশ্ন নয়; একই সঙ্গে দাঁড়িয়ে গেছে বিপুল অর্থসংস্থানের কঠিন বাস্তবতা। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ হিসাব এখনও স্পষ্ট নয়, অথচ দুর্গত মানুষের তাৎক্ষণিক সহায়তা, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো সামলানো এবং পরবর্তী পুনর্বাসনের জন্য দ্রুত অর্থের প্রয়োজন। ফলে দেশটির সরকারকে একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বাজেট পুনর্বিন্যাস, বেসরকারি খাতের সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পথ খুঁজতে হচ্ছে।

নেপালের অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরের বাজেটে আগে থেকেই বরাদ্দ থাকা বিভিন্ন খাত থেকে প্রায় ২০ বিলিয়ন নেপালি রুপি তাৎক্ষণিকভাবে দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্যবহার করা সম্ভব। এসব অর্থ মূলত ত্রাণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ ছিল। অর্থাৎ নতুন করে অর্থ ছাড়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় না গিয়ে সরকার বিদ্যমান বরাদ্দ থেকেই প্রাথমিক প্রয়োজন মেটাতে পারবে।

কিন্তু এখানেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। বন্যার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি এখনও নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে মোট কত অর্থ প্রয়োজন হবে, তারও কোনো নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই। অর্থ মন্ত্রণালয়কে তাই এখন থেকেই অতিরিক্ত সম্পদের সম্ভাব্য উৎস খুঁজতে হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সহায়তার দিকে তাকিয়ে নেপাল

বিপর্যয়ের মাত্রা বিবেচনায় বিদেশি সহায়তা নেপালের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারত, চীন ও বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে উদ্ধার ও পুনর্গঠন সহায়তার বিষয়ে সমন্বয় শুরু করেছে। নেপালের অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন উৎস থেকে জরুরি সহায়তা হিসেবে সর্বোচ্চ ২৫ বিলিয়ন রুপি পর্যন্ত সংগ্রহের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

ভারত তাৎক্ষণিকভাবে কোন কোন ত্রাণসামগ্রী প্রয়োজন, তার তালিকা চেয়েছে এবং কিছু সরবরাহ ইতোমধ্যে পৌঁছেছে। চীনও তাৎক্ষণিক নগদ সহায়তা দিতে সম্মত হয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর এই সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দুর্যোগের প্রথম পর্যায়ে দ্রুত অর্থ ও উপকরণ পাওয়া গেলে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের গতি বাড়ানো সম্ভব।

তবে আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা যেন দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠনের একমাত্র কৌশল না হয়ে ওঠে, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। দুর্যোগের পর বিদেশি অর্থ পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু সেই অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে এবং কোন অবকাঠামো আগে পুনর্গঠন করা হবে—এই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত নেপালকেই নিতে হবে।

দেশীয় সম্পদের সীমাবদ্ধতা

নেপালের সাবেক ন্যাশনাল রিকনস্ট্রাকশন অথরিটির প্রধান গোবিন্দ রাজ পোখরেলের মূল্যায়ন পরিস্থিতির গভীরতা বোঝায়। তাঁর মতে, ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের চেয়েও বড় হতে পারে এবং এত ব্যাপক অবকাঠামো পুনর্গঠন কেবল দেশীয় অর্থে সম্ভব নয়।

এই বাস্তবতা নেপালের জন্য একটি মৌলিক অর্থনৈতিক প্রশ্ন সামনে এনেছে। জরুরি ত্রাণের অর্থ সংগ্রহ করা এক বিষয়, আর ধ্বংস হয়ে যাওয়া রাস্তা, বসতি ও অন্যান্য অবকাঠামো দীর্ঘমেয়াদে পুনর্নির্মাণ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। প্রথমটির জন্য দ্রুত অর্থ জোগাড় করা সম্ভব হলেও দ্বিতীয়টির জন্য প্রয়োজন হতে পারে বহু বছরের পরিকল্পনা ও বড় অঙ্কের বৈদেশিক মূলধন।

