০৯:৪৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬
নেপালের মরদেহ শনাক্ত সংকট: এখনো নিখোঁজ ২,৪২৬ জন; ৫১৭ বিদেশি নাগরিক রাজধানীতে গ্যাস সংকট তীব্র, ৪০-৫০ টাকার গ্যাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা রংপুরে অটোরিকশাচালককে গলা কেটে হত্যা, নিখোঁজ গাড়ি উদ্ধারে অভিযান ঢাকার যানজট কমাতে ৪ মাসের সময়সীমা, করওয়ান বাজারের কাঁচাবাজার যাবে গাবতলীতে ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে এখন থেকেই মানুন ৫টি সহজ অভ্যাস নিজ দলের কর্মীর সঙ্গে বিরোধ, মারধরের পর যুবদল নেতার মৃত্যু একই দিনে মনপুরার ৩ শিশু নিখোঁজ, উৎকণ্ঠায় পরিবার সেমিফাইনালে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ চূড়ান্ত, লড়াই হবে ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের বন্যায় নিখোঁজ বন্ধু, ভেসে গেল গ্ল্যান্সির পরিচিত গ্রাম ভারতে খ্রিস্টানদের উদ্বেগ, ধর্মান্তরবিরোধী কঠোর আইনে বাড়ছে হয়রানির আশঙ্কা

ভারতে খ্রিস্টানদের উদ্বেগ, ধর্মান্তরবিরোধী কঠোর আইনে বাড়ছে হয়রানির আশঙ্কা

ভারতে ধর্মান্তরবিরোধী আইন আরও কঠোর হওয়ায় দেশটির খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে মহারাষ্ট্রে নতুন আইন কার্যকর হওয়ার পর গির্জা, যাজক ও ধর্মীয় সমাবেশে নজরদারি এবং আইনি হয়রানির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মুম্বাইয়ে গির্জায় যাওয়ার আগে সম্মতিপত্র

মহারাষ্ট্রের মুম্বাই মহানগর এলাকার প্রায় চার হাজার গির্জা এখন নতুন ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। রোববার প্রার্থনায় অংশ নিতে আসা ব্যক্তিদের এমন একটি সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করতে বলা হচ্ছে, যেখানে উল্লেখ থাকবে—তারা স্বেচ্ছায় গির্জায় এসেছেন এবং তাদের জোর করে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে না।

গির্জা কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে কেউ জোরপূর্বক ধর্মান্তরের অভিযোগ করলে এই নথি তাদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপ মোকাবিলায় প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগতে পারে।

গির্জায় হামলার আশঙ্কাও বাড়ছে। গত ছয় মাসে উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো জোরপূর্বক ধর্মান্তর ঠেকানোর অভিযোগ তুলে একাধিক প্রার্থনা সভায় বাধা দিয়েছে বলে খ্রিস্টান নেতারা জানিয়েছেন। এ কারণে অনেক গির্জায় নিরাপত্তা ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মহারাষ্ট্রে নতুন আইন

২৮ আগস্ট থেকে মহারাষ্ট্রের ধর্মীয় স্বাধীনতা আইন কার্যকর হয়েছে। এর ফলে ভারতীয় ২৮টি রাজ্যের মধ্যে মহারাষ্ট্র ধর্মান্তরবিরোধী আইন প্রণয়নকারী ১৩তম রাজ্যে পরিণত হয়েছে।

নতুন আইনে জোরজবরদস্তি, প্রতারণা কিংবা প্রলোভনের মাধ্যমে ধর্মান্তরকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কেউ নিজের ধর্ম পরিবর্তন করতে চাইলে তাকে ৬০ দিন আগে কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। আইন ভঙ্গ করলে গির্জার কর্মকর্তা কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।

তবে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের অভিযোগ, এই আইন ব্যক্তিগত ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করবে।

মুম্বাইয়ে ২৪ আগস্ট খ্রিস্টান সংগঠনসহ ২০টি নাগরিক সংগঠন আইনটি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, জোরপূর্বক বা প্রতারণামূলক ধর্মান্তর ইতোমধ্যেই প্রচলিত ফৌজদারি আইনে শাস্তিযোগ্য। আলাদা ধর্মান্তরবিরোধী আইন নিরীহ ধর্মীয় কর্মকাণ্ডকেও সন্দেহের আওতায় নিয়ে আসতে পারে।

