ইরানের সঙ্গে ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা ক্ষয় হয়েছে—এমন মূল্যায়ন করছে রাশিয়া। মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মনে করছেন, এই পরিস্থিতি মস্কোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ও ইউরোপীয় মিত্রদের বিরুদ্ধে আরও জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।
এই গোয়েন্দা মূল্যায়নের মধ্যেই মঙ্গলবার গোপন সফরে মস্কো যান মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পরিচালক জন র্যাটক্লিফ। ২০২১ সালের শেষ দিকে তৎকালীন সিআইএ পরিচালক উইলিয়াম জে. বার্নসের সফরের পর র্যাটক্লিফই প্রথম দায়িত্বে থাকা সিআইএ প্রধান হিসেবে মস্কো গেলেন।
রুশ গোয়েন্দা প্রধানের সঙ্গে গোপন বৈঠক
র্যাটক্লিফের মস্কো সফরের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, রুশ পররাষ্ট্র গোয়েন্দা সংস্থা এসভিআরের প্রধান সের্গেই নারিশকিনের সঙ্গে বৈঠকে সিআইএ পরিচালক ইউক্রেনে যুদ্ধ আরও জোরদার না করার জন্য মস্কোকে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, রাশিয়া যদি বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে সেটি উল্টো ফল দিতে পারে।
র্যাটক্লিফের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নারিশকিন। তিনি এটিকে ‘অস্বাভাবিক কিছু নয়’ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে ক্রেমলিন জানিয়েছে, র্যাটক্লিফ রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। সিআইএ ও হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
মস্কো সফরের উদ্দেশ্য নিয়েও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিস্তারিত কিছু বলেননি। বৃহস্পতিবার তিনি ইউরোপে ন্যাটোর কোনো ভূখণ্ডে পুতিন হামলা চালাবেন—এমন আশঙ্কা নাকচ করে দিয়ে বলেন, ‘তিনি ন্যাটোর ভূখণ্ডে হামলা করবেন না।’
অস্ত্রভাণ্ডারে চাপ, কমছে সামরিক প্রস্তুতি
ইরান যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে এরই মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছে, দীর্ঘ অভিযানের কারণে মার্কিন বাহিনীর প্রস্তুতি এবং গোলাবারুদের মজুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিশেষ করে প্যাট্রিয়টসহ গুরুত্বপূর্ণ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেমের মতো উন্নত অস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এসব অস্ত্রের একটি অংশ ইউক্রেনেরও প্রয়োজন। এর আগে ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় এক-চতুর্থাংশ রিপার ড্রোন হারিয়েছে। প্রতিটি ড্রোনের মূল্য প্রায় ৩ কোটি থেকে ৫ কোটি ডলার।
এ পরিস্থিতিতে এশিয়ার মিত্রদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরোধ সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা গুরুতর গোলাবারুদ সংকটের কথা অস্বীকার করেছেন। একই সময়ে তারা দ্রুত অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর জন্য নির্মাতাদের ওপর চাপ দিচ্ছেন।
ইউক্রেন যুদ্ধেও বাড়ছে চাপ
ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে স্থবিরতা বজায় থাকলেও দুই পক্ষই পরস্পরের ভূখণ্ডে হামলা বাড়িয়েছে। ইউক্রেন রাশিয়ার জ্বালানি খাত ও অনলাইন বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে রাশিয়া আবাসিক ভবন, শিল্প অবকাঠামো ও বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থানে হামলা অব্যাহত রেখেছে।
ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার সুযোগও নিচ্ছে রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্র সরবরাহ করা এসব প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি পূরণে ইউরোপীয় দেশগুলো সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যদিও এর অনেক চালান আগামী বছর নাগাদ পৌঁছানোর কথা।
সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তির মতে, র্যাটক্লিফের মস্কো সফরের মূল বিষয় ছিল পুতিনকে কোণঠাসা অবস্থায় দেখা নয়; বরং রাশিয়ার মূল্যায়ন—যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে এতটাই সামরিকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত যে ইউক্রেন বা ইউরোপে কার্যকরভাবে হস্তক্ষেপ করার সক্ষমতা কমে গেছে।
বৈঠকে র্যাটক্লিফ রুশ কর্মকর্তাদের সতর্ক করে বলেছেন, পুতিন ইউক্রেনে যুদ্ধ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ালে তা ট্রাম্প প্রশাসনকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির আরও ঘনিষ্ঠ করে তুলতে পারে।
ইউক্রেন যুদ্ধ পঞ্চম বছরে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপেও রাশিয়ার বিরুদ্ধে হাইব্রিড হামলার অভিযোগ বাড়ছে। জার্মানির লাইপজিগ/হালে বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার চেষ্টাসহ কয়েকটি ঘটনায় রুশ সংশ্লিষ্টতার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষক ও কিছু সরকার। পূর্ব ইউরোপের ন্যাটো সদস্য, বিশেষ করে বাল্টিক দেশগুলোও আকাশসীমা লঙ্ঘন ও ড্রোন অনুপ্রবেশের ঘটনায় রাশিয়ার পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে।
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মজুত ও প্রস্তুতি নিয়ে তৈরি এই গোয়েন্দা মূল্যায়ন কতটা নির্ভরযোগ্য, তা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















