শত্রুপক্ষের সীমানার অনেক ভেতরে সেনা পাঠানোর জন্য প্রচলিত বিমান, হেলিকপ্টার কিংবা প্যারাসুটের ওপর নির্ভরতা কমাতে নতুন সামরিক প্রযুক্তি নিয়ে এগোচ্ছে যুক্তরাজ্য। পিঠে বহন করা যায় এমন শক্তিচালিত প্যারাগ্লাইডার ব্যবহার করে ব্রিটিশ সেনাদের শত্রুর পেছনে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নতুন এই উড়ন্ত ব্যবস্থা একবার উড্ডয়নের পর সর্বোচ্চ ২০০ মাইল বা প্রায় ৩২০ কিলোমিটার পর্যন্ত পথ পাড়ি দিতে পারবে।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই প্রকল্পে প্রায় ৬০ লাখ পাউন্ড বিনিয়োগ করছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে রয়্যাল মেরিন ও প্যারাসুট রেজিমেন্টের সদস্যদের নিয়ে এর পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। সামরিক বাহিনীর বিশেষ অভিযানে দ্রুত, নীরব এবং তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমানভাবে সেনা প্রবেশ করানোর নতুন পথ তৈরি করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
বিমান ছাড়াই শত্রুর এলাকায় প্রবেশ
প্রচলিত প্যারাসুট অভিযানে সেনাদের প্রথমে পরিবহন বিমানে করে নির্দিষ্ট এলাকার ওপর নিয়ে যেতে হয়। এরপর বিমান থেকে তাদের নামানো হয়। নতুন প্যারাগ্লাইডারের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়ার প্রয়োজন নেই।
সেনারা বড় ব্যাগের মতো একটি বাক্সে পুরো যন্ত্রটি বহন করতে পারবেন। নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে সেটি আট মিনিটেরও কম সময়ে সংযোজন করা যাবে। এমনকি সম্পূর্ণ অন্ধকারেও যন্ত্রটি প্রস্তুত করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এরপর মাটিতে দৌড়ে বা পায়ে গতি তৈরি করে উড্ডয়ন শুরু করা যাবে।
এর অর্থ হলো, কোনো রানওয়ে, হেলিকপ্টার কিংবা পরিবহন বিমানের সরাসরি সহায়তা ছাড়াই ছোট একটি সেনাদল নিজেদের অবস্থান থেকে আকাশপথে যাত্রা শুরু করতে পারবে।
২০০ মাইল পর্যন্ত উড়তে সক্ষম
নতুন ব্যবস্থাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর দীর্ঘপথ পাড়ি দেওয়ার ক্ষমতা। নির্মাতাদের তথ্য অনুযায়ী, শক্তিচালিত প্যারাগ্লাইডারটি সর্বোচ্চ ২০০ মাইল পর্যন্ত উড়তে পারে।
এতে একজন সেনা শরীরের সুরক্ষা সরঞ্জাম, রাতের অন্ধকারে দেখার যন্ত্র এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম বহন করতে পারবেন। প্রয়োজনে অস্ত্র সংযুক্ত করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
যন্ত্রটির কাঠামো তৈরি করা হয়েছে টাইটানিয়াম দিয়ে। ফলে এটি হালকা ও শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি সামরিক ব্যবহারের জন্য উপযোগী বলে নির্মাতারা দাবি করছেন।
রাডার ও শব্দে শনাক্ত করা কঠিন
প্রযুক্তিটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর গোপনীয়ভাবে চলাচলের সক্ষমতা। নির্মাতাদের দাবি, প্যারাগ্লাইডারটির শব্দ, দৃশ্যমানতা এবং রাডারে ধরা পড়ার মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম রাখার জন্য নকশা করা হয়েছে।
এর ফলে রাতের বেলায় শত্রুপক্ষের নজর এড়িয়ে নির্দিষ্ট এলাকায় পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে গোয়েন্দা তৎপরতা, বিশেষ অভিযান, শত্রুর অবস্থান পর্যবেক্ষণ এবং দুর্গম এলাকায় ছোট সেনাদল প্রবেশ করানোর মতো কাজে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে বাস্তবে যুদ্ধক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা কতটা হবে, প্রতিকূল আবহাওয়া, শত্রুর নজরদারি ও অন্যান্য ঝুঁকির মধ্যে এটি কতটা নিরাপদ থাকবে—এসব বিষয় পরীক্ষার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
রয়্যাল মেরিন ও প্যারাসুট রেজিমেন্টের পরীক্ষা
প্রযুক্তিটি পরীক্ষা করার জন্য ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত সদস্যদের বেছে নেওয়া হয়েছে। রয়্যাল মেরিন এবং প্যারাসুট রেজিমেন্ট আগামী কয়েক মাসের মধ্যে নতুন ব্যবস্থাটির পরীক্ষা চালাবে।
