যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের অ্যামিশ অধ্যুষিত এলাকায় হাম বা মিজেলসের সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এমন শিশু ও মানুষের মধ্যে, যারা বয়স, শারীরিক অবস্থা কিংবা দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে সহজে টিকা নিতে পারেন না।
চলতি বছর পেনসিলভানিয়ায় প্রায় ৪০০টি হাম সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এর প্রায় অর্ধেকই ল্যাঙ্কাস্টার কাউন্টিতে। মঙ্গলবার রাজ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, ওই কাউন্টিতে হাম আক্রান্ত দুজনের মৃত্যু হয়েছে। গত ৩৫ বছরের মধ্যে সেখানে হামজনিত মৃত্যুর এটিই প্রথম ঘটনা।
হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে হাম সংক্রমণের আশঙ্কা
ড্যানভিলের একটি হাসপাতালে প্রায় দুই মাস ধরে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ব্রিটানি নিকোল স্পোনেনবার্গের অপরিণত শিশুটির ফুসফুস ও পরিপাকতন্ত্র স্বাভাবিকভাবে কাজ করার উপযোগী হওয়ার জন্য চিকিৎসা চলছিল।
কিন্তু সম্প্রতি চিকিৎসকের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, হাসপাতালে থাকাকালীন তার সন্তান হাম রোগের সংস্পর্শে এসেছে। গত ১৪ থেকে ১৭ আগস্টের মধ্যে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ওই নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে গিয়েছিলেন। ১৭ আগস্ট তার জ্বর ও শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেয় এবং পরদিন পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়।
স্পোনেনবার্গকে বিষয়টি জানানো হয় আরও তিন দিন পর। এরই মধ্যে তার সন্তানকে বাড়ির কাছাকাছি অন্য একটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছিল।
খবরটি শুনে তিনি হতবাক হয়ে যান। কারণ মাত্র কয়েক সপ্তাহ বয়সী ওই শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এখনও অত্যন্ত দুর্বল।
চিকিৎসকেরা তাকে জানিয়েছেন, শিশুটির হাম আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে কম। তবে সতর্কতা হিসেবে তাকে অতিরিক্ত প্রতিরোধমূলক ওষুধ দিতে হয়েছে। শিশুটিকে এমন একটি আলাদা কক্ষে রাখা হয়েছে, যেখানে বিশেষ বায়ু চলাচল ব্যবস্থা রয়েছে। সম্ভাব্য সংক্রমণের ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হতে প্রায় ২৮ দিন সময় লাগতে পারে।
স্পোনেনবার্গের ভাষায়, এত অল্প বয়সে শিশুটিকে এমন একটি চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে, যা সাধারণ পরিস্থিতিতে তার প্রয়োজন হওয়ার কথা ছিল না।
অপরিণত শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেওয়া শিশুদের হামসহ বিভিন্ন সংক্রমণের বিরুদ্ধে স্বাভাবিক প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকে।
শিশুর জন্মের আগে গর্ভাবস্থার শেষ দিকে মায়ের শরীর থেকে কিছু প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি শিশুর শরীরে পৌঁছায়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের অনেক আগে জন্ম নেওয়া শিশুরা সেই সুরক্ষা পুরোপুরি পাওয়ার সুযোগ পায় না।
এ ছাড়া তাদের শরীরে বিভিন্ন চিকিৎসা-যন্ত্র ব্যবহার করতে হয় এবং অতি অপরিণত শিশুদের ত্বকও তখন জীবাণু ঠেকানোর কার্যকর প্রাকৃতিক বাধা হিসেবে পুরোপুরি তৈরি থাকে না।
পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের হাম হলে নিউমোনিয়া ও মস্তিষ্কে প্রদাহের মতো গুরুতর জটিলতার ঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি।
একের পর এক হাসপাতালে সংক্রমণের আশঙ্কা
শুধু ড্যানভিলের হাসপাতাল নয়, পেনসিলভানিয়ার আরও কয়েকটি হাসপাতালেও হাম আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার ঘটনা ঘটেছে।
পেন স্টেটের একটি শিশু হাসপাতালে জানানো হয়েছে, ১৭ আগস্ট একজন হাম আক্রান্ত ব্যক্তি হাসপাতালের প্রধান প্রবেশ এলাকায় প্রায় আড়াই ঘণ্টা অবস্থান করেছিলেন। পরে ওই ব্যক্তির হাম শনাক্ত হয়।
পিটসবার্গের একটি শিশু হাসপাতালের জরুরি বিভাগেও সাম্প্রতিক সময়ে হাম সংস্পর্শের ঘটনা ঘটেছে।
ল্যাঙ্কাস্টারের চিকিৎসকেরা এখন মানুষকে হাসপাতাল বা জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্রে যাওয়ার আগে ফোন করার পরামর্শ দিচ্ছেন। কারও হাম হয়েছে বলে সন্দেহ থাকলে আগে থেকে জানালে চিকিৎসাকর্মীরা তাকে অন্য রোগীদের থেকে আলাদা রেখে নিরাপদে পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করতে পারেন।
এর ফলে বিশেষ করে নবজাতক, অপরিণত শিশু এবং দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার রোগীদের সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
রোগীর গাড়ি চালাতেও ভয় পাচ্ছেন স্থানীয় নারী
ল্যাঙ্কাস্টার এলাকার বাসিন্দা ৫০ বছর বয়সী কিম্বারলি রাইখেনবাখও সংক্রমণের আশঙ্কায় নিজের কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন।
স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে কারাগার বিভাগের কর্মকর্তার চাকরি ছাড়ার পর কয়েক বছর ধরে তিনি অ্যামিশ সম্প্রদায়ের মানুষের যাতায়াতে গাড়ি চালিয়ে কিছু আয় করতেন।
