নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর প্রায় ৩০০ ভারতীয় নাগরিকের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন কলকাতার দুই নারী—৪৩ বছর বয়সী শুভশ্রী চক্রবর্তী এবং ৫৪ বছর বয়সী রিনা ব্যানার্জি। দুজনই কৈলাস পর্বত তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্যে নেপাল হয়ে তিব্বতের পথে ছিলেন।
দুই পরিবারের কাছেই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তারা কি তিব্বতের সীমান্ত পেরোতে পেরেছিলেন, নাকি ভয়াবহ বন্যার সময় নেপালেই আটকা পড়েছিলেন?
শেষ বার্তা এসেছিল সকাল ৮টা ৩ মিনিটে
শুভশ্রী চক্রবর্তীর স্বামী সুদীপ্ত ভট্টাচার্য এখনও স্ত্রীর শেষ বার্তাগুলো ভুলতে পারছেন না। ২৬ আগস্ট সকালে নেপাল সীমান্তের অভিবাসন প্রক্রিয়া শেষ করার পর শুভশ্রী তাঁর পাসপোর্টে লাগানো প্রস্থানের সিলের একটি ছবি স্বামীকে পাঠান। সময় তখন সকাল ৭টা ৫৭ মিনিট।
এর ছয় মিনিট পর, সকাল ৮টা ৩ মিনিটে তিনি জানান, তারা চীনে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছেন। এরপর আর কোনো বার্তা আসেনি।
সুদীপ্ত বলেন, সকাল ৮টা ৩ মিনিটের পর কী ঘটেছে, তারা কিছুই জানেন না।
শুভশ্রী প্রায় ৩০ জনের একটি দলের সঙ্গে কৈলাস তীর্থযাত্রায় গিয়েছিলেন। এটি ছিল তাঁর বহু বছরের স্বপ্নের সফর। পেশায় তিনি একটি শহরের হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা বিভাগে কর্মরত চিকিৎসা-প্রযুক্তিবিদ ছিলেন। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল এবং তিনি শারীরিকভাবেও যথেষ্ট সক্ষম ছিলেন।
কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা এখন তাঁর পরিবারের কাছে কোনো নিশ্চয়তা এনে দিতে পারছে না।
বহু বছরের স্বপ্নের যাত্রা
শুভশ্রীর যাত্রা শুরু হয়েছিল ২১ আগস্ট। কলকাতা থেকে মিথিলা এক্সপ্রেসে রওনা হয়ে ২২ আগস্ট তিনি রক্সৌলে পৌঁছান। সেখান থেকে সীমান্ত পেরিয়ে বীরগঞ্জ হয়ে বাসে কাঠমান্ডু যান।
কাঠমান্ডুতে তিন রাত অবস্থান করে তিনি শহরের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখেন। সেখান থেকে ২৫ আগস্ট সকালে দলটি বাসে করে সিয়াব্রুবেশির উদ্দেশে রওনা হয়। কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ১২২ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত এই পাহাড়ি জনপদ লাংটাং অঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত।
পথে প্রায় চার ঘণ্টা একটি ভূমিধসের কারণে তাদের আটকে থাকতে হয়েছিল। পরে সেনাবাহিনী রাস্তা পরিষ্কার করে দিলে তারা আবার যাত্রা শুরু করেন।
তবে স্বামীর সঙ্গে কথা বলার সময় শুভশ্রী জানিয়েছিলেন, আকাশ পরিষ্কার ছিল। কখনও কখনও বৃষ্টি হলেও আবহাওয়া নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন না।
বন্যার খবর পেয়ে উৎকণ্ঠায় স্বামী
২৬ আগস্ট সকাল ৭টার কিছু পর শুভশ্রী হোটেল থেকে বের হন। স্বামীর সঙ্গে ফোনে কথা বলার পরও কিছুক্ষণ বার্তা আদান-প্রদান চলছিল।
প্রায় এক ঘণ্টা পর তিনি জানান, নেপালের অভিবাসন-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে। এখন তারা তিব্বতে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছেন।
নেপালের অভিবাসন কেন্দ্র পার হওয়ার পর তীর্থযাত্রীদের পায়ে হেঁটে চীনের অভিবাসনকেন্দ্রে যাওয়ার কথা ছিল। সুদীপ্তের ধারণা, বন্যা আঘাত হানার সময় তাঁর স্ত্রী হয়তো চীনের অভিবাসন ভবনের ভেতরে অথবা তার কাছাকাছি ছিলেন।
তিনি জানতেন, তিব্বতের দিকে যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল হতে পারে। তাই স্ত্রীর পরবর্তী বার্তার অপেক্ষায় ছিলেন।
কিন্তু দুপুরের দিকে, প্রায় ৩টার সময় তিনি সংবাদমাধ্যমে ভয়াবহ বন্যার খবর দেখতে পান। সঙ্গে সঙ্গে শুভশ্রীর দলের অন্য তীর্থযাত্রীদের ফোন করতে শুরু করেন। কেউ ফোন ধরেননি।
এরপর তিনি সফর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এবং দলের সঙ্গে থাকা দুই ব্যবস্থাপকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। সেখান থেকেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
তারপর থেকে শুভশ্রীর কোনো খোঁজ নেই।
সুদীপ্তের প্রশ্ন, তার স্ত্রীসহ দলের সদস্যরা কি উদ্ধার হয়েছেন? তারা কি চীনের ভূখণ্ডে পৌঁছাতে পেরেছিলেন?
