পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ইমরান খানের শারীরিক অবস্থা ও কারাগারে তাঁর জীবনযাপন নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন তাঁর দুই ছেলে সুলেমান খান ও কাসিম খান। তাঁদের অভিযোগ, ইমরানকে দীর্ঘ সময় একাকী বন্দি রাখা হচ্ছে, পর্যাপ্ত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না এবং কারাগারের পরিবেশও অত্যন্ত কঠিন। তাঁদের আশঙ্কা, ইমরানের জীবন এখন গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
সম্প্রতি সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক ও ধারাভাষ্যকার মাইকেল আথারটনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ইমরানের দুই ছেলে তাঁদের বাবার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন। লর্ডসে ইংল্যান্ড ও পাকিস্তানের দ্বিতীয় টেস্ট চলাকালে ২৭ আগস্ট সাক্ষাৎকারটি প্রচারিত হয়।
এক চোখের দৃষ্টিশক্তি হারানোর আশঙ্কা
কাসিম খান জানান, তাঁর বাবা একটি চোখের প্রায় ৮০ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। সম্প্রতি ইমরানকে চোখে কালো পট্টি বা চোখ ঢাকার কাপড় পরা অবস্থায়ও দেখা গেছে বলে জানান তিনি।
কাসিম বলেন, বাবার শারীরিক অবস্থার অবনতি তাঁদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইমরান সাধারণত অত্যন্ত শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে পরিচিত। এমনকি বন্দুকের মুখে পড়লেও তাঁকে বিচলিত হতে দেখা যায়নি। তাই তাঁকে দৃশ্যত মানসিক চাপের মধ্যে দেখা পরিবারের জন্য আরও বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দিনে ২৩ ঘণ্টার বেশি একা থাকার অভিযোগ
ইমরানের ছেলেদের দাবি, তাঁদের বাবাকে প্রতিদিন ২৩ ঘণ্টারও বেশি সময় একটি ছোট কক্ষে একা রাখা হচ্ছে। তাঁর কাছে বইসহ প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসেরও সীমিত সুযোগ রয়েছে। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও তাঁর কক্ষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেই বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
কাসিমের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে ইমরানের বন্দিজীবনের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। তাঁকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হচ্ছে। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগও অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়েছে।
কাসিম আরও বলেন, তাঁর বাবা কারাগারে থাকা অন্যান্য রাজনৈতিক বন্দির মৃত্যু বা হত্যার ঘটনাগুলোর সঙ্গে নিজের বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইমরান মনে করছেন, পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন বেশি ভয়াবহ।
‘তাকে চুপ করিয়ে রাখার চেষ্টা’
কাসিমের অভিযোগ, ইমরানের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের আচরণ এখন আর কোনো সুস্পষ্ট কৌশলের অংশ বলে মনে হচ্ছে না। বরং তাঁকে যতটা সম্ভব দীর্ঘ সময় বন্দি রেখে নীরব করে রাখার চেষ্টা চলছে বলে তাঁদের ধারণা।
তিনি বলেন, বাবার সঙ্গে সর্বশেষ যখন তাঁদের খালা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের কথা বলার সুযোগ হয়েছিল, তখন ইমরান জানিয়েছিলেন যে কারাগারের পরিস্থিতি সাম্প্রতিক সময়ে মারাত্মকভাবে খারাপ হয়েছে।
ইমরানের ছেলেদের বক্তব্যে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে তাঁর চিকিৎসা। তাঁদের দাবি, যথাযথ চিকিৎসা ও স্বাধীন চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণের সুযোগ না পেলে তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হতে পারে।
হাসপাতালে নেওয়ার কথা থাকলেও ফের কারাগারে
সুলেমান খান জানান, আদালতের নির্দেশের পর তাঁরা আশা করেছিলেন, তাঁদের বাবাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য একটি সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয় এবং এরপর আবার কারাগারে পাঠানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সুলেমানের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি কর্মকর্তারা প্রায় এক ঘণ্টা ইমরানকে পরীক্ষা করে তাঁকে ভালো আছেন বলে জানান। এরপর তাঁকে স্বাধীন চিকিৎসা সুবিধা থাকা শিফা হাসপাতালে নেওয়ার কথা বলা হলেও তা করা হয়নি।
তিনি দাবি করেন, ইমরানকে পরীক্ষা করার জন্য চিকিৎসক, তাঁর চিকিৎসক খালা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁদের সঙ্গে দেখা না করিয়েই ইমরানকে সরাসরি কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
বাবাকে দেখতে পাকিস্তানে যাওয়ার ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত
ইমরানের সঙ্গে দেখা করতে পাকিস্তানে যাওয়ার চেষ্টা করছেন সুলেমান ও কাসিম। তবে তাঁদের দাবি, পাকিস্তানে প্রবেশের জন্য তাঁদের ভিসা ‘কারিগরি কারণ’ দেখিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছে।
তারপরও বাবার শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে তাঁরা পাকিস্তানে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন। সেখানে গিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হতে পারে—এমন আশঙ্কা থাকলেও বাবাকে নিজের চোখে দেখার সুযোগ পাওয়াকে তাঁরা বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন।
সুলেমান বলেন, পরিবারের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। তাঁদের আশঙ্কা, ইমরানের চিকিৎসা ও কারাবন্দিত্ব নিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন।
আবারও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
ইমরান খানের চিকিৎসা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আদালতের নির্দেশের পর তাঁকে চিকিৎসা পরীক্ষার জন্য একটি সরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাঁর ছেলেদের বক্তব্য অনুযায়ী, সেই পরীক্ষা তাঁর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট ছিল না।
প্রায় তিন বছর ধরে কারাগারে থাকা ইমরান খান পাকিস্তানের রাজনীতিতে এখনও অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি নাম। তাঁর কারাবন্দিত্ব, স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসা নিয়ে পরিবারের অভিযোগ নতুন করে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও কারাগারে রাজনৈতিক বন্দিদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন সামনে এনেছে।
পরিবারের পক্ষ থেকে এখন মূল দাবি—ইমরান খানের শারীরিক অবস্থা স্বাধীন চিকিৎসকদের মাধ্যমে যথাযথভাবে পরীক্ষা করা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং তাঁর সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ ও সাক্ষাতের সুযোগ বাড়ানো।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















