একবারের জিন সম্পাদনেই কি আজীবনের জন্য উচ্চ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব? নতুন গবেষণার ফল বলছে, সেই সম্ভাবনা এখন আর কল্পনা নয়। পরীক্ষামূলক একটি চিকিৎসায় মাত্র একবার জিনের নির্দিষ্ট অংশ পরিবর্তন করার পর বিপজ্জনক মাত্রার কোলেস্টেরল প্রায় অর্ধেক কমে গেছে এবং এই সুফল এক বছর পরও বজায় রয়েছে।
গবেষণাটি ছোট পরিসরে হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানে বেশ আলোড়ন তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের গবেষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত প্রাথমিক পরীক্ষায় মাত্র ১৫ জন অংশ নেন। তাদের সবারই ছিল অত্যন্ত বেশি মাত্রার কোলেস্টেরল, যা প্রচলিত ওষুধে যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণে আসছিল না। পরীক্ষায় বিভিন্ন মাত্রার জিন-সম্পাদনকারী চিকিৎসা প্রয়োগ করে এর নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা যাচাই করা হয়।
একবারের চিকিৎসা, এক বছর পরও সুফল
গবেষণায় সবচেয়ে বেশি মাত্রার চিকিৎসা নেওয়া চারজনের ক্ষেত্রে ফল বিশেষভাবে আশাব্যঞ্জক। চিকিৎসার দুই মাস পর তাদের রক্তে ক্ষতিকর এলডিএল কোলেস্টেরল প্রায় ৫০ শতাংশ এবং ট্রাইগ্লিসারাইড প্রায় ৫৫ শতাংশ কমে যায়।
এক বছর পরও সেই পরিবর্তন প্রায় একই রকম ছিল। ট্রাইগ্লিসারাইডের গড় মাত্রা প্রায় ৪৮ শতাংশ কম এবং এলডিএল কোলেস্টেরল প্রায় ৫৩ শতাংশ কম পাওয়া যায়। অর্থাৎ চিকিৎসার প্রাথমিক সুফল সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায়নি।
গবেষণার প্রধান লেখক হৃদরোগ প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ লুক ল্যাফিনের ভাষায়, চিকিৎসার পর ৬০ দিনে যে কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড কমার প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, এক বছর পরও তা বজায় রয়েছে। সবচেয়ে বেশি মাত্রা পাওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী এবং এখন পর্যন্ত নিরাপদ বলেই মনে হচ্ছে।
শরীরের ‘খারাপ’ কোলেস্টেরল কমানোর নতুন পথ
এলডিএলকে সাধারণভাবে ‘খারাপ’ কোলেস্টেরল বলা হয়। রক্তে এর মাত্রা বেশি হলে ধমনিতে চর্বিজাতীয় পদার্থ জমে রক্ত চলাচলের পথ সংকুচিত হতে পারে। এর ফলে হৃদ্রোগ, হৃদ্রক্তনালির সমস্যা ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে।
ট্রাইগ্লিসারাইডও রক্তে থাকা এক ধরনের চর্বি। এর মাত্রা বেশি থাকলেও হৃদ্রোগসহ বিভিন্ন হৃদ্রক্তনালির সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বর্তমানে কোলেস্টেরল কমানোর জন্য নানা ধরনের ওষুধ রয়েছে। তবে নিয়মিত ওষুধ খাওয়া অনেক রোগীর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কোলেস্টেরলের ওষুধ গ্রহণকারীদের মাত্র প্রায় অর্ধেক দীর্ঘ সময় ধরে নিয়ম মেনে ওষুধ খান। আবার স্ট্যাটিন শুরু করার এক বছরের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধেক রোগী তা বন্ধ করে দেন।
এই বাস্তবতায় একবারের চিকিৎসায় দীর্ঘস্থায়ী ফল পাওয়ার সম্ভাবনা চিকিৎসাবিজ্ঞানে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
ধারণাটি এসেছে মানুষের স্বাভাবিক জিনগত পরিবর্তন থেকে