উত্তর প্রদেশে গ্রেপ্তার শত শত

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে গত এক দশকে ধর্মান্তরবিরোধী আইন আরও কঠোর হয়েছে। উত্তর প্রদেশে ২০২০ সালে এমন আইন চালুর পর খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে প্রায় ২০০টি মামলা চলমান রয়েছে বলে আইনি সহায়তা সংগঠনগুলোর হিসাব।

তাদের দাবি, যাজক ও প্রার্থনায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিসহ ৮০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার বা আটক করা হয়েছে।

উত্তর প্রদেশের এক যাজক জানিয়েছেন, চলতি বছরের জানুয়ারিতে তার রাতের প্রার্থনা সভায় একদল ব্যক্তি ঢুকে পড়ে। প্রায় ৯০ জন অংশগ্রহণকারী আতঙ্কে পালিয়ে যান। পরে পুলিশ এসে ওই যাজককে গ্রেপ্তার করে এবং ২৬ ঘণ্টা আটকে রাখে।

তার ভাষ্য, গ্রামের শ্রমিক, ক্ষুদ্র কৃষক ও দরিদ্র পরিবারগুলো কয়েক ঘণ্টার মানসিক স্বস্তির জন্য প্রার্থনা সভায় আসতেন। কাউকে ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করা হয়নি।

খ্রিস্টানদের অভিযোগ, ধর্মীয় প্রচারের পাশাপাশি দাতব্য কর্মকাণ্ড, শিক্ষা সহায়তা কিংবা দরিদ্রদের সহায়তাকেও কখনো কখনো ধর্মান্তরের প্রলোভন হিসেবে দেখানো হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে অবমাননাকর ভাষাও ব্যবহার করা হচ্ছে।Christians in India fear that tighter laws target them – Asia News Network

নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বেশি ঝুঁকিতে

মুম্বাইয়ের নাগরিক সংগঠনগুলোর মতে, ধর্মান্তরবিরোধী আইন সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে নারী, তরুণ, দলিত ও আদিবাসীদের ওপর। তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ করার প্রবণতা থেকেই এমন বৈষম্য তৈরি হচ্ছে বলে সংগঠনগুলোর দাবি।

আইনজীবী ও অধিকারকর্মীদের একাংশের মতে, এসব আইনের অপব্যবহার আন্তঃধর্মীয় দম্পতিদের হয়রানি এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার সংকুচিত করার পথ তৈরি করতে পারে।

ভারতের সর্বোচ্চ আদালতও একটি মামলায় সতর্ক করে বলেছে, নিরীহ মানুষকে হয়রানি করার হাতিয়ার হিসেবে ফৌজদারি আইন ব্যবহার করা যেতে পারে না। ২০২৫ সালের অক্টোবরে উত্তর প্রদেশের ফতেহপুর ও প্রয়াগরাজে কথিত গণধর্মান্তর নিয়ে দায়ের করা পাঁচটি মামলা বাতিল করে আদালত।

বিদেশি অনুদান নিয়েও শঙ্কা

শুধু ধর্মান্তরবিরোধী আইন নয়, বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও খ্রিস্টান পরিচালিত সংগঠনগুলো উদ্বেগে রয়েছে।

বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ আইনে প্রস্তাবিত সংশোধনীতে কোনো বেসরকারি সংস্থার বিদেশি অনুদান গ্রহণের অনুমতি স্থগিত, বাতিল বা নবায়ন না হলে বিদেশি অর্থে নির্মিত জমি, ভবনসহ বিভিন্ন সম্পদ সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া, পরিচালনা করা কিংবা বিক্রি করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

খ্রিস্টান সংগঠনগুলোর দাবি, তাদের পরিচালিত বহু বিদ্যালয়, হাসপাতাল ও এতিমখানা বিদেশি অনুদানের ওপর নির্ভরশীল। ফলে নতুন বিধান কার্যকর হলে এসব প্রতিষ্ঠানও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

