০৯:৪৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬
নেপালের মরদেহ শনাক্ত সংকট: এখনো নিখোঁজ ২,৪২৬ জন; ৫১৭ বিদেশি নাগরিক রাজধানীতে গ্যাস সংকট তীব্র, ৪০-৫০ টাকার গ্যাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা রংপুরে অটোরিকশাচালককে গলা কেটে হত্যা, নিখোঁজ গাড়ি উদ্ধারে অভিযান ঢাকার যানজট কমাতে ৪ মাসের সময়সীমা, করওয়ান বাজারের কাঁচাবাজার যাবে গাবতলীতে ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে এখন থেকেই মানুন ৫টি সহজ অভ্যাস নিজ দলের কর্মীর সঙ্গে বিরোধ, মারধরের পর যুবদল নেতার মৃত্যু একই দিনে মনপুরার ৩ শিশু নিখোঁজ, উৎকণ্ঠায় পরিবার সেমিফাইনালে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ চূড়ান্ত, লড়াই হবে ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের বন্যায় নিখোঁজ বন্ধু, ভেসে গেল গ্ল্যান্সির পরিচিত গ্রাম ভারতে খ্রিস্টানদের উদ্বেগ, ধর্মান্তরবিরোধী কঠোর আইনে বাড়ছে হয়রানির আশঙ্কা

নেপাল-তিব্বত সীমান্তের বন্যায় নিখোঁজ বন্ধু, ভেসে গেল গ্ল্যান্সির পরিচিত গ্রাম

নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসের পর আকস্মিক বন্যার ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে গিয়ে ব্যক্তিগত এক শোকের মুখোমুখি হয়েছেন দ্য সানডে টাইমসের সাংবাদিক জশ গ্ল্যান্সি। টেলিভিশন ও অনলাইনে বন্যার ফুটেজ দেখার সময় ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটি গ্রামের দৃশ্য তাঁর কাছে পরিচিত মনে হয়। সেটি ছিল নেপালের সিয়াব্রু বেনসি—যেখানে তাঁর বহুদিনের বন্ধু ও ট্রেকিং গাইড বিরু থাকতেন।

গ্ল্যান্সির ভাষায়, দূরের একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মুহূর্তেই ব্যক্তিগত বিপর্যয়ে পরিণত হয়। যে গ্রামে তিনি থেকেছেন, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে খেয়েছেন, যে বন্ধুর হাসির ছবি এখনো তাঁর বাড়িতে রয়েছে—সেই বিরু ও তাঁর পরিবারের কী হয়েছে, সেই উদ্বেগ তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াতে থাকে।

২০১৬ সালে লাংটাং উপত্যকায় এক সপ্তাহ ট্রেকিং করেছিলেন গ্ল্যান্সি। তখনও অঞ্চলটি ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের ক্ষত কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিল। ওই ভূমিকম্পে প্রায় ৯ হাজার মানুষ নিহত এবং প্রায় ৩০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। পাহাড়ি জনপদগুলোতে তখনও বাড়িঘর, খামার ও চা-দোকান পুনর্নির্মাণ চলছিল।

বিরুর সঙ্গে বন্ধুত্ব

কাঠমান্ডুতে বসবাসকারী এক বন্ধুর মাধ্যমে বিরুর সঙ্গে পরিচয় গ্ল্যান্সির। পরিচয়ের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁদের বন্ধুত্ব হয়ে যায়। এভারেস্ট বা অন্নপূর্ণার জনপ্রিয় ট্রেইলের বদলে বিরু তাঁর নিজের বাড়ির কাছের লাংটাং উপত্যকা দেখাতে চেয়েছিলেন।

সেই সফরে প্রতিদিন প্রায় আট ঘণ্টা করে পাহাড়ে হাঁটতেন তাঁরা। গসাইকুন্ডার নীল হ্রদ, বিশাল রডোডেনড্রন বন এবং লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের সৌন্দর্য তাঁদের মুগ্ধ করেছিল। গ্ল্যান্সির বর্ণনায়, লাংটাংয়ের প্রকৃতি ছিল একই সঙ্গে নির্মম ও অসাধারণ সুন্দর।

