ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংঘাত শুরুর ছয় মাস পরও তেহরানের শাসনব্যবস্থা টিকে আছে। বিপুল সামরিক হামলা ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পরও ইরানকে নিজেদের শর্তে আনতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। এখন সামরিক যুদ্ধের পরিবর্তে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর পথে হাঁটছে ওয়াশিংটন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, নতুন কৌশলেও আগের ফলাফল বদলানোর নিশ্চয়তা নেই।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বড় ধরনের বিমান হামলা শুরু করে। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে পরিচালিত সেই অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার কয়েকজন কর্মকর্তা নিহত হন। খামেনির ছেলে ও উত্তরসূরি মোজতবা গুরুতর আহত হন। কয়েক সপ্তাহের তীব্র বোমাবর্ষণে ইরানের বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবে সামরিক হামলার পরও ইরানের জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিদ্রোহে নামেনি এবং দেশটির নেতৃত্বও ভেঙে পড়েনি। বরং ইরান দ্রুত অনেক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করে। একই সঙ্গে অঞ্চলটির গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন ঘাঁটি ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর হামলা চালায়। এর প্রভাবে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যায় এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। সংঘাতে কয়েক হাজার ইরানি নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হলেও সঠিক সংখ্যা যাচাই করা কঠিন; নিহত হয়েছেন ১৮ জন মার্কিন সেনাসদস্যও।
ইরানের অবস্থান আরও শক্ত
বিশ্লেষকদের মূল্যায়নে, যুদ্ধ ইরানের সামরিক সক্ষমতায় বড় আঘাত করলেও দেশটির শাসনব্যবস্থাকে সরাতে পারেনি। চ্যাথাম হাউসের সানাম ভাকিল বলেছেন, যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ইরান বিশেষজ্ঞ সুজান ম্যালোনিও যুদ্ধকে ব্যর্থ হিসেবে দেখছেন। তার মতে, ইরান ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়লেও আগের তুলনায় আরও শক্ত অবস্থানে এসেছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোও ধরে নিয়েছে যে ইসলামি প্রজাতন্ত্র দ্রুত বিলীন হচ্ছে না।
অর্থনৈতিক যুদ্ধের নতুন অধ্যায়
সামরিক অভিযান বদলে এখন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক চাপকে প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ ঘোষণা করে ইরানকে আরও বিচ্ছিন্ন এবং দেশটির ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করার লক্ষ্য জানিয়েছেন। কিন্তু এই কৌশল কতদিন চলবে, ঠিক কোন উপায়ে তা কার্যকর হবে এবং এর চূড়ান্ত লক্ষ্য কী—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
ইরানকে আরও চাপে ফেলতে নিষেধাজ্ঞা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও দেশটি সহজে আত্মসমর্পণ করবে বলে মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা। বরং তেহরান পারস্য উপসাগরে জাহাজ চলাচল এবং মার্কিন মিত্রদের বিরুদ্ধে হামলা বাড়াতে পারে, যা আবারও সামরিক সংঘাতের পথ খুলে দিতে পারে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, বাড়ছে ঝুঁকি
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি তুলে ধরে সংঘাতের অবসানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তবে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় তারা অন্তত জুনের সমঝোতা স্মারকে ফেরার দাবি বজায় রেখেছেন। একই সময়ে হরমুজ প্রণালি নিয়েও ওমানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনিকে গত ৯ আগস্টের পর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তার জীবিত থাকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটা স্থবির; দুই পক্ষ সরাসরি হামলা চালাচ্ছে না এবং হরমুজ প্রণালিতে উভয় দিকের অবরোধও তুলনামূলকভাবে শিথিল।
তবে এই অচলাবস্থা ঝুঁকিমুক্ত নয়। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, অর্থনৈতিক চাপ ব্যর্থ হলে আবার সামরিক উত্তেজনা বাড়তে পারে। আর চাপ কার্যকর হলেও ইরান অবরোধ ভাঙতে পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারে। সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ ইরানিদের, যারা একদিকে যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটের শিকার, অন্যদিকে নিজ দেশের কঠোর শাসনের চাপও বহন করছেন।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের ছয় মাস পরও তাই ওয়াশিংটনের লক্ষ্য অস্পষ্ট, তেহরানের শাসন টিকে আছে এবং সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের পথ এখনো অনিশ্চিত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















