রাত গভীর। ঘুম আসছে না, কোনো বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা দিনের কোনো ঘটনা নিয়ে এক কিশোর-কিশোরী উদ্বিগ্ন। বাবা-মাকে না ডেকে সে হাতে তুলে নিচ্ছে ফোন, খুলছে একটি এআই চ্যাটবট এবং লিখছে—সে খুব চাপের মধ্যে আছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই উত্তর আসছে সহানুভূতিশীল ভঙ্গিতে। কথোপকথন চলতে চলতে তার মন কিছুটা শান্ত হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে এতে ক্ষতির কিছু নেই। বরং প্রযুক্তি যেন সেই মুহূর্তে একজন শ্রোতার কাজই করছে।
কিন্তু এখানেই বড় প্রশ্নটি সামনে আসে: একজন কিশোর যখন তার ভয়, একাকিত্ব, উদ্বেগ কিংবা মানসিক সংকটের কথা মানুষের বদলে একটি কৃত্রিম কথোপকথন ব্যবস্থাকে বলতে শুরু করে, তখন সেই সহায়তা আসলে কতটা নিরাপদ?
এটি আর ভবিষ্যতের কোনো কাল্পনিক পরিস্থিতি নয়। গবেষণার সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, কিশোরদের মধ্যে এআই-চ্যাটবট ব্যবহারের প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। অনেকেই এগুলোকে সঙ্গী হিসেবে ব্যবহার করছে, মানসিক সমর্থন চাইছে, এমনকি স্বাস্থ্যসংক্রান্ত পরামর্শও নিচ্ছে। সমস্যাটি শুধু ব্যবহারের ব্যাপকতায় নয়; উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক কিশোর এই ব্যবহার সম্পর্কে পরিবারের সদস্য কিংবা অন্য কারও সঙ্গে কথাই বলে না। ফলে একটি ব্যক্তিগত ও ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের জায়গা তৈরি হচ্ছে, যার ভেতরের গতিপ্রকৃতি বড়দের অজানাই থেকে যাচ্ছে।
এআইয়ের সহানুভূতি আসলে কতটা বাস্তব?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে এআই চ্যাটবটের একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে কিশোররা অন্তত বাস্তব মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করে। কিন্তু সাধারণ এআই চ্যাটবট এমন এক কথোপকথনের অভিজ্ঞতা তৈরি করে, যেখানে অপর পক্ষটি মানুষের মতো কথা বললেও মানুষ নয়। তার সহানুভূতি, বোঝাপড়া কিংবা আগ্রহ—সবই ভাষার ধরন ও পূর্বনির্ধারিত প্যাটার্ন থেকে তৈরি।
কৈশোর এমনিতেই আত্মপরিচয় গঠনের সময়। এই বয়সে স্বীকৃতি, মনোযোগ ও বোঝাপড়ার প্রয়োজন প্রবল থাকে। ফলে একটি চ্যাটবট যখন ধৈর্য ধরে উত্তর দেয়, বিচার না করে কথা বলে এবং সবসময় হাতের নাগালে থাকে, তখন কিশোরের কাছে সেই সম্পর্ক বাস্তবের সম্পর্কের মতো অর্থবহ মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
বিশেষ করে একাকিত্ব, উদ্বেগ কিংবা সামাজিক যোগাযোগে সমস্যায় থাকা কিশোরদের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটি আরও বেশি। তারা যদি ধীরে ধীরে বন্ধু, পরিবার বা শিক্ষকের বদলে চ্যাটবটকে আবেগ প্রকাশের প্রধান জায়গা বানিয়ে ফেলে, তাহলে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক সম্পর্কে তাদের প্রত্যাশাও বদলে যেতে পারে।
থেরাপির জন্য তৈরি এআই আর সাধারণ চ্যাটবট এক নয়
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। কিছু বিশেষভাবে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার জন্য তৈরি এআই চ্যাটবট নিয়ন্ত্রিত গবেষণায় সীমিত উপকারের সম্ভাবনা দেখিয়েছে। কিন্তু কিশোররা বাস্তবে যে সাধারণ উদ্দেশ্যের চ্যাটবট ব্যবহার করছে, সেগুলোর অধিকাংশই মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য তৈরি বা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি।