বিরু ছিলেন দুর্দান্ত পাহাড়ি গাইড। গ্ল্যান্সি ও তাঁর বন্ধু অ্যান্থনির তুলনায় প্রায় এক ফুট খাটো হলেও পাহাড়ে তাঁর চলার গতি ছিল অনেক বেশি। তিনি দ্রুত ওপরে উঠে গিয়ে অপেক্ষা করতেন, আর দুই বন্ধু হাঁপাতে হাঁপাতে চূড়ায় পৌঁছালে তাঁকে পাথরের ওপর বসে ধূমপান করতে দেখা যেত। তরুণ বয়সে তিনি সন্ন্যাসীও ছিলেন।Biru, a trekking guide in Syabru Bensi, Nepal, meditating in front of snow-capped mountains.

ভেসে গেল নদীর পাড়ের বাড়ি

ট্রেকিংয়ের রাতে তাঁরা চা-দোকানের সামনে বসে সূর্যাস্ত দেখতেন, সবজি কারি খেতেন এবং স্থানীয় রাকসি পান করে পাহাড়, পরিবার ও জীবনের নানা বিষয় নিয়ে দীর্ঘ আলাপ করতেন। কখনো বিরুর পরিবারের সদস্যদের বাড়িতেও থেকেছেন তাঁরা।

ট্রেকের শেষে বিরু তাঁদের সিয়াব্রু বেনসিতে নিজের নির্মাণাধীন বাড়ি দেখিয়েছিলেন। ত্রিশূলী নদীর তীরে তৈরি সেই বাড়িটি ছিল তাঁর দুই ছেলের জন্য। বাড়িটি নিয়ে তাঁর গর্বের শেষ ছিল না।

বন্যার খবর পাওয়ার পর গ্ল্যান্সি সেই বাড়িটির ছবি খুঁজতে থাকেন। কিন্তু উপগ্রহচিত্র ও ধ্বংসযজ্ঞের ছবি দেখে তাঁর আশঙ্কাই সত্যি হয়—নদীর তীরের বাড়িটি আর নেই। প্রবল স্রোতে সবকিছু ভেসে গেছে।

বিরুর দুই ছেলে বেঁচে আছে

গ্ল্যান্সি বিরুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাননি। পরে তাঁদের এক অভিন্ন বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যিনি বিরুর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। সেখান থেকে জানা যায়, বিরুর দুই ছেলে নিরাপদে আছে। তবে উপত্যকার আশপাশে বসবাসকারী তাঁর পরিবারের বহু সদস্য ও বন্ধু বন্যায় প্রাণ হারিয়েছেন।

বিরু নিজে বেঁচে আছেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো খবর পাওয়া যায়নি। গ্ল্যান্সি লিখেছেন, বিরু যদি কোনোভাবে প্রাণে বেঁচে থাকেন, সেটি হবে এক অসাধারণ অলৌকিক ঘটনা।Biru, a trekking guide in Syabru Bensi, Nepal, sitting with a drink, with snow-capped mountains in the background.

লাংটাংয়ের প্রতি গ্ল্যান্সির ভালোবাসার বড় কারণ ছিলেন বিরু। নেপাল সফরের পর তিনি অন্য বন্ধুদেরও লাংটাংয়ে যেতে উৎসাহিত করতেন। বিরু তাঁদের স্বাগত জানাতেন হাসিমুখে, হাতে থাকত এক গ্লাস রাকসি। বছরের পর বছর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও পরে ফেসবুকে তাঁর ছোট্ট বার্তা ভেসে উঠত—‘নমস্তে, হাউ রু ব্রো’।

বিরু নিজেকে কখনো কখনো ‘সন অব হিমালয়া’ বলতেন। পাহাড়ের প্রতি তাঁর শিশুসুলভ বিস্ময় কখনো কমেনি। গ্ল্যান্সি লিখেছেন, বহুবার তিনি বিরুর সঙ্গে আবার লাংটাংয়ে ট্রেক করার কথা ভেবেছেন। এখন তাঁর একটাই আফসোস—সেই যাত্রাটি আর করা হয়নি।

