পাকিস্তানের অর্থনীতি স্থিতিশীল হয়েছে—বিশ্বের বিভিন্ন ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা ও ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে গত কয়েক বছর ধরে প্রায় একই ধরনের মূল্যায়নই শুনে আসছে দেশটি। কিন্তু সেই সঙ্গে বারবার বলা হচ্ছে, অর্থনীতিতে এখনো বড় ধরনের ঝুঁকি রয়ে গেছে। সম্প্রতি পাকিস্তানের ঋণমান কিছুটা উন্নীত করার সময়ও একই ধরনের মন্তব্য করেছে মুডিজ। ফলে নতুন মূল্যায়নটি পুরোনো কথাকেই নতুন সংখ্যায় উপস্থাপন করেছে।
স্থিতিশীলতা, নাকি স্থবিরতা
একই ধরনের মূল্যায়ন বছরের পর বছর ফিরে আসাটাই আসলে পাকিস্তানের অর্থনীতির বড় সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। অর্থনীতির সামষ্টিক সূচকগুলো হয়তো আগের মতো দ্রুত অবনতি ঘটাচ্ছে না, কিন্তু এর ভেতরের কাঠামোগত পরিবর্তনও খুব একটা হচ্ছে না। অর্থাৎ অর্থনীতি যেন এগিয়ে যাওয়ার বদলে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।
বিশ্বের অন্য দেশগুলো যখন অর্থনৈতিক সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা ও বিনিয়োগ বাড়িয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন শুধু স্থির অবস্থায় থাকাও এক ধরনের নীরব পতন। মুডিজের নতুন ঋণমান এখনো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে এবং বিনিয়োগযোগ্য মানের চেয়ে সাত ধাপ নিচে। তাই এই উন্নয়নকে পাকিস্তানের অর্থনীতির প্রতি বড় ধরনের আস্থার প্রকাশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বরং এর অর্থ হলো, আগের তুলনায় পাকিস্তানের ঋণখেলাপি হওয়ার আশঙ্কা সামান্য কমেছে। অথচ এই মূল্যায়ন প্রকাশের পর প্রধানমন্ত্রী জাতিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন, যেন দেশটি অর্থনৈতিক সংকটের মোড় ঘুরিয়ে ফেলেছে। পাকিস্তানের নীতিনির্ধারণে এখন এমন এক প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যেখানে সামান্য কারিগরি উন্নতিকেও বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হয়।
অর্থনীতির দুর্বল ভিত স্পষ্ট
মুডিজের মূল্যায়নে পাকিস্তানের অর্থনীতির যে চিত্র উঠে এসেছে, তা খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। দেশটির রপ্তানি এখনো সীমিত কয়েকটি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগও অত্যন্ত কম। অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার জোগানে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের ওপর বড় ধরনের নির্ভরতা রয়েছে।
একই সময়ে সরকার বৈদেশিক দায় মেটাতে সরকারি ও বাণিজ্যিক ঋণের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করছে। ফলে এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি হয়েছে, যা নিজস্ব শক্তির ওপর পুরোপুরি দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সহায়তা এবং দ্বিপক্ষীয় আমানত পুনর্নবীকরণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে সচল রাখা হচ্ছে। এতে তাৎক্ষণিক সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ভিত শক্তিশালী হচ্ছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।
সুশাসনের ঘাটতি বিনিয়োগে বাধা
মুডিজের মূল্যায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো সুশাসন নিয়ে তাদের সরাসরি মন্তব্য। দুর্বল আইনের শাসন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং সরকারের সীমিত কার্যকারিতাকে বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এসব বিষয়কে সাধারণ পর্যবেক্ষণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ বিনিয়োগকারীরা একটি দেশে অর্থ বিনিয়োগের আগে শুধু অর্থনৈতিক সূচক দেখেন না; তারা আইনের শাসন, প্রশাসনিক দক্ষতা, দুর্নীতির মাত্রা এবং নীতির ধারাবাহিকতাও বিবেচনা করেন।
পাকিস্তানের এসব ক্ষেত্রে দুর্বলতা থাকায় বিনিয়োগকারীরা এখনো দেশটির পরিবর্তে অন্য বাজারের দিকে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। ফলে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য যে পরিমাণ বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন, তা আসছে না।
ঋণের সুদ কমলেও স্বস্তি নেই
ঋণের ব্যয় বহনের সক্ষমতায় কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলেও মুডিজ উল্লেখ করেছে। আগের বছরের তুলনায় সুদ পরিশোধের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কিন্তু সমস্যাটি হলো, সুদ পরিশোধে এখনো এত বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে যে জনগণের প্রয়োজনীয় সামাজিক সেবা ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগের জন্য সরকারের হাতে খুব সামান্য অর্থ অবশিষ্ট থাকে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। সুদ পরিশোধের ব্যয় কমার পেছনে মূলত মূল্যস্ফীতি কমে যাওয়া এবং সুদের হার কমানোর ভূমিকা রয়েছে। অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা, রপ্তানি সক্ষমতা কিংবা বিনিয়োগ কাঠামোয় বড় কোনো মৌলিক পরিবর্তনের কারণে এই উন্নতি হয়নি।
অর্থাৎ বর্তমান স্বস্তি অনেকটাই পরিস্থিতিগত। কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই উন্নতিকে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়া কঠিন।
প্রকৃত পুনরুদ্ধার এখনো অধরা
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, পাকিস্তানের অর্থনীতি কারিগরি অর্থে কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। কিন্তু সেই স্থিতিশীলতার নিচে যে গভীর সমস্যাগুলো রয়েছে, সেগুলোর সমাধান এখনো হয়নি।
একটি প্রকৃত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার হলে তার চিত্র ভিন্ন হতো। রপ্তানি বাড়ত, বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহ শক্তিশালী হতো, উৎপাদনশীলতা বাড়ত, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতো এবং সরকার ঋণনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব রাজস্ব ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর দাঁড়াতে পারত।
মুডিজের ঋণমান উন্নয়ন তাই পাকিস্তানের অর্থনীতির মোড় ঘুরে যাওয়ার কোনো বড় ঘটনা নয়। বরং একই অপেক্ষাকক্ষের একটু ভালো একটি আসন পাওয়ার মতো বিষয়। সংকট হয়তো কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে, কিন্তু যে অর্থনৈতিক অগ্রগতি পাকিস্তানের প্রয়োজন, তার দেখা এখনো মেলেনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