এই পরীক্ষার মাধ্যমে শুধু প্যারাগ্লাইডার কত দূর উড়তে পারে তা নয়, বরং বাস্তব সামরিক পরিস্থিতিতে একজন সেনাকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ কতটা কার্যকরভাবে নির্দিষ্ট এলাকায় পৌঁছে দেওয়া যায়, সেটিও যাচাই করা হবে।
প্রচলিত আকাশপথে সেনা নামানোর তুলনায় এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য সুবিধা হলো, সেনাদের আগে থেকেই বড় পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে না। ছোট দল নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে যাত্রা শুরু করতে পারবে।
মাত্র ১১ কর্মীর প্রতিষ্ঠানের বড় সাফল্য
এই প্রযুক্তি তৈরি করেছে উইল্টশায়ারভিত্তিক ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকক্রো। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৩ সালে মাত্র কয়েকজন কর্মী নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। বর্তমানে তাদের কর্মীর সংখ্যা বেড়ে ১১ হয়েছে।
কোম্পানিটি যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে একাধিক প্রকল্পে সহায়তা পেয়েছে। একটি প্রতিরক্ষা উদ্ভাবন ঋণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগও পেয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী স্যাম ওয়েডগুডের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মূল প্রযুক্তি উন্নয়নের পর্যায় থেকে মাত্র দুই বছরের মধ্যে এটি ক্রয় ও কার্যকর ব্যবহারের পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি বাণিজ্যিকীকরণ সহায়তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ এই দ্রুত অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে তিনি জানান।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা শিল্পে ছোট প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব বাড়ছে
ব্ল্যাকক্রোর সাফল্যকে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা শিল্পে একটি বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকার এখন বড় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ছোট ও নতুন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকেও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত করতে চাইছে।
প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি ও শিল্পবিষয়ক মন্ত্রী লুক পোলার্ড বলেছেন, ছোট ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানকে ধারণা তৈরির পর্যায় থেকে সামরিক ব্যবহারের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে দেশের প্রতিরক্ষা সরবরাহব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। একই সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্রিটিশ বাহিনীকে আধুনিক প্রযুক্তিগত সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যও রয়েছে।
ব্ল্যাকক্রো বর্তমানে যুক্তরাজ্য ও ন্যাটোর মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে তিনটি প্রধান চুক্তির আওতায় কাজ করছে বলে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা গেছে। প্রতিষ্ঠানটির তৈরি প্রযুক্তি ইতোমধ্যে কার্যকর ব্যবহারের পর্যায়ে রয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
যুদ্ধের ধরন বদলাচ্ছে
আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ছোট, দ্রুতগতির এবং সহজে বহনযোগ্য প্রযুক্তির গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। বড় বিমান বা হেলিকপ্টার অনেক সময় শত্রুর রাডার ও অন্যান্য নজরদারি ব্যবস্থায় সহজে শনাক্ত হতে পারে। ফলে ছোট আকারের, কম শব্দের এবং সীমিত অবকাঠামোতে ব্যবহারযোগ্য যান বিশেষ অভিযানে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
