নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পর মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৭৯ জনে দাঁড়িয়েছে। প্রায় ১ হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ। এর মধ্যেই চীন সীমান্তবর্তী বিধ্বস্ত উপত্যকাগুলোতে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় জীবিতদের সন্ধান ও উদ্ধারকাজ আরও জটিল হয়ে পড়েছে। বুধবারের দুর্যোগে সৃষ্ট ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে নতুন প্লাবনের ঝুঁকি, যা উদ্ধারকারীদের জন্য পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
নতুন প্লাবনের আশঙ্কায় উদ্ধারকাজে বাড়ছে ঝুঁকি
শুক্রবার নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বিধ্বস্ত এলাকাগুলোর নদীতে কাদামিশ্রিত পানির প্রবাহ সামান্য বাড়ার খবর পায়। ঝুঁকি দেখা দিলে উদ্ধার ও ত্রাণকর্মীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ট্রিশুলি বাজারেও পুলিশ মাইকিং করে মানুষকে উঁচু এলাকায় চলে যেতে সতর্ক করে। পরে অনেকে একটি উঁচু মন্দির চত্বরে আশ্রয় নেন।
চীনের সীমান্তবর্তী এলাকায় ভূমিধসের কারণে তৈরি হওয়া একটি ব্যারিয়ার লেক নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, হ্রদটি ভেঙে পড়ার ঝুঁকি ধীরে ধীরে কমেছে এবং আগের দিনের তুলনায় পানির উচ্চতা ৩০ ফুটের বেশি কমেছে। তবে আগামী তিন দিনের বৃষ্টিতে হ্রদটির পানির পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
৩৭০০ জনের বেশি উদ্ধার, তবু প্রায় ১ হাজার নিখোঁজ
নেপালে এ পর্যন্ত ৩৭০০ জনের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতায় ৩০ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন রয়েছে। তবে ধ্বংস হওয়া সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থার কারণে দুর্গম এলাকায় পৌঁছানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
রাশুয়া জেলায় নির্মাণাধীন একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আটকে পড়া মানুষদেরও উদ্ধার করা হয়েছে। কাদার ভেতর থেকে তাদের হাত ধরে বের করে আনার ভিডিও প্রকাশ করেছে নেপাল সরকার। তবে টানেলের ভেতরে আরও কেউ আটকে আছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে অনুসন্ধান চলছে।
সড়ক-সেতু ধ্বংস, চাপে পড়েছে জরুরি সরবরাহ
বন্যায় নেপালের প্রায় ২৫ মাইল সড়ক নিশ্চিহ্ন হয়েছে। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর প্রায় আড়াই লাখ মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। অন্তত ৪০টি ঝুলন্ত সেতু ধ্বংস হয়েছে। ফোন ও মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং বিদ্যুৎ সরবরাহও অনেক এলাকায় বন্ধ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথম এক-দুই দিনে হেলিকপ্টার উদ্ধার ও সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা যথেষ্ট নয়। দুর্গম জনগোষ্ঠীর কাছে খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রী পৌঁছাতে সড়ক যোগাযোগ পুনরুদ্ধার জরুরি হয়ে উঠেছে। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নতুন পথ তৈরি এবং পরে অস্থায়ী সেতু স্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে।
জলবিদ্যুৎ খাতেও বড় আঘাত
বন্যায় ১৪টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে দেশের মোট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ১০ শতাংশ সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সীমিত প্রাপ্যতা জরুরি সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
নেপাল বিদেশি উদ্ধার সহায়তা নেয়নি
নেপাল বিদেশি উদ্ধারকারী দলের সহায়তা প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী দিয়েই অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজ চালানোর সক্ষমতা তাদের রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনে বিদেশি সহায়তা চাওয়া হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক রেডক্রসের প্রাথমিক হিসাবে, নেপালে প্রায় ৯৩ হাজার মানুষের সহায়তা প্রয়োজন। দুর্গম কিছু এলাকায় এখনো হেলিকপ্টার ছাড়া পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
আগাম সতর্কতা কেন ব্যর্থ হলো?
এই দুর্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রচলিত বন্যা সতর্কতা ব্যবস্থা এমন আকস্মিক বিপর্যয় মোকাবিলায় কতটা কার্যকর—সেই প্রশ্ন। বিজ্ঞানীদের মতে, উচ্চ পার্বত্য এলাকায় ভূমিধস ও হিমবাহ ধসের সম্মিলিত প্রভাবে এই দ্রুতগতির বন্যা তৈরি হয়েছে। নেপালের প্রচলিত নদী ও হ্রদের পানি মাপার ব্যবস্থা সাধারণত ধীরে বাড়তে থাকা পানির স্তর শনাক্ত করতে পারে; কিন্তু পাহাড়ের কোনো অংশ হঠাৎ ধসে পড়ার মতো ঘটনা আগে থেকে শনাক্ত করা অনেক কঠিন।
নেপালে ২ হাজার ৭০টি হিমবাহ-হ্রদ রয়েছে, যার ২১টি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ, রিমোট সেন্সিং এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় উন্নত নজরদারি ভবিষ্যতে ঝুঁকি শনাক্ত করতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে বন্যাপ্রবণ এলাকায় নির্মাণ এড়িয়ে চলা এবং স্পষ্টভাবে চিহ্নিত ও জনসাধারণের পরিচিতি থাকা সরিয়ে নেওয়ার পথ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
তিব্বতেও ভয়াবহ পরিস্থিতি
নেপালের পাশাপাশি তিব্বতেও দুর্যোগের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। চীনের হিসাবে সেখানে অন্তত পাঁচজনের মৃত্যু এবং ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ধ্বংস হওয়া সড়ক, ঘন কাদা ও নতুন বন্যার আশঙ্কার মধ্যে চীনা উদ্ধারকারীরাও দুর্গম সীমান্ত এলাকায় পৌঁছাতে লড়াই করছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