এ কারণেই একটি চ্যাটবটের সাবলীল কথোপকথনকে পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিকল্প ভাবা বিপজ্জনক। একটি সাধারণ ভাষাভিত্তিক মডেল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিতে পারে। কখনো ব্যবহারকারীর ভুল ধারণাকেও এমনভাবে সমর্থন করতে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ দেখা দেয় সংকটের মুহূর্তে। আত্মক্ষতি, আত্মহত্যার চিন্তা কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের মতো বিষয়ে চ্যাটবটের প্রতিক্রিয়া সবসময় যথেষ্ট নিরাপদ নয়—এমন প্রমাণ ইতোমধ্যেই পাওয়া যাচ্ছে। কোনো জরুরি সহায়তার নম্বরের কথা জানানোই যথেষ্ট নয়; একজন বিপন্ন কিশোরের সঙ্গে কথোপকথন কীভাবে থামানো হবে, কখন মানুষের কাছে তাকে পৌঁছে দেওয়া হবে এবং কীভাবে তাৎক্ষণিক ঝুঁকি মোকাবিলা করা হবে—এসবের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
দীর্ঘ কথোপকথন পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করতে পারে। গভীর রাতে একজন উদ্বিগ্ন কিশোর যে কথোপকথন দিয়ে শুরু করেছিল, তা দীর্ঘ হতে হতে আরও আবেগপ্রবণ বা অস্থিতিশীল পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। তখন প্রযুক্তির প্রাথমিক সহায়ক ভূমিকা আর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না।
নিষেধাজ্ঞা কি সমাধান?
কিছু এআই প্ল্যাটফর্ম ইতোমধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। বয়স যাচাই, অভিভাবকদের জন্য নোটিফিকেশন এবং ১৮ বছরের কম বয়সীদের ওপেন-এন্ডেড কথোপকথনে নিষেধাজ্ঞার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ইন্টারনেটে বিকল্প প্ল্যাটফর্মের অভাব নেই, আর কিশোরদের পক্ষে প্রযুক্তিগত বিধিনিষেধ এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভবও নয়।
তাই শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতাই তার প্রমাণ। ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে ব্যাপক সামাজিক ও নীতিগত স্বীকৃতি আসতে অনেক সময় লেগেছে, যখন সমস্যার কিছু অংশ ইতোমধ্যে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এআই চ্যাটবটের ক্ষেত্রেও একই ভুল পুনরাবৃত্তি করা উচিত নয়।
প্রথম কাজ হওয়া উচিত কথা বলা
অভিভাবকদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ সম্ভবত প্রযুক্তি কেড়ে নেওয়া নয়, বরং কথোপকথন শুরু করা। কিশোর চ্যাটবট ব্যবহার করছে কি না—এমন সরাসরি প্রশ্ন অনেক সময় তাকে আত্মরক্ষামূলক করে তুলতে পারে। তার বদলে জানতে চাওয়া যেতে পারে, এআইয়ের সঙ্গে সে কী নিয়ে কথা বলে, কখন ব্যবহার করে এবং কোনো কথোপকথন কখনো তাকে অস্বস্তিকর, বিভ্রান্ত বা বিচলিত করেছে কি না।
এই ধরনের প্রশ্নের উদ্দেশ্য নজরদারি নয়; বোঝাপড়া তৈরি করা। একজন কিশোর যদি বুঝতে পারে যে তার অভিভাবক প্রযুক্তিটিকে নিষিদ্ধ করার আগে তার অভিজ্ঞতা বুঝতে চান, তাহলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসার সম্ভাবনা বাড়ে।
পরিবারে প্রযুক্তি ব্যবহারের সীমারেখাও স্পষ্ট করা দরকার। বিশেষ করে গভীর রাতে চ্যাটবট ব্যবহারে সময়সীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে। মানসিক সংকটের সময় এআইয়ের বদলে কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে—অভিভাবক, বিশ্বস্ত বন্ধু, শিক্ষক বা কাউন্সেলর—সেটিও আগে থেকে ঠিক থাকা জরুরি।