তিনি চীনা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিখোঁজ, নিহত ও উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা চান। কারণ পরিবারগুলো অন্তত জানতে চায়, তাদের স্বজনদের কী হয়েছে।
রিনা ব্যানার্জির পরিবারও অন্ধকারে
শুভশ্রীর মতোই অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন ৫৪ বছর বয়সী রিনা ব্যানার্জির স্বজনেরা।
কলকাতার এই অবিবাহিত ব্যক্তিগত শিক্ষক একাই সফরে বেরিয়েছিলেন। একই তীর্থযাত্রী দলের অংশ হিসেবে তিনি একটি সফর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যাত্রা করছিলেন।
কাঠমান্ডুতে অবস্থানের সময় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত ভিডিও কলে কথা বলেছিলেন রিনা। তাঁর ভাগনে দ্বৈপায়ন মুখার্জি জানান, তখন তিনি বেশ আনন্দিত ছিলেন। দীর্ঘ সময় পর তিনি একটি ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন এবং এ নিয়ে খুব খুশি ছিলেন।
পাহাড়ি এলাকায় ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও রিনার ছিল। পরিবারের সঙ্গে তিনি পাহাড়ে ঘুরেছেন, হাঁটাহাঁটি ও পাহাড়ি পথে ভ্রমণ করেছেন। ফলে শারীরিকভাবেও তিনি যথেষ্ট সক্ষম ছিলেন।
২৫ আগস্ট যাত্রাপথে ভূমিধসের কারণে দলটি প্রায় চার ঘণ্টা আটকে পড়েছিল। রিনা বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছিলেন।
পরদিন সকালে সফর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান দলের একটি ছবি পাঠায়। সেখানে নেপালের অভিবাসনকেন্দ্রের বাইরে রিনাকেও দেখা যায়।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, রিনার পাসপোর্টেও নেপাল থেকে বের হওয়ার সিল পড়েছিল। এরপর তাঁর সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
সীমান্তের কোন পাশে ছিলেন, সেটিই অজানা
দ্বৈপায়ন মুখার্জি এখনো জানেন না রিনা সীমান্ত পেরোতে পেরেছিলেন কি না।
তিনি বলেন, রিনা চীনের দিকে ছিলেন, নাকি নেপালের দিকে—এখনও পরিবার সেটিই নিশ্চিত হতে পারেনি।
এই অনিশ্চয়তাই স্বজনদের উৎকণ্ঠা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ সীমান্তের দুই পাশে পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ এবং যোগাযোগব্যবস্থাও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছিল।
কৈলাস যাত্রা পরিণত হলো অপেক্ষার যন্ত্রণায়
শুভশ্রী ও রিনা—দুজনের কাছেই কৈলাস যাত্রা ছিল বহুদিনের আকাঙ্ক্ষা। একজনের জন্য এটি ছিল জীবনের প্রথম তীর্থযাত্রা, অন্যজনও দীর্ঘদিন ধরে এই সফরের স্বপ্ন দেখেছিলেন।
দুজনের মধ্যেই ছিল নতুন জায়গা দেখার প্রবল আগ্রহ এবং পাহাড়ের প্রতি গভীর আকর্ষণ। সেই স্বপ্ন পূরণের উদ্দেশ্যেই তারা অন্য তীর্থযাত্রীদের সঙ্গে যাত্রা করেছিলেন।
কিন্তু এখন তাদের পরিবারের কাছে সেই স্বপ্নের সফর পরিণত হয়েছে এক গভীর অনিশ্চয়তায়।
নেপাল সরকারের নিখোঁজ ব্যক্তিদের সরকারি তালিকায় শুভশ্রী ও রিনার নাম রয়েছে। তালিকায় মোট ৫৩৭ জন নিখোঁজ ব্যক্তির নাম রয়েছে। তবে এই তালিকা পরিবারগুলোর উদ্বেগ দূর করতে পারেনি। কারণ সেখানে তাঁদের অবস্থান, নিরাপত্তা কিংবা উদ্ধার হওয়ার বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই।
কলকাতাভিত্তিক সফর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানটিও এখন পর্যন্ত দলটির সদস্যদের পরিণতি সম্পর্কে কোনো নিশ্চিত তথ্য দিতে পারেনি।
ফলে দুই পরিবারের সামনে একই প্রশ্ন রয়ে গেছে—ভয়াবহ বন্যার আগে কি শুভশ্রী ও রিনা তিব্বতের সীমান্ত পেরিয়ে যেতে পেরেছিলেন? নাকি সীমান্তের কাছেই প্রকৃতির ভয়াবহতার মধ্যে আটকা পড়েছিলেন?
উত্তরটির অপেক্ষায় এখন স্বজনদের কাটছে নির্ঘুম রাত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