সরকার অবশ্য বলছে, সংশোধনী কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে লক্ষ্য করে করা হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও আগস্টের শুরুতে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর সঙ্গে বৈঠকে দাবি করেন, সরকারের খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে হয়রানি করার কোনো উদ্দেশ্য নেই।

তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, কঠোর নিয়ন্ত্রণের ফলে বৈধভাবে পরিচালিত সামাজিক কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি অর্থ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রেও সমালোচনা

ভারতের নতুন বিধান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন রাজনীতিকও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের কেউ কেউ এটিকে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

সমালোচনার মুখে ভারত সরকার ১২ আগস্ট প্রস্তাবিত সংশোধনীটি পর্যালোচনার জন্য ৩১ সদস্যের যৌথ সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠিয়েছে।

মানবাধিকারকর্মীদের আশঙ্কা

ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে কাজ করা মানবাধিকারকর্মীদের মতে, কঠোর আইন ও অনিশ্চয়তার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে বেসরকারি সংস্থার কর্মী ও তাদের ওপর নির্ভরশীল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর।

এসব সংগঠনের বড় অংশ ভারতের অপেক্ষাকৃত অনুন্নত অঞ্চলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি, কর্মসংস্থান, পানি ও প্রতিবন্ধী মানুষের সহায়তায় কাজ করে। তাদের অর্থায়ন বন্ধ হয়ে গেলে কিংবা প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ সরকারি নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী—এমন আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ধর্মীয় স্বাধীনতা বনাম নিরাপত্তার প্রশ্ন

খ্রিস্টান নেতাদের বক্তব্য, তারা ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার পাশাপাশি নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন। গির্জায় সম্মতিপত্র সংগ্রহ এবং নিরাপত্তা ক্যামেরা বসানোর মতো পদক্ষেপ তাদের কাছে স্বাভাবিক ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের অংশ নয়; বরং সম্ভাব্য মামলা ও হামলা থেকে আত্মরক্ষার উপায়।

অন্যদিকে সরকার ধর্মান্তরবিরোধী আইনকে প্রতারণা, জোরজবরদস্তি ও প্রলোভনের মাধ্যমে ধর্ম পরিবর্তন ঠেকানোর ব্যবস্থা হিসেবে দেখছে। কিন্তু খ্রিস্টান সংগঠন ও অধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, আইনের প্রয়োগ যদি বিস্তৃত ও অস্পষ্ট হয়, তাহলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সামাজিক ও আইনি চাপ আরও বাড়তে পারে।

ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে বিতর্ক তাই নতুন করে আরও তীব্র হয়ে উঠছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

নেপালের মরদেহ শনাক্ত সংকট: এখনো নিখোঁজ ২,৪২৬ জন; ৫১৭ বিদেশি নাগরিক

ভারতে খ্রিস্টানদের উদ্বেগ, ধর্মান্তরবিরোধী কঠোর আইনে বাড়ছে হয়রানির আশঙ্কা

০৮:৫০:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬

ভারতে ধর্মান্তরবিরোধী আইন আরও কঠোর হওয়ায় দেশটির খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে মহারাষ্ট্রে নতুন আইন কার্যকর হওয়ার পর গির্জা, যাজক ও ধর্মীয় সমাবেশে নজরদারি এবং আইনি হয়রানির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মুম্বাইয়ে গির্জায় যাওয়ার আগে সম্মতিপত্র

মহারাষ্ট্রের মুম্বাই মহানগর এলাকার প্রায় চার হাজার গির্জা এখন নতুন ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। রোববার প্রার্থনায় অংশ নিতে আসা ব্যক্তিদের এমন একটি সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করতে বলা হচ্ছে, যেখানে উল্লেখ থাকবে—তারা স্বেচ্ছায় গির্জায় এসেছেন এবং তাদের জোর করে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে না।

গির্জা কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে কেউ জোরপূর্বক ধর্মান্তরের অভিযোগ করলে এই নথি তাদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপ মোকাবিলায় প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগতে পারে।