বিশেষ করে রাসুয়া অঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতি যদি কিছু বসতিকে নতুন স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন তৈরি করে, তাহলে পুনর্বাসনের ব্যয় আরও বাড়বে। তখন শুধু ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ করলেই হবে না; নতুন যোগাযোগব্যবস্থা, জনসেবা এবং নিরাপদ বসতি গড়ে তোলার প্রশ্নও সামনে আসবে।

উন্নয়ন পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন জরুরি

এই বন্যা নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি উন্নয়ন পরিকল্পনার দুর্বলতাকেও সামনে এনেছে। নদীর তীর ধরে রাস্তা নির্মাণ এবং পরে সেই রাস্তার আশপাশে বসতি গড়ে ওঠার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। দুর্যোগের পর একই ধরনের অবকাঠামো একই জায়গায় পুনর্নির্মাণ করলে পুনরায় বিপর্যয়ের আশঙ্কা থেকেই যাবে।

অতএব পুনর্গঠনকে শুধু আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার প্রকল্প হিসেবে দেখলে চলবে না। কোথায় রাস্তা হবে, কোথায় বসতি নিরাপদ, কোন অবকাঠামো নদী ও পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকি থেকে দূরে রাখা দরকার—এসব প্রশ্নকে উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে আনতে হবে। দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্গঠনকে ভবিষ্যৎ দুর্যোগের ঝুঁকি কমানোর সুযোগ হিসেবেও ব্যবহার করতে হবে।Global aid heads to Nepal after devastating flash flood | Reuters

অর্থসংগ্রহে স্বচ্ছতার প্রয়োজন

নেপাল সরকার ত্রাণ সংগ্রহ ও বিতরণে ‘ওয়ান-ডোর’ নীতি চালু করেছে। ব্যক্তি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, দাতা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোকে সরকারি জাতীয় দুর্যোগ ত্রাণ তহবিলের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও সংস্থাকে ত্রাণ সংগ্রহ ও বিতরণের সমন্বয়ের দায়িত্ব দিয়েছে।

এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য স্পষ্ট—ত্রাণের নামে অনিয়ম ঠেকানো এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দ্রুত প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। বড় ধরনের দুর্যোগে একাধিক উৎস থেকে বিচ্ছিন্নভাবে অর্থ ও ত্রাণ বিতরণ হলে একই এলাকায় অতিরিক্ত সহায়তা পৌঁছানোর বিপরীতে অন্য দুর্গত এলাকা বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকও করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অর্থ ব্যবহারের নিয়মে পরিবর্তন এনেছে। নতুন ব্যবস্থায় দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের চিকিৎসা, উদ্ধার ও ত্রাণে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয় CSR-এর আওতায় গণ্য করা যাবে। এতে বেসরকারি খাতের সম্পদকে জরুরি মানবিক সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

নেপালের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো এই অর্থ ও সহায়তাকে কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়। জরুরি তহবিল, বিদেশি অনুদান, বেসরকারি সহায়তা—সবই প্রয়োজনীয়। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ক্ষয়ক্ষতির নির্ভুল মূল্যায়ন, অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা।

বন্যার পানি নেমে গেলে জরুরি পর্ব শেষ হবে, কিন্তু পুনর্গঠনের কাজ তখনই শুরু হবে। সেই পুনর্গঠন যদি পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ উন্নয়ন কাঠামোকেই পুনরায় তৈরি করে, তাহলে আজকের ব্যয় ভবিষ্যতের আরেক বিপর্যয়ের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। নেপালের জন্য তাই ত্রাণের অর্থ জোগাড়ের পাশাপাশি এখন থেকেই এমন একটি পুনর্গঠন কৌশল তৈরি করা জরুরি, যা শুধু ক্ষতি পূরণ করবে না—পরবর্তী দুর্যোগের ক্ষতিও কমাবে।