এই চিকিৎসার পেছনে রয়েছে মানুষের একটি বিরল কিন্তু উপকারী জিনগত বৈশিষ্ট্য। গবেষকেরা অ্যাঞ্জিওপোইটিন-সদৃশ প্রোটিন-৩ নামের একটি জিন নিয়ে কাজ করছেন, যা শরীরে এলডিএল কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কিছু মানুষের শরীরে এই জিনের একটি বা উভয় অনুলিপি স্বাভাবিকভাবেই নিষ্ক্রিয় থাকে। এমন মানুষের রক্তে সারা জীবন এলডিএল কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা অত্যন্ত কম থাকে। একই সঙ্গে তাদের হৃদ্রোগের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কম বলে দেখা গেছে।
গবেষকদের ধারণা, প্রকৃতিতে ঘটে যাওয়া এই সুরক্ষামূলক জিনগত পরিবর্তনকে কৃত্রিমভাবে অন্য মানুষের শরীরেও তৈরি করা গেলে উচ্চ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে নতুন পথ খুলতে পারে।
জিনের ‘কাঁচি’ পৌঁছাবে শুধু যকৃতে
এ জন্য ব্যবহার করা হয়েছে ক্রিসপার-ক্যাস৯ নামের জিন সম্পাদনা প্রযুক্তি। সহজভাবে বললে, এটি জিনের নির্দিষ্ট অংশ শনাক্ত করে সেখানে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পরিবর্তন ঘটাতে পারে।
তবে প্রাকৃতিকভাবে যাদের ওই জিন নিষ্ক্রিয়, তাদের শরীরের প্রায় প্রতিটি কোষেই পরিবর্তনটি থাকে। পরীক্ষামূলক চিকিৎসায় সেই পদ্ধতি অনুসরণ না করে চিকিৎসাটি মূলত যকৃতকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছে।
কারণ যকৃত শরীরে কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড তৈরি, নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ত থেকে অতিরিক্ত চর্বি অপসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গবেষকদের আশা, শুধু যকৃতের কোষকে লক্ষ্য করলে শরীরের অন্য অংশের জিন অনিচ্ছাকৃতভাবে পরিবর্তিত হওয়ার ঝুঁকি কম থাকবে।
প্রচলিত ওষুধের চেয়েও কি ভালো?
গবেষণার ফল চমকপ্রদ হলেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এই চিকিৎসা এখনো প্রচলিত ওষুধের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
বর্তমানে ব্যবহৃত কিছু ওষুধও এলডিএল কোলেস্টেরল অনেকটা কমিয়ে দিতে পারে। কোনো কোনো ওষুধ পরীক্ষামূলক চিকিৎসার চেয়েও শক্তিশালীভাবে কোলেস্টেরল কমাতে সক্ষম।
সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এলডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রা প্রায় ১০০-এর কাছাকাছি থাকতে পারে। কিন্তু যাদের হৃদ্রোগ রয়েছে বা জন্মগতভাবে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা কখনো কখনো মাত্রা ৪০ বা ৫০-এর কাছাকাছি নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেন। শুধু খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন পরিবর্তন করে এত কম মাত্রায় পৌঁছানো অনেকের জন্য কঠিন।
এই জায়গাতেই একবারের জিন-চিকিৎসার সম্ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কম, তবে প্রশ্নও আছে
প্রাথমিক পরীক্ষায় বড় ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুব বেশি দেখা যায়নি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চিকিৎসা দেওয়ার স্থানে সামান্য অস্বস্তি বা জ্বালাপোড়া ছিল।
একজনের মেরুদণ্ডের ডিস্কে সমস্যা দেখা দেয়। আরেকজনের শরীরে এমন কিছু এনজাইমের মাত্রা বেড়ে যায়, যা যকৃতের ক্ষতির ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে দুই সপ্তাহের মধ্যেই সেই মাত্রা স্বাভাবিক হয়ে যায়।