গির্জায় হামলার আশঙ্কাও বাড়ছে। গত ছয় মাসে উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো জোরপূর্বক ধর্মান্তর ঠেকানোর অভিযোগ তুলে একাধিক প্রার্থনা সভায় বাধা দিয়েছে বলে খ্রিস্টান নেতারা জানিয়েছেন। এ কারণে অনেক গির্জায় নিরাপত্তা ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মহারাষ্ট্রে নতুন আইন

২৮ আগস্ট থেকে মহারাষ্ট্রের ধর্মীয় স্বাধীনতা আইন কার্যকর হয়েছে। এর ফলে ভারতীয় ২৮টি রাজ্যের মধ্যে মহারাষ্ট্র ধর্মান্তরবিরোধী আইন প্রণয়নকারী ১৩তম রাজ্যে পরিণত হয়েছে।

নতুন আইনে জোরজবরদস্তি, প্রতারণা কিংবা প্রলোভনের মাধ্যমে ধর্মান্তরকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কেউ নিজের ধর্ম পরিবর্তন করতে চাইলে তাকে ৬০ দিন আগে কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। আইন ভঙ্গ করলে গির্জার কর্মকর্তা কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।

তবে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের অভিযোগ, এই আইন ব্যক্তিগত ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করবে।

মুম্বাইয়ে ২৪ আগস্ট খ্রিস্টান সংগঠনসহ ২০টি নাগরিক সংগঠন আইনটি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, জোরপূর্বক বা প্রতারণামূলক ধর্মান্তর ইতোমধ্যেই প্রচলিত ফৌজদারি আইনে শাস্তিযোগ্য। আলাদা ধর্মান্তরবিরোধী আইন নিরীহ ধর্মীয় কর্মকাণ্ডকেও সন্দেহের আওতায় নিয়ে আসতে পারে।

উত্তর প্রদেশে গ্রেপ্তার শত শত

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে গত এক দশকে ধর্মান্তরবিরোধী আইন আরও কঠোর হয়েছে। উত্তর প্রদেশে ২০২০ সালে এমন আইন চালুর পর খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে প্রায় ২০০টি মামলা চলমান রয়েছে বলে আইনি সহায়তা সংগঠনগুলোর হিসাব।

তাদের দাবি, যাজক ও প্রার্থনায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিসহ ৮০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার বা আটক করা হয়েছে।

উত্তর প্রদেশের এক যাজক জানিয়েছেন, চলতি বছরের জানুয়ারিতে তার রাতের প্রার্থনা সভায় একদল ব্যক্তি ঢুকে পড়ে। প্রায় ৯০ জন অংশগ্রহণকারী আতঙ্কে পালিয়ে যান। পরে পুলিশ এসে ওই যাজককে গ্রেপ্তার করে এবং ২৬ ঘণ্টা আটকে রাখে।

তার ভাষ্য, গ্রামের শ্রমিক, ক্ষুদ্র কৃষক ও দরিদ্র পরিবারগুলো কয়েক ঘণ্টার মানসিক স্বস্তির জন্য প্রার্থনা সভায় আসতেন। কাউকে ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করা হয়নি।

খ্রিস্টানদের অভিযোগ, ধর্মীয় প্রচারের পাশাপাশি দাতব্য কর্মকাণ্ড, শিক্ষা সহায়তা কিংবা দরিদ্রদের সহায়তাকেও কখনো কখনো ধর্মান্তরের প্রলোভন হিসেবে দেখানো হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে অবমাননাকর ভাষাও ব্যবহার করা হচ্ছে।Christians in India fear that tighter laws target them – Asia News Network

নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বেশি ঝুঁকিতে

মুম্বাইয়ের নাগরিক সংগঠনগুলোর মতে, ধর্মান্তরবিরোধী আইন সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে নারী, তরুণ, দলিত ও আদিবাসীদের ওপর। তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ করার প্রবণতা থেকেই এমন বৈষম্য তৈরি হচ্ছে বলে সংগঠনগুলোর দাবি।

আইনজীবী ও অধিকারকর্মীদের একাংশের মতে, এসব আইনের অপব্যবহার আন্তঃধর্মীয় দম্পতিদের হয়রানি এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার সংকুচিত করার পথ তৈরি করতে পারে।