কিন্তু সম্প্রতি তিনি ও তার টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত দীর্ঘদিনের সঙ্গী আলাদাভাবে এমন কয়েকজন যাত্রী পরিবহন করেন, যারা অসুস্থ ছিলেন অথবা হাম আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছিলেন।
এক যাত্রী তাকে জানিয়েছিলেন, তার পরিবারের প্রায় সবাই হাম আক্রান্ত। তাই তিনি নিজে অসুস্থ হয়ে বিছানা থেকে উঠতে না পারার আগেই বাড়ির প্রয়োজনীয় খাবার কিনে নিতে চাইছিলেন।
আরেকদিন এক যাত্রী গাড়িতে উঠে কাশি ও হাঁচি দিতে থাকেন। ওই নারী দাবি করেছিলেন, তার স্রেফ ঠান্ডা লেগেছে এবং তিনি সুস্থ হয়ে উঠছেন। কিন্তু রাইখেনবাখ তা বিশ্বাস করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত তিনি পরবর্তী সব যাত্রা বাতিল করে দেন।
তার আশঙ্কা, নিজে বা তার সঙ্গী অসুস্থ হয়ে পড়লে পরিবারের দেখাশোনা করা কঠিন হয়ে যাবে।
টিকার হার কমে যাওয়াই বড় উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রে ২০০০ সালে হাম নির্মূল হয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। এতদিন দেশটির বেশির ভাগ এলাকায় হাম ঠেকানোর মতো উচ্চমাত্রার টিকাদান বজায় ছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতি বদলেছে। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ভিত্তিতে টিকা না নেওয়ার সুযোগ বাড়ায় অনেক শিশুই প্রয়োজনীয় টিকা ছাড়াই বিদ্যালয়ে যেতে পারছে।
সরকারি পর্যায়ে টিকার নিরাপত্তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশের ঘটনাও টিকাদানে অনীহা বাড়িয়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হাম, মাম্পস ও রুবেলা প্রতিরোধের সম্মিলিত টিকাকে তিনটি আলাদা টিকায় ভাগ করার উপায় খুঁজে দেখতে স্বাস্থ্য বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছেন। একই সময়ে তিনি টিকা ও অটিজমের মধ্যে সম্পর্ক থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে বহু বৈজ্ঞানিক গবেষণায় টিকা ও অটিজমের মধ্যে কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
ল্যাঙ্কাস্টারে টিকাদানের হার নিরাপদ সীমার নিচে
সাম্প্রতিক সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাষ্ট্রের কিন্ডারগার্টেন পর্যায়ের শিশুদের ৪ দশমিক ২ শতাংশ অন্তত একটি বাধ্যতামূলক টিকা থেকে অব্যাহতি পেয়েছে। নয়টি অঙ্গরাজ্য ছাড়া প্রায় সব জায়গাতেই এ ধরনের অব্যাহতি বেড়েছে। প্রায় অর্ধেক অঙ্গরাজ্যে টিকা অব্যাহতির হার ৫ শতাংশের বেশি।
ল্যাঙ্কাস্টার কাউন্টারের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। গত বছর সেখানে কিন্ডারগার্টেনের মাত্র প্রায় ৮৮ শতাংশ এবং সপ্তম শ্রেণির ৮৩ শতাংশ শিক্ষার্থী হামবিরোধী টিকাদানে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ছিল।
জনসংখ্যার অন্তত ৯৫ শতাংশ টিকাপ্রাপ্ত থাকলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া কঠিন হয়ে যায় এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠী একটি সুরক্ষা বলয় পায়। কিন্তু ল্যাঙ্কাস্টারে সেই হার অনেক নিচে।
কাউন্টির বিভিন্ন বিদ্যালয়ের মধ্যে ব্যবধানও বড়। কিছু সরকারি বিদ্যালয়ে প্রায় সব শিক্ষার্থী টিকাপ্রাপ্ত হলেও কিছু মেনোনাইট ও খ্রিস্টান বিদ্যালয়ে হাম, মাম্পস ও রুবেলার টিকাদানের হার ৫০ শতাংশেরও কম।
সবচেয়ে দুর্বলদের জন্য তৈরি হচ্ছে কঠিন পরিস্থিতি
অ্যামিশ ও মেনোনাইট সম্প্রদায়ের সবাই টিকা প্রত্যাখ্যান করেন না। তবে তাদের মধ্যে সামগ্রিক টিকাদানের হার সাধারণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় কম।
ফলে সংক্রমণ যখন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, তখন শুধু টিকা না নেওয়া মানুষই ঝুঁকিতে পড়েন না। নবজাতক, অপরিণত শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল—তারাও নিজেদের অজান্তে সংক্রমণের মুখোমুখি হন।
হাসপাতালগুলো তাই দর্শনার্থী প্রবেশে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করছে। ড্যানভিলের হাসপাতালটিতে এখন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে শুধু বাবা-মা বা আইনগত অভিভাবকদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। তাদের হামজনিত কোনো উপসর্গ থাকা চলবে না এবং প্রবেশের আগে মুখে অস্ত্রোপচারের মাস্ক ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব ব্যবস্থা নেওয়া সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না। কারণ গুরুতর অসুস্থ শিশুর পাশে বাবা-মায়ের উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সংক্রমণ বাড়তে থাকায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের সুরক্ষায় সাময়িকভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
রাইখেনবাখের মতো স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, অনেক মানুষ হামকে এখনও যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন না। অথচ একটি সংক্রামক রোগ যখন টিকাবিহীন জনগোষ্ঠীর মধ্যে দ্রুত ছড়াতে শুরু করে, তখন তার প্রভাব হাসপাতালের সবচেয়ে অসহায় রোগীদের ওপরও গিয়ে পড়ে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