তবে গবেষণায় একজন অংশগ্রহণকারী চিকিৎসা নেওয়ার ছয় মাস পর মারা যান। গবেষকদের মতে, ওই ব্যক্তি অত্যন্ত গুরুতর ও অগ্রসর হৃদ্রোগে ভুগছিলেন এবং তিনি সবচেয়ে কম মাত্রার চিকিৎসা পেয়েছিলেন। তাই তার মৃত্যুর সঙ্গে পরীক্ষামূলক চিকিৎসার সম্পর্ক রয়েছে বলে তারা মনে করেন না।
তবু জিন সম্পাদনার দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এ ধরনের চিকিৎসা শরীরে স্থায়ী পরিবর্তন ঘটাতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের সুপারিশ অনুযায়ী পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের চিকিৎসা শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। এই পর্যবেক্ষণ ১৫ বছর পর্যন্ত চলতে পারে।
‘ভালো’ কোলেস্টেরল কমে যাওয়াও উদ্বেগের
গবেষণার একটি বিষয় বিশেষজ্ঞদের নজরে এসেছে। চিকিৎসার পর উচ্চ ঘনত্বের লিপোপ্রোটিন বা ‘ভালো’ কোলেস্টেরলও প্রায় ২০ শতাংশ কমে যায়। দুই মাস পর যেমন এই পতন দেখা গেছে, এক বছর পরও তা বজায় ছিল।
এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে এই পরিবর্তনের কোনো নেতিবাচক প্রভাব হবে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়। বড় পরিসরের পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টি আরও ভালোভাবে বোঝা প্রয়োজন।
এবার বড় পরীক্ষার পালা
যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ায় নতুন একটি পরীক্ষামূলক গবেষণা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। সেখানে সর্বোচ্চ মাত্রার চিকিৎসা প্রায় ৪০ জন মানুষকে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই পরীক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যেতে পারে। এরপর চিকিৎসাটিকে আরও বড় পরিসরের দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। সবশেষে নিয়ন্ত্রক অনুমোদন মিললেই সাধারণ রোগীদের জন্য এটি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।
তরুণ রোগীদের জন্য বদলে যেতে পারে চিকিৎসার ধারণা
গবেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা রয়েছে অল্প বয়সে গুরুতর বংশগত উচ্চ কোলেস্টেরলে আক্রান্ত মানুষের জন্য।
ধরা যাক, কারও বয়স মাত্র ২০ বছর এবং তার কোলেস্টেরল অত্যন্ত বেশি। প্রচলিত ব্যবস্থায় তাকে হয়তো জীবনের পরবর্তী কয়েক দশক প্রতিদিন ওষুধ খেতে হবে, অথবা নিয়মিত ইনজেকশন নিতে হবে। এর বদলে যদি একবারের চিকিৎসায় দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা তৈরি করা যায়, তাহলে চিকিৎসাব্যবস্থার ধরনই বদলে যেতে পারে।
তবে বিজ্ঞানীরা এখনই এটিকে ‘আজীবনের চিকিৎসা’ বলে ঘোষণা করছেন না। মাত্র ১৫ জনের প্রাথমিক গবেষণা থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। বড় ও দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষাই বলে দেবে, জিন সম্পাদনার মাধ্যমে উচ্চ কোলেস্টেরল সত্যিই স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় কি না।
তারপরও একবার জিনের নির্দিষ্ট অংশ পরিবর্তন করে এক বছর ধরে কোলেস্টেরলের মাত্রা প্রায় অর্ধেক কমিয়ে রাখার এই ফল চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। ভবিষ্যতে সফল হলে প্রতিদিনের ওষুধনির্ভর চিকিৎসার পাশাপাশি জিন-ভিত্তিক এককালীন চিকিৎসা হৃদ্রোগ প্রতিরোধে নতুন যুগের সূচনা করতে পারে।
উচ্চ কোলেস্টেরল কমাতে একবারের জিন-সম্পাদনা চিকিৎসার নতুন গবেষণায় এক বছর পরও প্রায় ৫০ শতাংশ কম এলডিএল কোলেস্টেরল পাওয়া গেছে।
Sarakhon Report 


