ভারতের সর্বোচ্চ আদালতও একটি মামলায় সতর্ক করে বলেছে, নিরীহ মানুষকে হয়রানি করার হাতিয়ার হিসেবে ফৌজদারি আইন ব্যবহার করা যেতে পারে না। ২০২৫ সালের অক্টোবরে উত্তর প্রদেশের ফতেহপুর ও প্রয়াগরাজে কথিত গণধর্মান্তর নিয়ে দায়ের করা পাঁচটি মামলা বাতিল করে আদালত।

বিদেশি অনুদান নিয়েও শঙ্কা

শুধু ধর্মান্তরবিরোধী আইন নয়, বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও খ্রিস্টান পরিচালিত সংগঠনগুলো উদ্বেগে রয়েছে।

বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ আইনে প্রস্তাবিত সংশোধনীতে কোনো বেসরকারি সংস্থার বিদেশি অনুদান গ্রহণের অনুমতি স্থগিত, বাতিল বা নবায়ন না হলে বিদেশি অর্থে নির্মিত জমি, ভবনসহ বিভিন্ন সম্পদ সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া, পরিচালনা করা কিংবা বিক্রি করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

খ্রিস্টান সংগঠনগুলোর দাবি, তাদের পরিচালিত বহু বিদ্যালয়, হাসপাতাল ও এতিমখানা বিদেশি অনুদানের ওপর নির্ভরশীল। ফলে নতুন বিধান কার্যকর হলে এসব প্রতিষ্ঠানও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

সরকার অবশ্য বলছে, সংশোধনী কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে লক্ষ্য করে করা হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও আগস্টের শুরুতে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর সঙ্গে বৈঠকে দাবি করেন, সরকারের খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে হয়রানি করার কোনো উদ্দেশ্য নেই।

তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, কঠোর নিয়ন্ত্রণের ফলে বৈধভাবে পরিচালিত সামাজিক কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি অর্থ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রেও সমালোচনা

ভারতের নতুন বিধান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন রাজনীতিকও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের কেউ কেউ এটিকে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

সমালোচনার মুখে ভারত সরকার ১২ আগস্ট প্রস্তাবিত সংশোধনীটি পর্যালোচনার জন্য ৩১ সদস্যের যৌথ সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠিয়েছে।

মানবাধিকারকর্মীদের আশঙ্কা

ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে কাজ করা মানবাধিকারকর্মীদের মতে, কঠোর আইন ও অনিশ্চয়তার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে বেসরকারি সংস্থার কর্মী ও তাদের ওপর নির্ভরশীল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর।

এসব সংগঠনের বড় অংশ ভারতের অপেক্ষাকৃত অনুন্নত অঞ্চলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি, কর্মসংস্থান, পানি ও প্রতিবন্ধী মানুষের সহায়তায় কাজ করে। তাদের অর্থায়ন বন্ধ হয়ে গেলে কিংবা প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ সরকারি নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী—এমন আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ধর্মীয় স্বাধীনতা বনাম নিরাপত্তার প্রশ্ন

খ্রিস্টান নেতাদের বক্তব্য, তারা ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার পাশাপাশি নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন। গির্জায় সম্মতিপত্র সংগ্রহ এবং নিরাপত্তা ক্যামেরা বসানোর মতো পদক্ষেপ তাদের কাছে স্বাভাবিক ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের অংশ নয়; বরং সম্ভাব্য মামলা ও হামলা থেকে আত্মরক্ষার উপায়।

অন্যদিকে সরকার ধর্মান্তরবিরোধী আইনকে প্রতারণা, জোরজবরদস্তি ও প্রলোভনের মাধ্যমে ধর্ম পরিবর্তন ঠেকানোর ব্যবস্থা হিসেবে দেখছে। কিন্তু খ্রিস্টান সংগঠন ও অধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, আইনের প্রয়োগ যদি বিস্তৃত ও অস্পষ্ট হয়, তাহলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সামাজিক ও আইনি চাপ আরও বাড়তে পারে।

ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে বিতর্ক তাই নতুন করে আরও তীব্র হয়ে উঠছে।