নেপাল-তিব্বত সীমান্তের ভয়াবহ বন্যায় নিখোঁজ হয়েছেন শত শত পর্যটক, যাঁদের মধ্যে অন্তত ৩৩ জন ব্রিটিশ নাগরিক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। লাংটাং ও আশপাশের পাহাড়ে প্রতিবছর প্রায় ৩৫ হাজার দেশি-বিদেশি ট্রেকার ভ্রমণ করেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

নেপালের মরদেহ শনাক্ত সংকট: এখনো নিখোঁজ ২,৪২৬ জন; ৫১৭ বিদেশি নাগরিক

নেপাল-তিব্বত সীমান্তের বন্যায় নিখোঁজ বন্ধু, ভেসে গেল গ্ল্যান্সির পরিচিত গ্রাম

০৮:৫৬:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬

নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসের পর আকস্মিক বন্যার ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে গিয়ে ব্যক্তিগত এক শোকের মুখোমুখি হয়েছেন দ্য সানডে টাইমসের সাংবাদিক জশ গ্ল্যান্সি। টেলিভিশন ও অনলাইনে বন্যার ফুটেজ দেখার সময় ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটি গ্রামের দৃশ্য তাঁর কাছে পরিচিত মনে হয়। সেটি ছিল নেপালের সিয়াব্রু বেনসি—যেখানে তাঁর বহুদিনের বন্ধু ও ট্রেকিং গাইড বিরু থাকতেন।

গ্ল্যান্সির ভাষায়, দূরের একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মুহূর্তেই ব্যক্তিগত বিপর্যয়ে পরিণত হয়। যে গ্রামে তিনি থেকেছেন, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে খেয়েছেন, যে বন্ধুর হাসির ছবি এখনো তাঁর বাড়িতে রয়েছে—সেই বিরু ও তাঁর পরিবারের কী হয়েছে, সেই উদ্বেগ তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াতে থাকে।

২০১৬ সালে লাংটাং উপত্যকায় এক সপ্তাহ ট্রেকিং করেছিলেন গ্ল্যান্সি। তখনও অঞ্চলটি ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের ক্ষত কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিল। ওই ভূমিকম্পে প্রায় ৯ হাজার মানুষ নিহত এবং প্রায় ৩০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। পাহাড়ি জনপদগুলোতে তখনও বাড়িঘর, খামার ও চা-দোকান পুনর্নির্মাণ চলছিল।

বিরুর সঙ্গে বন্ধুত্ব

কাঠমান্ডুতে বসবাসকারী এক বন্ধুর মাধ্যমে বিরুর সঙ্গে পরিচয় গ্ল্যান্সির। পরিচয়ের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁদের বন্ধুত্ব হয়ে যায়। এভারেস্ট বা অন্নপূর্ণার জনপ্রিয় ট্রেইলের বদলে বিরু তাঁর নিজের বাড়ির কাছের লাংটাং উপত্যকা দেখাতে চেয়েছিলেন।

সেই সফরে প্রতিদিন প্রায় আট ঘণ্টা করে পাহাড়ে হাঁটতেন তাঁরা। গসাইকুন্ডার নীল হ্রদ, বিশাল রডোডেনড্রন বন এবং লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের সৌন্দর্য তাঁদের মুগ্ধ করেছিল। গ্ল্যান্সির বর্ণনায়, লাংটাংয়ের প্রকৃতি ছিল একই সঙ্গে নির্মম ও অসাধারণ সুন্দর।

বিরু ছিলেন দুর্দান্ত পাহাড়ি গাইড। গ্ল্যান্সি ও তাঁর বন্ধু অ্যান্থনির তুলনায় প্রায় এক ফুট খাটো হলেও পাহাড়ে তাঁর চলার গতি ছিল অনেক বেশি। তিনি দ্রুত ওপরে উঠে গিয়ে অপেক্ষা করতেন, আর দুই বন্ধু হাঁপাতে হাঁপাতে চূড়ায় পৌঁছালে তাঁকে পাথরের ওপর বসে ধূমপান করতে দেখা যেত। তরুণ বয়সে তিনি সন্ন্যাসীও ছিলেন।Biru, a trekking guide in Syabru Bensi, Nepal, meditating in front of snow-capped mountains.