একই সঙ্গে কিশোরদের বিকল্প উপায় শেখানো দরকার। ডায়েরি লেখা, মনোযোগ অন্যদিকে সরানো, শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন এর মতো কৌশল কখন ব্যবহার করা যায়, তা জানা থাকলে প্রতিটি আবেগগত সংকটে প্রযুক্তির দিকে ছুটে যাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে।
প্রযুক্তি বোঝার পাশাপাশি তার সীমাবদ্ধতাও বোঝাতে হবে
এআই-সাক্ষরতা এখন শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা নয়; প্রযুক্তির সীমা বোঝার দক্ষতাও। কিশোরদের জানা প্রয়োজন, একটি চ্যাটবট মানুষকে সত্যিকার অর্থে চেনে না। কথোপকথন যতই ব্যক্তিগত ও আন্তরিক মনে হোক, তার প্রতিক্রিয়া মূলত ভাষাগত প্যাটার্নের ওপর নির্ভরশীল।
তাদের এটাও বুঝতে হবে যে চ্যাটবট ভুল করতে পারে এবং ভুল তথ্যও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উপস্থাপন করতে পারে। সৃষ্টিকর্তারা এগুলোকে অনেক সময় এমনভাবে প্রশিক্ষিত করেন যাতে কথোপকথন সহজ ও সম্মতিপূর্ণ হয়। ফলে ব্যবহারকারী যা শুনতে চান, চ্যাটবট কখনো কখনো তার কাছাকাছি উত্তর দেওয়ার প্রবণতা দেখাতে পারে।

আরেকটি বিষয় আরও গুরুত্বপূর্ণ—চ্যাটবটের সঙ্গে কথোপকথনকে ব্যক্তিগত বা সম্পূর্ণ গোপন মনে করা ঠিক নয়। এসব কথোপকথন সংরক্ষিত হতে পারে, ভবিষ্যৎ মডেল উন্নয়নে ব্যবহৃত হতে পারে, মানুষের পর্যালোচনার আওতায় আসতে পারে কিংবা কোনো তথ্য ফাঁসের ঘটনায় প্রকাশ পেতে পারে। তাই ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য শেয়ার করার ক্ষেত্রে কিশোরদের সতর্ক থাকা জরুরি।
এআইকে শত্রু বানানোও সমাধান নয়
এআই চ্যাটবটের ব্যবহার রাতারাতি বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব নয়, আর সব ব্যবহারই ক্ষতিকর—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো ঠিক হবে না। কখনো একটি চ্যাটবটের সঙ্গে কয়েক মিনিটের কথোপকথন একজন উদ্বিগ্ন কিশোরকে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু সেই সাময়িক স্বস্তি যেন বাস্তব মানুষের সম্পর্ক, পেশাদার সহায়তা কিংবা জরুরি মানবিক যোগাযোগের বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়—সেটিই মূল বিষয়।
এখানে দায়িত্ব শুধু পরিবারের নয়। প্রযুক্তি কোম্পানি, গবেষক, চিকিৎসক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নীতিনির্ধারকদেরও কিশোরদের জন্য নিরাপদ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে মানসিক সংকটের মতো উচ্চঝুঁকির পরিস্থিতিতে সাধারণ কথোপকথনের সক্ষমতার চেয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
গবেষণা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যে এআই চ্যাটবটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে সব উত্তর আমাদের হাতে নেই। কিন্তু উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। ঝুঁকির ইঙ্গিত যখন স্পষ্ট, তখন সচেতনতা ও নিরাপত্তার কাঠামো আগেই তৈরি করা দরকার।
এআই হয়তো কিশোরদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবে। প্রশ্ন তাই প্রযুক্তি থাকবে কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো—কিশোররা যখন সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় থাকবে, তখন তাদের পাশে শেষ পর্যন্ত কে থাকবে: এমন একটি ব্যবস্থা, যা মানুষের মতো কথা বলতে পারে, নাকি সত্যিকার একজন মানুষ, যে তাদের পরিস্থিতি বুঝে দায়িত্ব নিতে পারে?
এই পার্থক্যটি স্পষ্ট করে দেওয়ার সময় এখনই।
ফোবি এস. মুর, মেগান কেলি ও ইয়েল ডিভি 


