পিঠে বহনযোগ্য প্যারাগ্লাইডার সেই পরিবর্তনেরই একটি উদাহরণ। একজন সেনা নিজেই যন্ত্রটি বহন করে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যেতে পারবেন, অল্প সময়ে সেটি প্রস্তুত করতে পারবেন এবং এরপর আকাশপথে দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতে পারবেন।
বিশেষ করে এমন এলাকায় যেখানে রানওয়ে নেই, সড়ক যোগাযোগ সীমিত কিংবা হেলিকপ্টার পাঠানো ঝুঁকিপূর্ণ—সেখানে এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে।
ন্যাটোর মিত্রদের জন্যও সম্ভাবনা
ব্ল্যাকক্রোর প্রযুক্তি শুধু ব্রিটিশ বাহিনীর জন্য সীমাবদ্ধ থাকছে না। প্রতিষ্ঠানটির ন্যাটোর মিত্র দেশগুলোর সঙ্গেও চুক্তি রয়েছে বলে প্রকাশিত তথ্য জানাচ্ছে। অর্থাৎ সফলভাবে পরীক্ষিত হলে ভবিষ্যতে এই ধরনের ব্যবস্থা ন্যাটোর অন্যান্য সদস্য দেশের বিশেষ বাহিনীতেও ব্যবহৃত হতে পারে।
এটি যুক্তরাজ্যের জন্য আরও একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ক্ষেত্রে বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতার পাশাপাশি নিজস্ব প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ছোট দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত সামরিক বাজারে নিয়ে আসা সেই পরিকল্পনারই অংশ।
প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়েও বাড়ছে চাপ
নতুন প্রযুক্তির এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন যুক্তরাজ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো নিয়ে রাজনৈতিক চাপ রয়েছে। সরকার ন্যাটোর প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য প্রতিরক্ষা খাতে আরও অর্থ ব্যয়ের পথরেখা তৈরির কথা বলেছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতে মোট দেশজ উৎপাদনের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যয়ের লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথ নির্ধারণ করা হবে। একই পথে ৩ শতাংশে পৌঁছানোর জন্যও একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণের কথা রয়েছে।
ফলে নতুন প্যারাগ্লাইডার প্রকল্পকে শুধু একটি সামরিক সরঞ্জাম কেনার উদ্যোগ হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। এটি একই সঙ্গে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা শিল্পকে দেশীয় প্রযুক্তিনির্ভর করার এবং ছোট উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠানকে সামরিক সরবরাহব্যবস্থায় দ্রুত নিয়ে আসার প্রচেষ্টারও অংশ।
যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন কৌশলের দরজা
ব্রিটিশ সেনাদের জন্য এই প্যারাগ্লাইডার শেষ পর্যন্ত কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, তা নির্ভর করবে আসন্ন পরীক্ষার ফলাফলের ওপর। তবে ধারণাটি ইতোমধ্যে প্রচলিত সেনা পরিবহন ব্যবস্থার বাইরে একটি নতুন বিকল্প তৈরি করেছে।
একটি বড় বিমান বা হেলিকপ্টারের পরিবর্তে একজন বা ছোট একটি দল নিজেদের বহন করা যন্ত্র দিয়ে আকাশপথে শত্রুপক্ষের পেছনে পৌঁছাতে পারলে বিশেষ অভিযানের ধরনই বদলে যেতে পারে।
মাত্র কয়েক মিনিটে প্রস্তুত করা যায়, পিঠে বহন করা যায় এবং দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে—এমন সামরিক যান ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। ব্রিটেনের সামরিক বাহিনী আগামী মাসগুলোতে যে পরীক্ষা চালাবে, তার ফলাফলই নির্ধারণ করবে এই ‘উড়ন্ত ব্যাগ’ বাস্তব যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠবে কি না।
ব্রিটিশ সেনাদের জন্য তৈরি নতুন শক্তিচালিত প্যারাগ্লাইডার সর্বোচ্চ ২০০ মাইল বা প্রায় ৩২০ কিলোমিটার উড়ে শত্রুপক্ষের পেছনে পৌঁছাতে পারবে। আট মিনিটেরও কম সময়ে প্রস্তুত করা যায় এমন এই প্রযুক্তির পরীক্ষা করবে রয়্যাল মেরিন ও প্যারাসুট রেজিমেন্ট।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