ভেসে গেল নদীর পাড়ের বাড়ি

ট্রেকিংয়ের রাতে তাঁরা চা-দোকানের সামনে বসে সূর্যাস্ত দেখতেন, সবজি কারি খেতেন এবং স্থানীয় রাকসি পান করে পাহাড়, পরিবার ও জীবনের নানা বিষয় নিয়ে দীর্ঘ আলাপ করতেন। কখনো বিরুর পরিবারের সদস্যদের বাড়িতেও থেকেছেন তাঁরা।

ট্রেকের শেষে বিরু তাঁদের সিয়াব্রু বেনসিতে নিজের নির্মাণাধীন বাড়ি দেখিয়েছিলেন। ত্রিশূলী নদীর তীরে তৈরি সেই বাড়িটি ছিল তাঁর দুই ছেলের জন্য। বাড়িটি নিয়ে তাঁর গর্বের শেষ ছিল না।

বন্যার খবর পাওয়ার পর গ্ল্যান্সি সেই বাড়িটির ছবি খুঁজতে থাকেন। কিন্তু উপগ্রহচিত্র ও ধ্বংসযজ্ঞের ছবি দেখে তাঁর আশঙ্কাই সত্যি হয়—নদীর তীরের বাড়িটি আর নেই। প্রবল স্রোতে সবকিছু ভেসে গেছে।

বিরুর দুই ছেলে বেঁচে আছে

গ্ল্যান্সি বিরুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাননি। পরে তাঁদের এক অভিন্ন বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যিনি বিরুর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। সেখান থেকে জানা যায়, বিরুর দুই ছেলে নিরাপদে আছে। তবে উপত্যকার আশপাশে বসবাসকারী তাঁর পরিবারের বহু সদস্য ও বন্ধু বন্যায় প্রাণ হারিয়েছেন।

বিরু নিজে বেঁচে আছেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো খবর পাওয়া যায়নি। গ্ল্যান্সি লিখেছেন, বিরু যদি কোনোভাবে প্রাণে বেঁচে থাকেন, সেটি হবে এক অসাধারণ অলৌকিক ঘটনা।Biru, a trekking guide in Syabru Bensi, Nepal, sitting with a drink, with snow-capped mountains in the background.

লাংটাংয়ের প্রতি গ্ল্যান্সির ভালোবাসার বড় কারণ ছিলেন বিরু। নেপাল সফরের পর তিনি অন্য বন্ধুদেরও লাংটাংয়ে যেতে উৎসাহিত করতেন। বিরু তাঁদের স্বাগত জানাতেন হাসিমুখে, হাতে থাকত এক গ্লাস রাকসি। বছরের পর বছর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও পরে ফেসবুকে তাঁর ছোট্ট বার্তা ভেসে উঠত—‘নমস্তে, হাউ রু ব্রো’।

বিরু নিজেকে কখনো কখনো ‘সন অব হিমালয়া’ বলতেন। পাহাড়ের প্রতি তাঁর শিশুসুলভ বিস্ময় কখনো কমেনি। গ্ল্যান্সি লিখেছেন, বহুবার তিনি বিরুর সঙ্গে আবার লাংটাংয়ে ট্রেক করার কথা ভেবেছেন। এখন তাঁর একটাই আফসোস—সেই যাত্রাটি আর করা হয়নি।

নেপাল-তিব্বত সীমান্তের ভয়াবহ বন্যায় নিখোঁজ হয়েছেন শত শত পর্যটক, যাঁদের মধ্যে অন্তত ৩৩ জন ব্রিটিশ নাগরিক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। লাংটাং ও আশপাশের পাহাড়ে প্রতিবছর প্রায় ৩৫ হাজার দেশি-বিদেশি ট্রেকার ভ্রমণ করেন।